জ্বালাইলা আগুন
অনেকদিন আগে মামার এক বন্ধুর বিয়ের ভিডিও দেখেছিলাম। আমরা শহরে বিয়ের ভিডিওতে ইংরেজী গান দেখি, চিটাগাং এ দেখতাম হিন্দি গান, এক এস্থেটিক বাঙ্গালীকে দেখেছিলাম কবিগুরুর গান ঢুকাতে। জেলা শহরে এসব ভণিতা নাই। সেখানে সিনেমার গান, বিশেষ করে নব্বই শূন্য দশকের শ্রুতিমধুর সব প্রেমের গান। মনে পড়ছে সেই লোকের নাম ছিল শাপলা। তো শাপলা মামা আর মামীর পোজ দিচ্ছে ফটোগ্রাফারদের আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে, কোন কাননের ফুল গো তুমি/ কোন আকাশের চাঁদ গো তুমি/ কোন রাখালের মধুর বাঁশির ধুন/ জ্বালাইলা আগুন বুকে জ্বালাইলা আগুন।
গানটা আমি শুনে আর কোনো প্রতিক্রিয়ায় মনে রাখিনি। তখন আমার অঞ্জন দত্ত আর্টসেল, কবীর সুমন ওয়ারফেইজ সঞ্জীব আমল চলে। এসব সহজ কথার গানকে আমার ভালো লাগার কারণ নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গানটা আবার শুনি। আলাউদ্দীন আলীকে নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হলো কি অসাধারণ একটা গান। বিশুদ্ধ যে প্রেমের অনুভূতি তাকেই তো বলছে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার চাইলেই গানটাকে কঠিন করতে পারতো, উনি পঞ্চকবির গান থেকে বোম্বের হিন্দি ছবির গান সব তাঁর গিলে খাওয়া। তাঁর স্মরণ শক্তি অনেকটা মহাফেজ খানার মতো। কোন সিনেমায় কার জন্য গান লিখেছেন, অন্যরা কোন সিনেমায় কি করেছে সব বলে দিতে পারেন নির্লিপ্ত ভাবে। এই গানটা যখন উনি লিখেছেন তখন সিনেমার স্বর্ণযুগ থেকে রমরমা অশ্লীল ও পাইরেসির যুগে। চারদলীয় সরকারের অপারেশন ক্লিনহার্ট চলে। তিনি আরিফ আহমেদের ছবি খেয়াঘাটের মাঝির জন্য এই গানটা লিখেছেন, আলাউদ্দীন আলীর সুর, প্রয়াত স্টার খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাপা গেয়েছে গানটা। অনেকদিন পর আমি যখন খেয়াঘাটের মাঝি দেখতে বসি। চিরচেনা গ্রামীণ ছবি। এক সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়ে বড়লোকের ছেলে নায়ক, তারপর কিভাবে গ্রাম সেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় সেই মেয়ের বিরুদ্ধে। এরকম শত শত সিনেমা বাংলাদেশে হয়েছে, তাতে মেয়েদেরও ভাগ্য একই আছে, গ্রামেও এন্ড্রয়েড মোবাইল ও ইন্টারনেট ছাড়া একইরকম আছে।
তবে গানটা এরপর যখনই শুনি আমার এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি আসে। শাবনূরের আমি এত ভক্ত নই। কিন্তু গানটাকে তাকে যথেষ্ট গ্ল্যামারাস লাগে আর ফুয়াদ নাসের বাবুর সংগীতায়োজন এত চমৎকার ছিল। তৈরির সময় হয়তো তারা জানতো গানটা হিট হবে। যেমন ঢাকা ৮৬ ছবির সময় গাজী মাজহারুল আনোয়ার যখন লিখেন পাথরের পৃথিবীতে কাঁচের হৃদয়। আনোয়ার পারভেজের সাথে কাজ করতেন আলাউদ্দীন আলীও। তিনি নাকি জানিয়েছেন লিরিকস পড়েই-- এই গান গাজী ভাই যখন লিখেছেন তখন থেকেই হিট। চাইলেও আমরা খারাপ সুর করতে পারবো না। নায়ক রাজ রাজ্জাক সাহেবের এপ্রোচ ছিল তাঁর ছেলেকে দিয়ে তারুণ্যের ছবি বানাবেন। এইজন্য শিল্পীও দেখবেন নিয়েছে তপন আর শাকিলা। শাকিলা জাফর ওরফে শর্মা খুব বেশি সিনেমার গান না গাইলেও, এসব দু একটা গানেই তিনি মনে থাকবেন। সেই ছবির নায়িকার বাস্তব জীবনের ভাগ্য আমাদের মতোই নিম্নগামী। এলিট এক পরিবারে জন্ম নিয়েছেন রঞ্জিতা, এখন ভাইয়ের সংসারে থাকেন। তাঁর বোনের স্বামীকে জেলে নিয়ে গেছে এ খবর পেয়ে স্ট্রোক করে মা মারা যান। ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারেননি তাঁর বোনের হাজবেন্ড, এজন্য বাড়ীও নিলামে। করোনায় ভাইয়ের অবস্থা খারাপ ছিল। বাড়ী ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম করতে করতে তিনি বিপর্যস্ত। এক কালের দুই ডজনের উপর ছবির মেইন নায়িকা, প্রযোজক ও গ্ল্যামার সঙ্গে মার্শাল আর্ট জানা অভিনেত্রীর জীবনে এসবই দুর্যোগ থাকে।
জ্বালাইলা আগুন গানটাতেও এখন আমি সেরকম একটা অনিবার্য লুপে পড়ে যাই। একটা জনরুচির দিকে লিরিকটা যায় ক্রমশো, শাবনূর জানায়, দশ গেরামের মানুষ ডাইকা বলতে ইচ্ছে করে/ তোমার প্রেমে মরার আগে গেছি আমি মরে/ আমি ছিলাম মরুভুমি/ বৃষ্টি হইয়া আইলা তুমি/ ঝরা বনে আইলো যে ফাগুন/ ও জ্বালাইলা আগুন বুকে। গানটা বেদনার দিকেও নিয়ে যায় আমাকে। ২০১৯ সালে শাপলা মামা নাই, আমার মামাও নাই এই ধরায় ২০২১ এ। শাপলা মারা গেছে বাস এক্সিডেন্টে, আমার মামা মোটর বাইক এক্সিডেন্টে। শাপলা মামার বিয়ের ভিডিও কেউ কি দেখে এখনো। বাঙ্গালী মুসলমান মরে গেলে তাঁর স্মৃতিগুলো মোছার জন্য সবাই উঠে পড়ে লাগে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার সেরকম ছিলেন না, নিজের হাজার হাজার গান নিয়ে গর্বই করতেন। অনেক গীতিকারের মতো বয়স হলে তিনি নিজের কাজ নিয়ে স্কেপ্টিকাল ছিলেন না। এত বিখ্যাত সব গান থাকতে থাকতে আমার মনে পড়লো আজ এই দুটো গানই জ্বালাইলা আগুন আর পাথরের পৃথিবীতে কাঁচের হৃদয়। মনে হচ্ছে বেতারের বিজ্ঞাপন তরঙ্গের কোনো দুপুরের কথা লিখছি।





মন্তব্য করুন