আমার দাদী
৯০উর্দ্ধো দাদী আমার তিন দিনের জ্বরে হঠাৎ করে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বসেছেন।
কাউকে চিনতে পারছেন না ,কারো কোনো কথার জবাব দিচ্ছেন না।শুধু ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।দাদীর ছোটো ছেলে আমার বাবা।বাবা ভীষণ মা ন্যাওটা।বাবার বয়সই এখন ৬০ছূঁই ছূঁই।
দাদী ছিলেন লক্ষীপুরে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে আমার জেঠার কাছে।খবর পেয়ে বাবা নিজের অসুস্থতাকে বৃদ্ধাংগুল দেখিয়ে সাত সকালে শাহী গাড়িতে করে দিলেন লক্ষীপুরে ছুট।গিয়ে তো মায়ের অবস্থা দেখে বিমর্ষ।নিজের প্রেশারই হাই হয়ে গেছে।যখনই ফোন দিই কী অবস্থা।বাবার গলাটা জড়িয়ে আসে।আমি বলি বু’র (দা্দীকে আমরা বু ডাকি) তো বয়স কম হয় নাই,সেজন্যই হয়তো শরীরটা বেশি অসুস্থ।দেখবেন ,বু কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে।
বাবা আমাকে বলে আমার মায়ের বয়স হয়েছে আমিও জানি।কিন্তু আমার তো মা।তাই মন বোঝে না।অস্থির লাগে।নিজের চোখের সামনে নিজের মাকে এমন দেখলে কোনো সন্তানই সুস্থ থাকতে পারে না।
বাবার মন খারাপের সিকি ভাগও হয়তো আমি বুঝি না।কিন্তু আমি অনুভব করার চেষ্টা করি।
দু’দিন পর বাবা দাদীকে নিয়ে আম্বুল্যান্সে করে চিটাগং আসে।আম্বুল্যন্সের সাইরেনটা বুকের ভেতর কাঁপুনি তুলে দেয়।দাদীকে দেখে কেন জানি না আবেগের বাঁধ ভেংগে যায়।বুক ঠেলে কান্না আসে।নিজের উপর যেন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই আমার।
দাদীর সাথে কত স্মৃতি আমার।দাদা-দাদীর সাথে ভীষণ সখ্যতা ছিল আমার শৈশবের দিন গুলোতে।
শহর থেকে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেলে প্রায় ১৫/২০দিন বাড়িতে থাকতাম আমরা।বাবা আমাদেরকে রেখে চলে আসতেন।আবার ১৫/২০ দিন পর গিয়ে আমাদের নিয়ে আসতেন।
এই দিন গুলোতে আমি থাকতাম পাখির মতো মুক্ত।স্কুল নেই।হোমওয়ার্ক নেই।প্রাইভেট টিউটর নেই।দিন ভর শুধু পাড়া বেড়ানো।দাদীর হাতে দুধ মাখানো ভাত খেতে অমৃত মনে হতো।আমাদের একটা গরু ছিল।প্রায় প্রতিবছরই বাছুর দিত।যখনই বাড়িতে যেতাম তিড়িং বিড়িং করে লাফানো বাছুরের সাথে আমরাও লাফাতাম।বাছুরের একটা নামও ছিল। লাল মিয়া। লাল রংয়ের ছিল বলেই বোধহয় এই নাম করণ।লাল মিয়ার লেজ নিয়ে মোচড়া মোচড়ি করলেই সে সমানে লাফাতে থাকতো।
লাল মিয়ার জন্য আমার বেশি মায়া হতো তখন, যখন দেখতাম লাল মিয়ার মায়ের ওলান থেকে দাদা মাটির সানকিতে সব দুধ দুয়ে ফেলতো।লাল মিয়া সে কী লাফালাফি করতো মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য।সকাল দশটা এগারটা পর্যন্ত লাল মিয়াকে রশি দিয়ে আলাদা করে বেঁধে রাখতো দাদা।দুধ দোয়ানো শেষে লাল মিয়ার বাঁধন খুলে দিত।একবার সকালের দিকে দুধ দোয়ানোর আগেই আমি লাল মিয়ার রশি আলগা করে দিয়েছিলাম।লাল মিয়া মনের আনন্দে মায়ের দুধের বাটে মুখ লাগিয়ে নাচছিল।দাদা যখন দুধ দোয়াতে গেল দেখল লাল মিয়ার মায়ের ওলানে আর কোনো দুধ নেই।দাদার চিৎকার,দাদীর চিৎকারে আমি বলে দিলাম এই কুকর্ম আমার।দাদী তো গর্জে ওঠে।আজকে দাদা কি দিয়ে ভাত খাবে?
