একাকীকথণ (৪)
টুউউ! টুউউ! ...
অনেকক্ষন থেকে ডাক শোনা গেলেও পাত্তাই নাই তার। পাতার আড়ালে পালিয়ে থাকা কলির মতোই কই যে লুকিয়ে আছে দেখাই যাচ্ছে না মিষ্টি হলুদিয়া পাখিটাকে। নিশ্চিন্তে ঘর বানিয়ে থাকা চড়ুইগুলোর হুটোপুটি এড়িয়ে আর বারান্দার গ্রীলের ফাকঁ গলে কতোটাই বা দেখা যায় ফুরুত ফারুত উড়ে বেড়ানো ছোট্ট কুটুম পাখিটাকে। ছোটকালে এটা ডাকলে বলা হতো আজ বাড়িতে কুটুম আসবে, একটু হলেও বাড়ির ঢিলেঢালা ভাব কেটে যেত যেন এর ডাকে। কথাটা মনে হতেই বুক ফুড়েঁ দীর্ঘশ্বাস পড়লো রাহেলা খাতুনের। কতোদিন হুটহাট কোন কুটুম আসে না এবাড়িতে, সুনির্দিষ্ট দিনক্ষন দেখেই তবেই তারা আসে। কুটুম ... আত্নার আত্নীয়রা নয়, নিজের নাড়ি ছেড়াঁ ধনেরাই এখন কুটুম এবাড়িতে! প্রচন্ড আগ্রহ আকাঙ্ক্ষার সেই কুটুম আসা ক’টা দিন অনেক ব্যস্ততায় কেটে যায়। কতো কি যে দিনমান ঘটতে থাকে তবে সেসব কুটুমভরা দিনগুলো যে শুধুই আনন্দমুখর হয় তা কিন্তু নয়। সুখের পরেই থাকে দুঃখ নাকি কোন সুখই চিরস্থায়ী নয়, জীবনের এইসব অমোঘ বানীর সত্যতা বজায় রাখার জন্যেই কিনা প্রতিবার কিছু না কিছু মন মোচড়ানো কষ্ট জমা হতে থাকে। কারো সাথে ভাগ করে নেয়া যায় না সেসব, মর্যাদাহানির ভয়ে, আরো বড়ো কথা অন্য একজন কষ্ট পাবে সেসব জানতে পারলে।
আরে কি ভুলোমন! উনাকে খুজঁতে এসে পাখি খুজঁতে লেগে গেলাম!
এই ক’দিনের বৃষ্টিতে আধপাকা উঠোনটায় শ্যাওলা পড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়, তাই কুন্নি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলতে ব্যস্ত মিজানুল হক। অল্প থেকেই তুলে না ফেললে ছড়িয়ে পড়েবে সারা উঠানে যা যেকোন সময় দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে, আর ছোটবেলা থেকেই মা-জেঠিদের নিকানো উঠান দেখে অভ্যস্ত চোখ এই আধপাকা উঠানটাকেও ঝকঝকা পরিপাটি দেখতে চায়। সব পরিপাটির কথায় মনে পড়লো, এই আধপাকা বাড়িটা ক’দিন পরেই বিল্ডার্সের হাতে তুলে দিতে হবে, এখানে তারা একটা আধুনিক এপার্টমেন্ট তৈরী করে দিবে।
বাড়ীটাকে ঘিরে দালানকোঠা উঠে যাচ্ছে একের পর এক। নানান জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ছেলেরা কাজের ব্যস্ততায় সময় দিতে পারছে না বাড়ি করবে বলে, কিন্তু এই সত্তরের দশকে করা বাড়িটাতেই বাবা-মা’র স্বাচ্ছন্দে কাটছে জীবন এটা ওদের বুঝানো মুশকিল। আর এটা কেবল একটা ভাঙ্গাচোরা বাড়ি না, কতো ঝড়ঝঞ্ঝার সাক্ষী আমাদের এই ঘর। নিজেদের একটা অংশ, ভালোবাসার শান্তির নীড়! যেকোন কিছু ভালোবাসার জন্য বড় কারন থাকতে হয় কি,ভালোবাসার তাগিদেই তো ভালোবেসে যাওয়া যায়। ভালোবাসার পরিমাপ যতখানি যোগ্যতায় তার চেয়ে বেশি অনুভূতির তীব্রতায়। এই অনুভূতিই তো যেকোন ভালোবাসাকে প্রেরণা জুগিয়ে যায়। যতবারই সবাই মিলে আসে এই বাড়ি সংক্রান্ত কথা তোলে আর একসময় তা বাক-বিতন্ডায় রুপ নেয়। বাবার সামনে ছেলেদের তেমন উচুঁগলা নেই কিন্তু মায়ের কাছেই চলে ওদের সব কথাবার্তা।
