আহারে..
তখন আমার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। প্রথম চাকুরী বদল। সে সময়ে আকাশছোয়া বেতনবৃদ্ধি !! (এখন অবশ্য তা মনে হয়না) নিজের কর্মজীবনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিয়ে নিলাম জীবনের অন্যতম বড় সীদ্ধান্ত। নিজের শিক্ষাজীবন- কর্মজীবন যেমন আমার দিকে তাকিয়ে..তেমনই তাকিয়ে থাকা পরিবার। পারবো তোহ!
কমবয়সের একটা আলাদা মজা আছে..বড় বড় সীদ্ধান্তগুলো নিয়ে নেয়া যায় চট করে। বয়স যত বাড়তে থাকে সীদ্ধান্ত গুলো হতে থাকে ছোট ..আর সীদ্ধান্ত নেয়ার সময়টা হতে থাকে বড়..
তখন বয়স তুলনামূলক কম ছিল। অতএব পেরেছিলাম..
প্রথম চাকুরীতে বেতন কতো পেতাম তা বলতে চাইনা। করতাম সাংবাদিকতা। অভিজ্ঞতা-সম্পন্নরা বুঝে গেছেন কত হতে পারে। তারপরও জমিয়ে ছিলাম বেশ..দিনের পর দিন এখনকার হালফ্যাশনের "ব্রাঞ্চ" করে কাটিয়ে আর উদ্দেশ্যহীনদের নকল করে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিয়ে হেঁটে এসে যা জমিয়ে ছিলাম তা নেহায়েত মন্দ ছিলনা। আর নতুন চাকরীর আশু মোটা (!) বেতনের সুবাদে সাত আসমানে ভেসে চলা মেঘ তখন আমার বাহন!!
সেই বাহনে ভেসে কিনলাম শখের একটি জিনিষ। একটি ফ্ল্যাট স্ক্রীণ তোশিন টিভি। সে কি আনন্দ আমার! আব্বার আমলের ট্রানিজস্টার টাইপ টিভিটার এক্সপায়ারি ডেট কেটে যাওয়ার পর থেকেই মনে মনে ইচ্ছা ছিল টিভি কিনার। কিন্তু শখের চাকরীর কারণে শখের বস্তুটি কেনা হয়নি। শখের চাকরী ছেড়ে আপাত সুখের চাকরী গ্রহণ করা মাত্র টিভিটা কিনতে পারলাম।
বিসর্জনের "আয়োজন" বলা যেতে পারে একে..
প্রতিবারের মতো এবারো আমি একাই গেছি টেলিভিশন কিনতে..। পকেট থেকে পাঁচশ টাকার নোটের তোড়াটা বের করতে কষ্ট হলোনা এতোটুকু...কাগজে গর্বের সাথে সই করলাম..বাহ!
এই কালার টিভিটি এখন আমার! ভাবতেই ভালো লাগছে!..
এইবার বাসায় পৌঁছানোর পালা। নিজেই একটা ভ্যান ডেকে প্রথমে টিভিটাকে চড়ালাম এরপর নিজেও চড়লাম। মনের সুখে ভ্যানের উপর বসে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে যাচ্ছি বাসায়। শ্যামলী দুই নম্বর রোড। এবড়ো থেবড়ো পথ। থোড়াই কেয়ার! আমার টাকায় আমি ভ্যান কিনে আমি ভ্যান ভাড়া করে নিয়ে যাচ্ছি..আর গান গাচ্ছি "দেখুক লোকে, জানুক লোকে- আমি করি আমার যা মন চায়"..
(উল্লেখ্য তখন আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ার..শহরের ক'টা মেয়ে এহেন বিটকেলপনা করে কে জানে!)
আজ সেই আমি, টিভিটা বিক্রি করে দিলাম নামমাত্র মূল্যে। ঘরে আসবে নতুন টিভি, নতুন মডেল..ঝকঝকে ছবি, চকচকে ফ্রেম..চমৎকার সাউন্ড। পাবিলক ডিমান্ড! আমার বেচারি "তোশিন" তোহ এখন বুড়ো..। ওর স্থান নেই বাড়িতে..
