ইউজার লগইন

হাসপাতাল নিবাস ও কয়েকটি টুকরো ঘটনার সমাপ্তি

গত রোজা থেকে এই কোরাবানি ঈদ পর্যন্ত হাসপাতালের গল্প আসলে অসংখ্য। সব যদি লেখা শুরু করি তাহলে হয়তো কিছু কিছু বাংলাদেশি চ্যানেল গুলোর ঈদ আয়োজনের মতোই অতিরিক্ত বেদনাদায়ক হয়ে যাবে। কারো কষ্টকে সামনে এনে নিজে আরো কষ্ট পাওয়ার চেয়ে এগুলোর মাঝে জমে থাকা অন্য কিছু গল্প নিয়েই হাসপাতাল নিবাস।

নানু তো হাসপাতালে আছেন বহুদিন। আমাদের মোটামুটি অভ্যাস হয়ে গেছে নানুর হাসপাতালে থাকার বিষয়টি। রেডিও থেরাপি এবং কেমো থেরাপি চলছে সমান তালে.. হাসপাতালের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাদের খুব কাছের আত্মীয় বলে নানুর সেবা চলছে চমৎকারভাবে। তা নাহলে ইতিহাস বলে এদেশের "হাসপাতাল" ড. হুমায়ুন আহমেদ-ড. জাফর ইকবাল- আহসান হাবীবের মাকেও সুচিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়!!

হাসপাতালের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা ডাক্তার আত্মীয় হলে সুফল যেমন আছে, বিপদেরও কমতি নেই।কেউ একজন মনের ভুলে হাঁচি দিল.. সাথে সাথে তাকে ভর্তি করানোর জন্য কেবিন তৈরি! একদিন আমার জামাই কিছুটা জ্বর নিয়ে গেল নানুকে দেখতে। হঠাৎ কেবিন ফুঁড়ে কোথথেকে একজন ব্রাদার আসলেন আল্লাহ মালুম। ধাঁ করে সুই ফুটিয়ে এক সিরিঞ্জ রক্ত নিয়ে গেল। ভাশুর মশাই এবং জামাই একজন অপরের দিকে তাকাচ্ছে ঘটনা বোঝার জন্য। আর সোফায় বসে বসে বাবুমামা হাসছেন।বলা বাহুল্য ইনিই হাসপাতালের হোমড়া- চোমড়া। সর্দি লাগার পর এজন্য ভয়ে আমি একদিন তার কাছ থেকে দূরে দূরে পালিয়ে বেড়িয়েছি...যখনই বেচারা সিস্টার প্রেসার মাপতে আসেন রোগী অর্থ্যাৎ নানুর, না হলেও আরো জনা পাঁচেক রোগী বের হয়ে যায়..। কখনো নিজ কল্যাণে ..কখনো বাবু মামার বদৌলতে।

মোটামুটি হাসপাতালে আমাদের থাকা এবং আসা যাওয়ার উৎসব শুরু হয়ে গেল। মা হলেন উৎসবের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণকারী। ডায়াবেটিসের কারণে অনেকদিন ধরেই বেশ ভুগছেন। তার চিকিৎসা নিয়ে সমস্যা একটাই। তিনি সব জানেন। এবং এক শতাংশ মানেন। নানু হাসপাতালে আছেন, এজন্য তাকেও নিয়ে যাওয়া হলো এই সুযোগে তার চিকিৎসাবস্থাকে টাইট দেয়ার জন্য। ডাক্তারের সাথে কথা হচ্ছে..ডাক্তার যাই-ই বলেন, ইনি বলেন, “জানি"। "জানি" “জানি" শুনতে শুনতে ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললো "ডায়াবেটিস কেনো হয় এটা জানেন?”..সাথে সাথে মায়ের স্পিকটি নট। আরেকটি কেবিন তৈরি। নানুন বিপরীতের। মা ভর্তি হলেন। মা- মেয়ে মুখোমুখি কেবিনে, কোরিডোরে হাঁটাহাঁটি আমাদের..দিন শেষে দুই রুমে ভাগাভাগি করে শুয়ে পরা।

যেহেতু দুজন মানুষ হাসপাতালে একই পরিবারের, ফলে কেউ আর বাসায় আসেনা...হাসপাতালেও অনেক ভীড়। সবসময় আসা যাওয়ার মাঝে থাকেন আরেক আন্টি, পুতুল আন্টি। এরপর তিনিও এলেন। রোগী হয়ে - বলা বাহুল্য। এই ..একটু বেশি(!) আইসক্রিম, পায়েস খেয়ে পুতুল আন্টির অবস্থা কাহিল। আর যায় কোথায়..বাবু মামা এনে তাকে রেখে দিলেন হাসপাতালে কয়েকদিন...