ঘরের শতেক ঝামেলার অন্যতম একটি হলো ল্যান্ডলাইনের ফোন। টিএনটি ফোনের নানান ঝামেলা তাও এটা রাখতে হয়, যতই ডিজিটাল করা হোক না কেন বাড়তি ভূতুড়ে বিল আসা কমেনি, তার উপর ইদানিং যোগ হয়েছে অন্য কোথাকার ঠিকানায় ফোন আসা কিন্তু নম্বর একই। শুনেছি লাইনম্যানদের কারসাজি এসব, অভিযোগ করেও কোন উপায় হচ্ছে না, তাদের এক কথা বিলের কাগজে লেখাই আছে, “ডিজিটাল ফোনলাইনের যেহেতু কলরোধ প্রনালী দেয়া আছে, তাই বাড়তি বিল কিবা অন্যান্য অভিযোগ গ্রাহ্য করা হবে না”!! একটা সেবাপ্রদানকারী সংস্থার এমনতর চিন্তাভাবনা হলে গ্রাহকরা আর করার কিইবা থাকে, আস্তে আস্তে তা থেকে বিমুখ হওয়া ছাড়া। এখনতো মোবাইল ফোনেরই চল, কিন্তু তাও এই বিশ বছরের পুরানো টিএনটি লাইনটা রাখতে হয়, অনেক যোগাযোগের খাতিরে। সেই কলরোধক ব্যবস্থাটা করতে গিয়েই লাগলো বিপত্তি, কিযে পাসওয়ার্ড দেয়া হয়েছিল ভুলেই গেছি, আর যে ডাইরীতে লিখে রাখা হয়েছিল ওটাও খুজেঁ পাওয়া যাচ্ছে না। বড়োছেলের ঘরের নাতনীটার সাথে কথা বলতে হবে, ওর সাথে ক’দিন কথা না হলে অস্থির হয়ে যায়। কথাই বা আরকি আধোবোল শুনা সেই সাথে তাল দেয়া। গেল বার এসে বলছে, “দ্দাদু, চশলম দেও”! ওর মায়ের কাছ থেকে জানা গেলো, চশমা আর কলম একসাথে সন্ধি করে চশলম হয়ে গেছে! আবার বিদায় নেয়ার কালে বলছে, “টাটা, বাই বাই, এবার ইস্কুলে যাই ... এই দাদু, এবার তুমি কান্দো!” কথাগুলো শুনে তখন সবাই মজা পেলেও, পরে বুক ভেঙ্গে কান্না এলো, ওরে শালের ঘরের শাল, তোদের জন্যেই মনটা করে উথালপাথাল। এমন করে কাছে আনতে, মন পোড়াতে নিজের ছেলেমেয়েও গুলো পারেনি। হয়তো সারাজীবন ওদের নিয়েই এতো ব্যস্ত ছিলাম যে, এমন করে অনুভবেরও সময়টুকু পাইনি। যাদের যোগ্য মানুষ গড়ে তোলার জন্যে আজীবন দু’জনে সমস্ত শখ-আহলাদ বিসর্জন দিলাম, তারাই কটু কথা বললে শেল হয়ে বেধেঁ অন্তরে। সেবার বাড়ি ডেভেলপারদের হাতে তুলে দেবার এক বাকবিতন্ডার মূহুর্তে মেজোছেলে বলে ঊঠলো, “আরে বাবা করবে বাড়ি, উনার নিজেদের নিত্যকার ঔষধ কেনার পয়সাটুকুও হাতে জমা নেই, তার আবার নিজ দায়িত্বে বাড়ি করার শখ!” খুব বলতে ইচ্ছে করছিলো, “তোদের হাজারো বায়নাক্কা, লেখাপড়ার খরচ জুগিয়ে চলেছেন একলা হাতে, তার নিজের শখ বা সাধের কিছু করার জন্যে জমা রাখার চিন্তা করারও সময় আসবে কই থেকে! উনি ভাবেননি, এককালে নিজের হাতে গড়া মানুষগুলোর চিন্তাচেতনা এমনতর হবে!” বলা হয়নি, বেয়াদপের সাথে তর্ক করে নিত্যর জন্যে তার মুখ ছুটানোর ইচ্ছে হয়নি। আর অনেক সময় মৌনতাও অনেককিছু বলে যায়, সেটা বুঝার সাধ্যি যার হয়না, হাজার বলাতেও তার কিছু যাবে আসবে না। বিশ্বাস করি, কারুর মনে কষ্ট দিয়ে যেকোন মানুষই অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়, হোক না তা ক্ষনিকের জন্যেই।
