এক বোকা নানার বোকামী - ৩
(পাঁচ)
প্রতীক্ষার প্রহর আর শেষ হয়না । দুঃখের সুদীর্ঘ নিশি শেষ হয়ে প্রভাতের আলোর অপেক্ষায় সময় অতিবাহিত হতে থাকে । এরই মধ্যে নানা খোঁজ পায় Walk for Life নামের একটি বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের । এ প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার কাছে নানা পাঠায় তার অশ্রুভেজা বার্তা আরীবের ছবিসহ ।
“সুহৃদয়েষু সাকিনা সুলতানা, একটি মহৎ দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন সে জন্য আপনাকে এবং আপনার প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক অভিনন্দন । অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডাঃ কোবাইদুর রহমানের কাছে আপনাদের মহতী কর্মযজ্ঞের বিষয় জানতে পেরে আপনাকে বিরক্ত করা অযৌক্তিক হবে না বলে মনে হলো । শিশুর কান্না স্বর্গীয় ও সুষমামন্ডিত, কিন্তু বৃদ্ধের কান্না বড্ড অশোভন ও অসুন্দর । তাই আপনার মোবাইল নম্বর জানা সত্ত্বেও কথা বলতে ভরসা পাচ্ছিনা । কানেও তো ভাল শুনতে পাইনা, তাই সামনাসামনি কথা বলতেও দ্বিধা আমার ।
এবার কাজের কথা । একটি শিশু, তার নাম আরীব (AREEB) । আজ তার বয়স ১ বছর ৮ মাস ১৮ দিন । জন্ম অবধি সে পৃথিবীর আলো দেখেনি । বাতাস তাকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দিতে ব্যর্থ হয়েছে । এখন তার ওজন ১০ কেজি । ছেলেটির হাত ও পা যথাযথ কাজ করেনা । খাবার চলে যায় শ্বাসনালীতে । এ বয়সে ৪ বার নিউমোনিয়ায় ভুগেছে । মাথাটি ছোট । অর্থহীন শব্দ ছাড়া কোন কথা মুখে আসে না । আরীবের মেরুদন্ড ও ঘাড় শক্ত হয়নি, সে বসতে পারেনা, হাঁটার তো প্রশ্নই ওঠেনা । শ্রবণযন্ত্র ব্যতীত তার কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক নয় । এমন একটা শিশুকে এ পৃথিবীর সম্পদে পরিণত করা কি সম্ভব ? Walk for Life কি তার জন্য কিছু করতে পারে ?
তাকে নিয়ে আমার একমাত্র মেয়ের জীবনটা ব্যর্থ হতে চলেছে । সাংসারিক, সামাজিক, আর্থিক, মানসিক সব কিছুতে আরীবের অস্তিত্বের ছাপ পড়ে সব কিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে । আমি শুরু থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছি । ফল হয়নি কিছুই । আমি ব্যর্থ ; আমার অক্ষমতা সীমাহীন । আপনি কি আপনার মূল্যবান সময়ের কিছুটা আমাকে দিবেন ? উত্তরের প্রত্যাশায় রইলাম।” নানার এ প্রত্যাশাও পূরণ হয়না, কোন উত্তর আসেনা ।
Walk for Life -এর প্রতিষ্ঠাতা Mr. Colin Macfarlane AM-এর কাছেও নানা অনুরূপ এক বার্তা পাঠায় । বোকা নানাটির বড়ভাবীর ভাগ্নে, যুক্তরাজ্যের নাগরিক । তার স্ত্রী (সে আবার ভাবীর ভাইঝি) লন্ডনের বড় একটি হাসপাতালের ডাক্তার । তাদের কাছেও অক্ষম নানার হা-হুতাশ পৌঁছায় । কিন্তু সেই একই ফলাফল, কেউ সাড়া দেয় না । ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোন উত্তর কারো কাছ থেকে পায়না নানা । নানা লিখতে তো মাত্র দুটো ‘না’ লাগে, নানা শুনতে পায় শতসহস্র না । চারিদিকে শুধুই না-এর ছড়াছড়ি । নৈশব্দের নিস্তব্ধতায় হাজারো হতাশায় জনতার মাঝেও নির্জনতার স্বাদ অনুভব করতে করতে আরীবকেন্দ্রিক নানার বৃত্ত ক্রমেই পরিধিহীন হতে থাকে, বৃন্তচ্যূৎ পুষ্পের মত আরীব পড়ে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ।