ফলে তোশিন-টাকে নিয়ে গেল..টাকাটা এখন আমার টেবিলের উপর্। এই টাকা দিয়ে কি করবো ভাবছি..
টিভি বুড়ো হোক আর যাই হোক। আমার রক্ত আক্ষরিক অর্থে পানি করা টাকা দিয়ে কেনা তোশিনের সমকক্ষ কোন ব্রাভিয়াও নয় আমার কাছে..কখনো হবেনা..
বুকটা থেকে যে শ্বাসটা বের হচ্ছে, তাতে কান পাতলে এখন একটি শব্দই শোনা যাবে.."আহারে".."আহারে"..
একটি যন্ত্রের জন্য আজ মনটা কাবু..
আসলেই সময় আমাদের নিষ্ঠুর আর হিসেবি করে তোলে..আমরা ছুড়ে ফেলি সেসব কিছু, যা আমাদের জীবনযাপনে এখন গুরুত্বহীন। এমনকি আবেগী টুকরো টুকরো স্মৃতিজড়ানো স্মারকগুলোকেও..
আহারে..আহারে..





আমার বাসার 'সনি'টার বয়স সতের বছর। ইদানীং ঘন ঘন যান্ত্রিক গোলযোগ। অতপর পাঁচশ-হাজার গচ্চা। বউয়ের ডিমান্ড এলসিডি, প্লাজমা। আমি 'সনি'র জন্য প্রচন্ড আবেগ তাড়িত। দার-দেনা করে কতো কষ্টে কেনা টিভি, আহারে....।
আপু, মানুষ কত না আবেগ তারিত হয়ে পড়ে , যখন সে তার স্বপ্ন পুরন করে। সে মানুষের কাছে সে স্বপ্নের বস্তুটাই মুল্যহীন হয়ে পড়ে আচিরেই , যখন জন্ম নেয় নতুন চাহিদা, নতুন প্রয়ুক্তি, আর নতুন স্বপ্ন...এভাবেই স্বপ্ন রিনিউ হয়।।আর মানুষের বেচে থাকার কারন সৃস্টি হয়।
টিভিটা ব্রিক্রি করতে গেলেন কেন? রয়েছিল খাক।
আরো বড় কোনো চাকরী পাইলেন নাকি?
চাকরী তো বড় একটারেও লাগেনা। সবই তো শেষ পর্যন্ত চাকরগীরিই.. বেতনটা বেশি ছিল..এই যা..আর টিভিটা ছিল্ আমার মায়ের বাড়িতে...ঐ বাসায় নতুন টিভি আসবে বলে আমারটারে বিদায় দিলাম..
আপনি কি এখনো অ্যাডকমেই আছেন?
আমারও একটা টিভিনামা আছে। প্রথমে সেকেন্ডহ্যান্ড, তারপর ওভারটাইমের টাকা জমিয়ে একটা ফিলিপ্স ম্যাচ লাইন। এরপর অনেক ভ্যাজর ভ্যাজর ক্যাচর ক্যাচর এর পর ৫০ ইঞ্চি প্লাজমা :)। একটা টিভিও ফেলি নাই আর সবগুলোই চলে এখনো মাশাল্লাহ
আমারটাও সুস্থ ছিল..
(
আহারে আহারে
আমার টিভিও নাই দুঃখও নাই।
কয়েকদিন আগে বাসায় নতুন একটা প্লাজমা টিভি কিনা হইসে।
তাও আমার টাকায় না পুরাপুরি বাপের পয়সায় কিন্তু আমার ইচ্ছায়
।
ভাল লিখছস মামু।
মনটা টিভিময় হইয়া গেল।
বাই দা ওয়ে, টাকার তোড়াটা কি এখনও পইরা আছে? থাকলে খবর দিস।
দিলাম..
মন্তব্য করুন