এ সকল ঘটনার মাঝে আরো কতো অজানা মানুষকে নীরবে বিদায় দিলাম কে জানে। একদিন ছোটখালা, বাপ্পু বলছিলেন, "আর কিছু দিন থাকলে পাগল হয়ে যাবো..” হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না তো অবশ্যই। রোজই ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠের কান্না। কারো কারো কান্না চেপে রেখে পরিণতি নিয়ে বিদায়..আসলেই মাথা খারাপ হবার যোগাড়।
আবার ঠিক সেই সময়ে হয়তো অন্য ফ্লোরে শিশুর আগমনের জন্য ডাক্তার আর স্বজনদের ঘিরে চলছে মিষ্টি আর খুশির বন্যা। ..
এরমাঝেও চলছে কিছু স্বার্থপর ডাক্তারের অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে খাবারের আব্দার, আবার কিছু স্বার্থহীন ডাক্তারের রোগীর প্রতি দ্বায়িত্ববোধের প্রকাশ..

আমরাও বিদায় নিলাম হাসপাতাল থেকে। ঈদের দুই দিন আগে। নানুকে নিয়ে। বাসায় ফিরেই তার প্রথম প্রশ্ন, “বাজার কি আছে বাসায়"..এরপর চলতে থাকলো প্রশ্নের বন্যা, বাথরুম সাফ হইছে?.. পর্দা ধোয়া?...ইত্যাদি ইত্যাদি..
আমরা তাতেই খুশি। নানু এসেছে বাসায় আলহামদুলিল্লাহ । এরথেকে বড় আর কি হতে পারে! এখনও তার শরীরটা ভালো হয়নি। আমরা ভয়ে আছি..কিন্তু নানুর মনোবল দেখলে নিজের মনে বল পাই সবাই। এর মাঝেই গত আঠারো নভেম্বর ছিল নানুর জন্মদিন। তিরাশিতে পা দিলেন... যেন আমরা নানুর শতবর্ষী জন্মদিনটি সুস্থ-সবল নানুকে নিয়ে করতে পারি....সকলের দোয়াপ্রার্থী..

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সাহাদাত উদরাজী's picture


"তা নাহলে ইতিহাস বলে এদেশের "হাসপাতাল" ড. হুমায়ুন আহমেদ-ড. জাফর ইকবাল- আহসান হাবীবের মাকেও সুচিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়!!" - আপনার এই কথার প্রতিবাদ জানিয়ে গেলাম। একটা কথা মনে রাখা দরকার - হাসপাতালের সেবা গ্রহনে রোগী ও তার স্বজনদের বিশ্বাস থাকতে হবে। আমাদের দেশ ও পরিস্থতি জানতে হবে। একজন বিষেশজ্ঞ ডাক্তার হাসপাতালে আসতে যেতে রাস্তায় জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকেন, ডাক্তার আসিবার পুর্বে রোগী মারা গেল অবস্থা সব সময়! নানাবিধ ব্যাপার আছে, লিখলে পাতা ভরে যাবে মাত্র!

"আমি কি হনুরে মার্কা" লোকরা কোথায়ো সেবা পায় না!