আরীবের কষ্ট কমাতে না পারার দুঃখ নানাকে কুরে কুরে খায় । বন্ধু-বান্ধবহীন নানার মর্মযাতনা, তার ধৈর্য ও শারীরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আরীবকে নিয়ে ব্যস্ততা, সময় স্বল্পতা তাকে সব কিছু থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে থাকে । স্বজনদের সময়ের অভাব এতই প্রকট যে, তারা যে ব্যস্ততার কারণে এই বোকা নানাটির কোন অনুরোধ রাখতে পারছেনা, তা নিজে ফোন করে জানাবারও সময় পায়না ।তাদের স্ত্রী বা অপর কেউ সে কাজটি করে ।
(ছয়)
একজন ফেসবুক বন্ধু একদিন ফেসবুকে আরীবের বিষয়ে জানতে চান । তার আগ্রহ ও আন্তরিকতায় বোকা নানা কিছুটা সান্তনা পায়, তার সহমর্মিতা তাকে একটু স্বস্তি দেয় । তাকে সবকিছু জানাতে পারেনি নানা, সব জানাবার মত ভাষার দখল তার নেই । যেটুকু পেরেছে তাকে জানিয়েছে, দুঃখের কথা তার কাছে প্রকাশ করে নিজেকে কিছুটা হালকা করেছে মাত্র । ফেসবুক বন্ধুটি ঐ সামান্য তথ্য সাজিয়ে কোন রকম অতিরজ্ঞন না করে লিখেছেন “আরীব ও প্রকৃতি”– প্রকাশ করেছেন ‘আমরা বন্ধু’তে । ‘আমরা বন্ধু’র লিঙ্ক ফেসবুকে দিয়ে নানাকে অবহিত করেছেন । নানা ‘আমরা বন্ধু’র সকলের সহমর্মিতা পেয়ে অভিভুত । সেই বন্ধুটির প্রতি তাই কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই এই নানাটির । ‘আমরা বন্ধু’র সকল বন্ধুর প্রতিও নানা কৃতজ্ঞ ।
আরীবের মায়ের অসহায়ত্ব, আরীবের নানীর শারীরিক অসুস্থতা, আর অপর সকলের নির্লিপ্ততা ও ঔদাসীন্য আরীবের সকল প্রতিবন্ধকতাকে যেন উৎসাহ যোগাচ্ছে, হয়তো বা উপহাসও করছে । নানার বয়স হয়েছে, তার কর্মক্ষমতায় ভাটার টান প্রকট হয়ে উঠছে । যে কোন সময় তাকে চলে যেতে হবে । আরীবকে এ অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যাওয়াকে নানা মেনে নিতে পারেনা কিছুতেই । এ বিরাট পৃথিবীর কোন একটি প্রান্তে এত্তটুকু ছোট্ট একটা আরীবের জন্য এতটুকু স্থান কি হবেনা ? এ প্রশ্ন মাথায় নিয়ে নানা একা একা বসে রবীন্দ্রনাথ থেকে আওড়ায় –
“যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক-দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা –
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা ।।"
নানা মাঝেমাঝেই দু’হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদে একাকী, কখনও বা বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে । আবার কখনও বা রুদ্ধশ্বাসে বিড়বিড় করে, “আরীবরে, ভাইয়ারে, তুই সুস্থ হয়ে ওঠ্ । আমি চলে গেলে তোকে কে দেখবে ! আমি বেঁচে থাকতে তুই সুস্থ হয়ে ওঠ, আর তা না হলে চলে যা, চলে যা, আমার আগে তুই চলে যা ।” বোকা নানা !! কি বোকা একটা নানা !!!
চলবে......





বড় ভাই, আপনার আবেগঘন চিঠিটি কঠিণ পাথরের বুকেও মায়া আর ভালোবাসার ফল্গুধারা বইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু...মানুষের জন্য যারা কাজ করে, মানবতার জন্য যারা প্রাণপাত করে ,তাদের হৃদয়ে কেন আঁচড় কাটতে সক্ষম হলোনা বুঝতে পারছিনা। তবুও....আপনি হাল ছাড়বেননা আশাকরি। বিধাতা আপনার পরিবারের সহায় হোন।
ঈশান, চোখের জলে যদি কষ্ট কমতো, তবে
ঈশান, আমার বয়স হয়তোবা অনেকের চেয়ে বেশী, তা' বলে আমি বড় নই মোটেও । আমি অতি সাধারণ একজন । বড়ভাই শুনতে ভাল লাগে না তাই । ভাই যদি ডাকতেই হয় তবে নাজমুল ভাই বা হুদা ভাই বললেই খুশী হব ।
আপনি যেমন বলবেন হুদাভাই।
কি বলবো, আপনার এই হৃদয়বিদারক সিরিজের তিনটি পর্ব একসাথে পড়ে মূঢ় হয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ!