আমি বুঝিনা লাল মিয়ার খাবার প্রতিদিন আমরা খেয়ে ফেলি তা নিয়ে কারো দুঃখ নেই।আর একদিন মাত্র লাল মিয়া তার নিজের খাবার নিজে খেয়েছে বলে সবার সে কী গর্জন!
লাল মিয়ার প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখালেও মন্টুর জন্য ঠিকই সবার টান।মন্টু ছিল দাদার প্রিয় কুকুর।দাদা ভাত খাওয়ার সময় মন্টু বলে চিৎকার করলেই দেখতাম মন্টু এসে হাজির।যেন সে ডাকের জন্যই অপেক্ষা করছিল। মন্টুকে ডেকে ভাত দিত,মাছের কাটা দিত,মাংসের হাড় দিত।গুটলুরেও কাছে ডেকে নিত।গুটলু ছিল আমাদের সাদা বিড়াল।দাদা নিজের প্লেট থেকে কিছু খাবার গুটলুর দিকে ছূঁড়ে দিত।গুটলু মিয়াঁও,মিয়াঁও করে সেসব খাবার খেত।সবার খাবারের কথা মাথায় থাকলেও শুধু লাল মিয়ার খাবার নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা থাকতো না কেন এই দুঃখে আমার ইচ্ছে করতো কতক্ষণ চিৎকার করে কাঁদি।
এইটুকু নিষ্ঠুরতা বাদ দিলে দাদা-দাদী নিয়ে সব গল্পই আমার সুখের।বাড়ি থেকে চলে আসার সময় বাঁধ ভেংগে কান্না আসতো আমার চোখে ।কান্না আসতো দাদীর মুরগীর বাচ্চাগুলোর জন্য,প্যাঁক প্যাঁক করে ডাকা হাঁস গুলোর জন্য,রান্নাঘরের পেছনে থাকা জলপাই গাছটার জন্য,তাল তলার সেই মেঠো পথটার জন্য,বুড়ি বাড়ির বাঁশ মুড়াটার জন্য,দারা পুকুর পাড়ের চারা আমগাছটার জন্য,খাল পাড়ের সেই সাঁকোটার জন্য,আন্তর পুকুরের টলটলে পানির জন্য,পানির উপর ভেসে থাকা সবুজ কচুরিপানার জন্য,বৃষ্টিতে উঠানে জমে থাকা শ্যাওলার জন্য,বাঁধানো পুকুরঘাটটার জন্য,ভোরের শিশির ভেজা ঘাসগুলোর জন্য।কান্না আসতো বাড়িটার জন্য,বাড়ির মানুষগুলোর জন্য,মানুষগুলোর মায়ার জন্য...।
দাদা মারা গেছেন ১৬ বছর আগে।এই ১৬ বছরে দাদীর সাথে আমার ভাব আরও গভীর হয়েছে।আমার বিয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের বাসায় দাদী এলে আমরা এক বিছানায় ঘুমাতাম।রাতে শোয়ার সময় দাদীর সাথে আমার গুটুর গুটুর কথা হতো।বাড়িতে গেলেও আমি আর দাদী একসঙ্গেই থাকতাম।
বাবা দাদীকে ডাঃ খোকন কান্তি দাশের কাছে নিয়ে যায় ।সিটিস্ক্যন,ই.সি.জি,ইউরিন টেস্ট,ব্লাড টেস্ট...মানুষটা কিছু বুঝে উঠতে পারে না,কেন তাকে নিয়ে এত টানা হেঁচড়া।সকাল-সন্ধ্যা দাদীরে ওষুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার।আলবাসিন, ওসারটিল ৫০, কনটিন২০০, থাইরিন, এনএসিএল, রসুভা১০, এম-কাস্ট১০,নিওট্যাক, লিভোফ্লক্স৫০০ ...এত্তগুলো ওষুধ...নাম ভুলে যাই।