সাহাদাত উদরাজী's picture


পরপর দুটি পোষ্ট! নীতিমালা লংগন!
(কমেন্ট করে ফেলার পর দেখলাম।)

রুম্পা's picture


এজন্য আজ আবার দিলাম...পরপর দুটো পোস্টের বিষয়টি মনে ছিলনা..Sad

শওকত মাসুম's picture


মনে হয় ঠিক না। নীতিমালায় ২৪ ঘন্টায় দুটোর বেশি পোস্ট দেওয় নিষেধ আছে।

জ. বিশেষ প্রয়োজন ব্যাতিরেকে ২৪ ঘন্টায় ২টার বেশি পোস্ট দেওয়া যাবে না।

সুতরাং এই পোস্ট ঠিকই আছে।

রশীদা আফরোজ's picture


ক্যারাম ক্যারাম যুদ্ধ হবে উদরাজি ভাইয়ার সাথে আমার সাথে...

ভাইজান, পহেলা অপরাধ করেছেন রুম্পা আপার লেখায় প্রথম কমেন্ট করে, আমি ফার্স্ট হবার জন্য তাড়াতাড়ি কমেন্ট লিখলাম, পোস্ট দিয়ে দেখি আমি সেকেন্ড (মাননীয় মডারেটরের হাত নেই তো? ভাববার বিষয়)! এই অপরাধের শাস্তি হলো আমাকে একটা ইগলু দুধমালাই আইসক্রিম খাওয়াতে হবে (মাত্র ১০ টাকা) !

দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল আর ডাক্তারের কথা যদি আমরা ভুক্তভোগীরা লিখি তবে পাতা উপছে পড়বে। আপনি যা বললেন, তা একটা দিক। রুম্পা আপার অভিজ্ঞতার সাথে আমার চারপাশের অভিজ্ঞতা মিলে যায়।

শোনেন ভাইয়া, হসপিটাল প্রসঙ্গে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল তাই এখন অফ যাচ্ছি। মাথায় রাগ নিয়ে লেখা ঠিক হবে না, গুছিয়ে লিখা যাবে না, লজিক এলোমেলো হয়ে যায়।

রাসেল আশরাফ's picture


রশীদা আপার সাথে একমত।

উদরাজী কাকা যেহেতু হাসপাতালে চাকরী করে তাই উনি একদিক থেকে লিখেছে।

আমার দুইধরনের অভিজ্ঞতা আছে।তাও ল্যাবএইড বা স্কয়ার, এপোলোর না।একবারে সরকারী হাসপাতালের।

ঈশান মাহমুদ's picture


কাল এই পোস্ট টা পড়ে কমেন্ট দিতে গিয়ে দেখি পোস্টই গায়েব। পরে আসল কাহিনী বুঝলাম। বন্ধু উদরাজী তোমার কাছে আমার এক্কান সিম্পল কোশ্চেন,

"আমি কি হনুরে মার্কা" লোকরা কোথায়ো সেবা পায় না!

তোমার একথাখান ঠিক আছে, কিন্তু তুমি কি বলতে পার সাধারন মানুষ কোথায় সেবা পায়?

রশীদা আফরোজ's picture


আপনার নানুর শতবর্ষী জন্মদিন নিশ্চয় হবে, ইনশাল্লাহ।
বাপরে হসপিটাল! কাল পপুলারে একটা টেস্ট করাতে গেলাম, সুঁই দেখলে আমি আতঙ্কে জমে যাই। ব্লাড নেবেন যিনি তিনি পাথ্থরমুখি, আতঙ্ক আরো বাড়লো, বললাম,' বেশি ব্যথা পাবো'? পাথর দেখি ইস্পাতমুখি হয়ে গেল, বলে কি 'ব্যথা তো একটু পাবেনই'। তারপর...!

রুম্পা's picture


ছুটির পর তো..উত্তজনাতে ডাবল হয়ে গেল..সরি..একটা কি ফালায় দিবো?

১০

রশীদা আফরোজ's picture


"বিশেষ প্রয়োজন ব্যাতিরেকে ২৪ ঘন্টায় ২টার বেশি পোস্ট দেওয়া যাবে না"।
তারমানে ২টা পোস্ট দেয়া যাবে। তাইনা?

১১

নাজমুল হুদা's picture


তার মানে হচ্ছে 'বিশেষ প্রয়োজনে' দুইটার বেশীও দেওয়া যাবে ! ঠিক না ?

১২

সাহাদাত উদরাজী's picture


দেন। কে মানা করছে! আমাগো কমেন্ট হজম করতে পারলে দেন!!
এমন কমেন্ট করুম - মন'ডা দুই সাপ্তাহ ভালা যাইবো না কইলাম কিন্তু!!!!