আমার একটা ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করি।
আমার এক জাপানী বন্ধু আছে, ডিজাইনার আর ফটোগ্রাফার, নাম আরিতা কেন-ইচিরো। এখানে ওর হোমপেজ।(ওর নিজের বানানো। জাপানী ভাষায় যদিও, তাও হয়তো লিংকগুলোতে গিয়ে ওর কাজের অনেককিছু দেখতে পাবেন)
আরিতার পা দুটো পুরো অকেজো, একটুও দাঁড়াতে পারেনা। হাতগুলোও নষ্ট, হাত দিয়ে কিছু ধরতে পারেনা। মুখেও সমস্যা, কথা বললেও কি বলে বোঝা খুব কঠিন। আমি জানিনা ওর ফুসফুস/হার্ট এসবের সমস্যা আছে কিনা, তবে বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর মধ্যে চোখ/কান শুধু কাজ করে। কিন্তু ওর মাথা সচল, আর সবচেয়ে বড় কথা ওর একটা হার না মানা মন আছে। আমরা যখন সেনদাইতে ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে অবজার্ভ করার জন্য প্রতিবছর এ্যাক্টিভিটি করতাম, আরিতা মহাউৎসাহে আমাদের কমিটিতে যোগ দিত। সম্ভবত আমাদের মধ্যে আরিতা সবচেয়ে উদ্যমী হয়ে কাজ করতো। বাংলাদেশেও ফটোগ্রাফীর জন্য বেশ কয়েকবার ঘুরে গেছে। এখানে ওর কিছু ফটোর নমুনা
আর এখানে ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে নিয়ে কিছু ডিজাইন
শারীরিকভাবে প্রায় অথর্ব এই মানুষটার মানসিক দৃঢ়তা আর হার না মানা হার্টটা দেখলে যে কেউ আশাবাদী হতে বাধ্য। আরীবকে নিয়ে আপনার দৃঢ় আশাবাদটা আরেকটু বাড়বে, এই প্রত্যাশায় আরিতার কথা বললাম।
আজকের আরিতার এই পর্যায়ে আসা সম্ভব হবার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে এই দেশে এরকম শিশুদেরকেও বড় করে তোলার সুব্যবাবস্থা আছে।
এজন্য, প্র্যাকটিকালি চিন্তা করলে আরীবের এই সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশে কিছু করা সম্ভব না। আপনারা বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগের পাশাপাশি যে কাজটা খুব জোর দিয়ে করতে পারেন, তা হলো আরীবের বাবা-মা'র উন্নত কোন দেশে অভিবাসন নেয়া। এসব দেশে হেলথ ইন্স্যুরেন্সে এনলিস্টেড হলে আরীবের যথাযথভাবে বেড়ে ওঠার একটা পরিবেশ ওরা নিশ্চিতভাবে প্রোভাইড করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
শুভকামনা রইলো
আহা, আরিতার মত যদি আরীব হতে পারতো ! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ।
ভালো থাকুন এই কামনা
'আমার বন্ধু'র বন্ধুদের ইচ্ছাপূরণের জন্য হলেও আমাকে ভাল থাকতে হবে । এদের সাথে মিশে সত্যিই আমি যেন আগের চেয়ে ভাল আছি । আপনারা সবাই ভাল থাকবেন ।
ভালো থাকেন নানাভাই।
'আমার বন্ধু'র বন্ধুদের ইচ্ছাপূরণের জন্য হলেও আমাকে ভাল থাকতে হবে । এদের সাথে মিশে সত্যিই আমি যেন আগের চেয়ে ভাল আছি । আপনারা সবাই ভাল থাকবেন ।
''নানা লিখতে তো মাত্র দুটো ‘না’ লাগে, নানা শুনতে পায় শতসহস্র না । চারিদিকে শুধুই না-এর ছড়াছড়ি।''
মন্তব্য করুন