একটা সময় ওষুধ খাওয়ার জন্য পাগল ছিল দাদী।ভাতের মতো গিলতে চাইতো ওষুধ।অথচ এখন ওষুধ খেতে খেতে বিরক্ত।যখনই ওষুধ নিয়ে সামনে দাঁড়াই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে।
দাদীর সাথে এবার আর আমার কোনো গল্প হয় না।দাদীর এমন পরিবর্তনে ভেঙ্গে যায় আমার মন।হারিয়ে যায় আমার শৈশব।গুমরে গুমরে কাঁদে স্মৃতিগুলো।





ভালো লাগলো, দুঃখও লাগলো
ঠিক বলেছেন ভাইজান।
সুখ-দুঃখ যেন পাশাপাশিই থাকে।
ঠিক আপনেরটার মতো একটা গ্রামের বাড়ি আমারো ছিলো।
এখন কৈ গেছে?
টুটুল ভাই ,মনে হয় হারিয়ে গেছে।
রিপ্লাই দিতে দেরি হওয়ায় দুঃখিত।
আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায়?
ভাল থাকুক আপনার দাদী ও আপনারা। বয়স হয়েছে। বর্ধক্যকে মেনে নিতে হয় বাবার প্রতি যত্নবান হন।
ঠিক বলেছেন,বার্ধক্যকে মেনে নিতে হয়।
মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায়ও নেই।
দিন গুলো সব চলেই গেলো!
হু,দিন গুলো সব চলেই গেলো!

নিজেকে ফিরে পেলাম আপনার লেখায়। দাদাকে দেখিনি, দাদী খুব আপনজন ছিলেন। মন খারাপ লাগে। আপনজনরা যেনো কোথায় হারিয়ে যায় একে একে
দাদা-দাদীর আদর -স্নেহ পাওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।
এই মানুষগুলো কেন জানি খুব আপন হয়।
আর তাই হয়তো শেষ বয়সে এই মানুষগুলোর শারীরিক কষ্ট মেনে নিতে চায় না মন।
আমার দাদী মারা গেছেন বহু আগে, তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করা আমার আব্বাও গত হয়েছেন সাত বছর।
নিজ দেহের উপর কতৃত্ব যখন নিজের থাকে না, তখন শিশু হয়ে যাওয়া সেই সব দিন গুলিতে তাঁদের দেখভালের জন্য দরকার মায়াময় কিছু আপনজনের।
আপনারা সেটা করছেন। দোয়া করি আপনাদের সবার জন্য ।
আপনিও ভালো থাকবেন।
আমাদের ভালোবাসাটুকু আপনিও উপলদ্ধি করছেন বলে ভালো লাগছে।
দোয়া করবেন আমার দাদীর জন্য এবং আমাদের জন্য।
ভালো থাকেন আপনারা সবাই। আপনার লেখাটা পড়ে নিজের ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে। নিজের দাদা-দাদী, নানা-নানুর কথা মনে পড়ছে খুবই। বাবা-মায়ের সাথে শৈশবের যত না স্মৃতি চার চেয়ে অনেক বেশী স্মৃতি দাদা-দাদী, নানা-নানুর সাথে। কোথায় হারিয়ে গেলো সবাই! আহারে! মন কাঁদে।
শৈশবের স্মৃতিগুলো বেশ রঙ্গিন তাই,না?
দিন গুলো হারিয়ে যায়,মানুষ গুলোও হারিয়ে যায়।
থাকে শুধু স্মৃতিগুলো।
কান্না-হাসির স্মৃতি।
মন্তব্য করুন