ছোট বোন, আপনি কেন পোষ্ট দেন না!!
সেপ্টেম্বর ২২, ২০১০ - ১:৩৬ অপরাহ্ন এরপর কোন পোষ্ট নাই কেন?

১৩

রশীদা আফরোজ's picture


ভাইয়া, দুই সপ্তাহ মন ভালো না যাবার ভয়ে লেখা দেইনা! যদি কথা দেন আমার লেখা পড়ে " আহলাদে গদগদ" টাইপ কমেন্ট দেবেন, তাহলে লিখবো।

১৪

মীর's picture


দিলাম। লেখেন।

১৫

নাজমুল হুদা's picture


রুম্পার নানুসহ সকলেই সুস্থ শতবর্ষী হোক এই কামনা করি ।

হাসপাতাল ! ওরে বাব্বা ! ওখানে যাবার আগেই মরে গেলে বেঁচে যাব আমি । ওখানে সবাই যেন দয়া করে কৃতার্থ করেন । পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অপ্রতুলতা বিস্তর পরিলক্ষিত হলেও হাজারবার বলেও সুরাহা হয়না । চিকিৎসা বা সেবার বিনিময়ে নয়, রিলিজ হবার সময় সেই দয়ার বিনিময়ে যে বিল পরিশোধ করতে হয়, তা কখনোই সাধ্যের মধ্যে থাকেনা । কত যে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধের জন্য চরকির মত ঘুরায় রোগীর সঙ্গীকে তার হিসাব রাখা যায়না । হাসপাতাল ত্যাগ করবার সময় সে সব কিছু অপাঙ্কতেয় হয়ে পড়ে, ফেলে আসতে হয় ।

আর সরকারি হাসপাতাল ? সেখানে ভর্তি প্রক্রিয়া পারই হতে পারিনি কখনও । রোগী নিয়ে সরকারি হাসপাতালে যাওয়া আর পাতাল থেকে উথ্থানে তেমন কোন পার্থক্য আছে বলে মনে হয়না ।

১৬

মীর's picture


এই পোস্টটা কালকে চোখে পড়ে নাই! শুধু ভালো না, দারুণ ভালো হইসে। আরেকটু বড় হৈলে অসাধারণ ভালো হৈত।
ইয়ে, চাকরী-বাকরী, ঘর-সংসারের ফাঁকে ফাঁকে ব্লগিংএর জন্য আরও একটু বেশি সময় বরাদ্দের চেষ্টা চালান। আমাদের সবার এবং সুনিশ্চিতভাবে আপনারও যে ভালো লাগবে, সেইটাতো বলার অপেক্ষা রাখে না; তাই না?
আপ্নারে অনেকদিন ধৈরা একটা কুশ্চেন করতে চাচ্ছিলাম, তিন মাস পর পর একদম একা থাকার আইডিয়াটা কৈ ত্থিকা পাইসেন?
শুভকামনা। হাসপাতাল নিবাস আরো সীমিত হোক।

১৭

রুম্পা's picture


আইডিয়াটা ভাইজান নিজস্ব..হে হে... glasses:

১৮

মীর's picture


কুল আইডিয়া। লাইকিট। Smile

১৯

তানবীরা's picture


নানুর শতবার্ষিকীর জন্য কামনা জানালাম, নানু ভালো থাকুন

২০

নীড় সন্ধানী's picture


ডাক্তার হাসপাতালের সু(!) অভিজ্ঞতা নিয়ে আমারো দুই প্রস্থ লিখার আছে, উদারজী ভাইকে উৎসর্গ করে Tongue

আপনার নানুর জন্য সেঞ্চুরিয়ান শুভেচ্ছা Smile

২১

বকলম's picture


ভাল লাগলো লেখাটা। নানুকে আবারও স্যালুট। তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রুম্পা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি তো ভালো মানুষ। বেড়াতে, বই পড়তে আর ঘুমাতে পছন্দ করি। আর অন্তত তিন মাস পর পর একদিন একদম একা থাকতে পছন্দ করি।