বয়েস হলে মন শিশুর মতোন হয়ে যায়, কোন না কোনভাবেই মনের লুকানো কথা বেরিয়ে পড়ে। কোনভাবে কি বেরিয়ে ছিলো বাড়ি নিয়ে বাচ্চাদের মনের কথা, কিছুতেই মনে করতে পারছি না। একদিন জানতে পারলাম, উনি নিজের বন্ধুর ছেলের মাধ্যমে ডেভেলপারের সাথে কথাবার্তা সেরে নিয়েছেন বাড়ি হস্তান্তর সম্পর্কে! আজ ছেলেরা আর অন্যান্যরা বসবে চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে। ক’দিন বাদেই যা তুলে দেয়া হবে অন্যের হাতে, তাকে পরিপাটি করে সাজাতে উনার সেকি ভীষন চেষ্টা!





অনেকগুলো সুন্দর কথা আছে লেখায়, খুব ভালো লেগেছে
এটা কি একটা ধারাবাহিক গল্পের সূচনা... আশায় থাকলাম..
এটা একটা সিরিজ তবে কেবল নামেই, ঘটনাগুলো ভিন্নভিন্ন! কিছু মানুষের নিজের কিছু কথাই থাকছে এই সিরিজে! আমি নির্দিষ্ট ঘটনার সিরিজ চালাতে পারি না।
মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
চালাইতে থাকো।
এই পর্বে আইসা তুমি সেন্ট্রাল ক্যারেক্টারের মানসিকতা খুবই সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে পারছো।
আর পারছি চালাইতে! এই পর্বের শুরুটা মনে হয় বছরখানেক আগে করছিলাম, মনেই ছিল না আর। ক'দিন আগে খুজেঁ পেলাম ডক'টা।
থ্যাঙ্কুস স্যার।
জীবনের কি আশ্চর্য সাইকেল না, একবার আদরযত্ন করি আবার সেই আদর পাবারই মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি আমরা এককালে এসে!
চালাইয়া যাও জেব্রিল
দোয়া রাইখেন গো ভাইডি!
মোবাইল থেকে পড়লাম সকাল সকাল। নাস্তা করি নাই। লেখা পইড়া খিদা লাগলো।
ব্যাটা, ১০/১১ বেজে গেলো এখনো নাস্তার সময় হইলো না! মামু-ভাতিজা দু'টাই কি ভাদাইম্মা হয়ে ঘুরো নাকি!
কিন্তু প্রশ্ন হইলো লেখাটা পড়েই খিদা লাগলো কেন রে ভাই!
এমন পরিণত লেখা সত্যিই খুব নাড়া দেয়। সাততারা দিলাম জেবীন।
সেইতো কতকথা চাপা দিয়া রাখি! এককালে ভাবতাম বড়ো হবো কবে তবেই না কত্তো শান্তিতে থাকবো! কে জানতো বড়ো হবার কত্তো কষ্ট! আগে একটু থেকে একটু কিছু হলেই মা'কে গিয়ে বলতাম, ভাইবোনের কাছে কান্দুনি গাইতাম! এখন কেবলি চাপা দিয়ে যাই!
পুরোটা লেখাই কোট করার মত।
বৃষ্টির মতন করে মন ছুঁয়ে দিলেন।
বর্না, আপনার লেখা অনেক দারুন তা জানেন, পুরা কেয়ার ফ্রি লেখা!
ধন্যবাদ পড়ার জন্যে।
বর্ণ হপে!

তুমি হপে!
আসলে O আর A র মাঝে ধন্দে ভাইটু কে আপুনি বানায়ে ফেলছি!
গোস্তাখি মাফ!
আর তুমি? হপে হপে
হিঃ হিঃ
আমি দুনিয়াতে ৮৮'র ব্যাচ।
তুমি তে আপত্তি থাকলে তুই ও চলে।
Darun lekho tumi.
Mone ken shitol haowa!!
মনে হাওয়া বাতাস বওয়া বন্ধ আছে, অবস্থা পুরাই বরফ!
আপ্নের বন্ধুতো সব ফাসঁ করে দিচ্ছে! আহারে, এইভাবে হাটে হাড়ি ভাঙ্গা পুরা অবিচার কিন্তু!
জেবীন পাথ্থর
হ! জগদ্দল পাথথর!
বয়স হলে মনটা শিশু হয় সত্যি। অসহায়বোধ করলে যে কোন বয়সে মানুষ শিশু।
অসহায়বোধ? কিন্তু সব্বার মাঝেই তো আদর-মমতা পাবার আকাংক্ষা থাকে, সে খুব স্বাবলম্বী মানুষই হক না কেন। বয়েস বাড়াতে থাকলে সেই আকাংক্ষার ক্ষুধা বেড়ে যায় আর কি।
কারেন্টের ভালোবাসায় দুইবারে শেষ করতে হইল গল্পটা
যথারীতি ভালো লেগেছে তোমার লেখা আপু । অনেক কিছু চিন্তা কর তুমি ।
ওরে শালের ঘরের শাল, তোদের জন্যেই মনটা করে উথালপাথাল। এমন করে কাছে আনতে, মন পোড়াতে নিজের ছেলেমেয়েও গুলো পারেনি। হয়তো সারাজীবন ওদের নিয়েই এতো ব্যস্ত ছিলাম যে, এমন করে অনুভবেরও সময়টুকু পাইনি। যাদের যোগ্য মানুষ গড়ে তোলার জন্যে আজীবন দু’জনে সমস্ত শখ-আহলাদ বিসর্জন দিলাম, তারাই কটু কথা বললে শেল হয়ে বেধেঁ অন্তরে
সন্তানরা কখনোই বোঝেনা । বুঝতে পারেও না ।
যাক, বিদ্যুতের বদৌলতে আমার পোষ্ট দু'বার পড়া হইলো!
আসলেই মা-বাপ'কে কখনোই বুঝি না, সময় গেলে আফসুসু লাগে কেবল
এক কথায়--অসাধারণ!
এই কথাগুলো সম্পূর্ন আমার নয়, কোথাও পড়েছিলাম। খুব করে মনে গেথেঁ গেছে আর লিখে রাখলাম এখানে।

মন্তব্যের জন্যে ধন্যাবাদ
এক কথায়--অসাধারণ!

থ্যাঙ্কু,
( এইটা কিন্তু লিঙ্কের জন্যে পেন্ডিং থ্যাঙ্কুটা দিলাম
)
আপ্নেদের এলাকায় না নির্বাচন চলছে? এই সময়ে গুলাগুলি এলাউড নাকি! কট বিহাইন্ড হবেন তো
ফেসবুকে রমজান সাহেবের বিজ্ঞাপনে ধোকা খেয়ে আবার পড়লাম। বুয়া দেরি করে আসা তাই সকালের নাসতা সময় মতো খাওয়া হয় না!
মানু কমেন্ট করে নাই, কিন্তু শেয়ার করছে ঠিকই!
হুম, সবই বুঝি, কেন সবটা বুঝতে হয়! জানতে না পারার মতো কষ্টকর ব্যাপারটা মনকে কখনোই শান্ত করতে পারে না! আর ইদানিং তো মানুষের চোখের ভাষার মূল্যই নাই, (সেটাই মনের কথা ভেবে নিবেন, কিন্তু যা অন্যের কাছে জানতে পারবেন সবটাই ছিলো মিছে) তো মুখের কথাই সব!
নিজেদের ছবি। আমরা আসলেই এমন
(
ঘুরেফিরে আমরা সব্বাই স্বার্থপর!
বেশ হচ্ছে ... চলুক।
হ্র! দ্রিছিই যখন দ্রিতেই থ্রাকুম! দ্রেখি চ্রালে ক্রিনা!
মন্তব্য করুন