দুর্ঘটনা বা অবহেলা নয়- হত্যাকাণ্ড
দুর্ঘটনা নিয়ে লিখতে ভালো লাগে না। কিছু দুর্ঘটনা না লিখিয়ে রাখতে পারলোনা। যে দুর্ঘটনাগুলো কাঁদিয়েছে, রাগিয়েছে আর প্রতিবাদী করে তুলছে ক্রমশ। একদিন হয়তো ক্রোধই দেশ ছাড়া করবে এই অধমকে। আগেই আবেগী এই লেখার জন্য ক্ষমা প্রার্থী..
১.
আমার প্রিয় সহকর্মী তাসফীন। অসাধারণ রসিকতা, বুদ্ধিমত্তা এবং পাশাপাশি পরিবারের প্রতি দ্বায়িত্ববোধ- এই হলো তাসফীন। সাংবাদিকতা থেকে বিজ্ঞাপনী সংস্থা হয়ে এখন আবার সাংবাদিকতায় ফিরে এসেছে। অসাধারণ হাসিখুশি ছেলেটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই সে পরিবারের স্বার্থে কি পরিমাণ হৃদয় দিয়ে চিন্তা করে। আমরা সাধারণত চাপে মলিণ হই। এই ছেলেটি দিনে দিনে হয়েছে আরো সপ্রতীভ। স্ত্রী নায়লা। এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঘরে জন্ম নিল এক কন্যা সন্তান। আফসীন। ছোট বাচ্চা দেখতে যেতে আমার ভয় করে। ঘাড় নরম থাকে। আর আমি যেই হতচ্ছাড়া - আল্লাহ না করুক কিছু হয়ে গেলে! একদিন সকালে এসএমএস এলো্। আফসীনের নামাজ-ই-জানাজার বার্তা ছিল সেটি। আপন মনেই চিৎকার দিয়ে উঠলাম। তারপর স্তম্ভিত হয়ে বাকিটা সময়। বাচ্চাটার জানাজায় অংশ নিয়েছি। নায়লার সাথে দেখা হয়েছে। কিন্তু তাসফীনের সাথে দেখা করার সাহস হয়নি। ভেবেছিলাম, অসুস্থতার কারণে বাচ্চাটি হয়তো আমাদের ছেড়ে গেছে।
অথচ এই হতভাগ্য পিতা, আমার সুখ-দুখের বন্ধু তাসফীন একদিন লিখল তার আট মাসের একটি শিশু কন্যাটিকে কি করে ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার অবহেলা করে মৃত্যর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমি নিশ্চিত, যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন তারা অবশ্যই জানেন এই পুরো ঘটনাটা।
আর ইবনে সিনায় দুই দিনের বাচ্চাকে না খাইয়ে মেরে ফেলার- এর দায় আমাদের সবার। কারণ আমরা প্রতিবাদ করিনি। জানতে ইচ্ছা হয়, এই দুই দিনের শিশুর বাবা ইদ্রিসের পাশে কে দাঁড়াচ্ছে?
কতো টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে, কতবার দুঃখপ্রকাশ করে সন্তান হারানোর শোক ভোলাবে ইবনে সিনা আর ইউনাইটেড? এটাকে তারা দুর্ঘটনা বলে অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে কিভাবে??এভাবে অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়াকে আর যাই হোক দুর্ঘটনা বলা যায় না। আমি একে বলি নির্মম হত্যা।
২.
এবার নুহার গল্প। বাবার কোলে ঘুমিয়ে নুহা আসছিলো কক্সবাজার থেকে ঢাকায়। পথে ডাকাতের আক্রমণ। ড্রাইভার সবাইকে বাঁচাতে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করলো না। গাড়ি ছুটে চললো সজোরে। কিন্তু পিছনে ফেলে এলো ছোট্ট নুহার প্রাণ। বাবার কোলে ঘুমাচ্ছিল। নিজের অগোচরেই বাবাকে বাঁচিয়ে ডাকাতের গুলিতে প্রাণ দিল নুহা। বাবার নাম জহিরুল। আমরা ইয়ারমেট। আমার বরের স্কুলের বন্ধু। এখনো তাকে ফোন দিতে পারিনি। চুপি চুপি অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে খবর নেই। এই দম্পতিরও মুখোমুখি হবার সাহস নেই আমার।
যে কক্সবাজার নিয়ে এসএমএস করতে আমাদের এতো আসফোলন সেখানে যাতায়াতের নিরাপত্তা দিতে আমরা বাংলাদেশীরা কতটুকু প্রস্তুত? অতিথি ডেকে নিয়ে অপমান করার দায় আমাদের কে দিয়েছে? এভাবে অনেক হারানো প্রাণের মাঝে নুহা আমার পরিচিত বলে হয়তো তার নাম নিচ্ছি। আরো কতো নাম না জানা মানুষ প্রাণ হারায় দ্বায়িত্বের অবহেলায়, কে জানে!
কতো আবিদ আটকা পড়ে গুপ্তখালে, হয়তো আবিদকে চিনি বলে কষ্টটা বেশি। ওর ফোন নম্বরটা ফোন লিস্টে আছে বলে ওর স্মৃতি একটু বেশিই তাড়া করে। এই সৈকতেই আমাদের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সেলিম যে গেল- ওর লাশটাও তো পাইনি। আসুন আমরা ভোট চাই কক্সবাজারের জন্য। মানুষকে টেনে আনি মৃ্ত্যর কাছাকাছি। অথবা ছোট হই বিদেশী অতিথিদের কাছে, যেমন হয়েছি এক জার্মান পর্যটকের সামনে। সব টাকা খুইয়ে যেএখন দেশ ফেরার কথা ভাবছেন-যার কাছে গোটা দেশ এখন চোরের মুল্লক!
৩.
এই এক চল্লিশ কিশোরকেও আমি চিনিনা। একদিন টিভির ব্রেকিং নিউজ দেখে আঁতকে উঠলাম। মাথায় একটা জিনিষই এলো। উপর ওয়ালার রহমত উঠে যাচ্ছে দেশ থেকে। না হলে এতো গুলো নিষ্পাপ প্রাণ কেনো একসাথে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। এদের মধ্যেই হয়তো আরেকজন সালাহউদ্দিন, জয় বা মুন্না ছিল। হয়তো ছিল বড় বড় বিজ্ঞানী বা শিক্ষক। এখন তারা স্মৃতি। ঐ পচাঁ পানিতে তাদের অসংখ্য স্যান্ডেল ভাসতে থাকার দৃশ্য প্রায়ই চোখে ভেসে ওঠে। বুকের উপর ভার। এতো শোক রাখার জায়গা কোথাও নেই। এদের জন্য কোন শোক দিবস নেই। সেটা পালনের জন্য চাঁদাও নেই। হয়তো মীরসরাইয়ের বাসিন্দারা তাদের বাচ্চাদের আর ফুটবল খেলতে দিবেনা আর এটাই হবে তাদের শোক। এভাবে অথর্ব করে দেয়া হলো একটি এলাকাকে। অথবা খেলা পাগল আগামী প্রজন্মকে।
মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে ট্রাক ড্রাইভারের একটি অবহেলার মাশুল দিলো গোটা এলাকাকে। এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড? এর বিচার কবে হবে?
৪.
তারেক মাসুদ। কমর্জীবনের শুরুতে তার এবং ক্যাথেরিন মাসুদের সাক্ষ্যাৎকার নেয়ার জন্য আমাকে এ্যাসাইন করা হলো। রীতিমতো কাঁপাকাঁপি করতে করতে তার সামনে যাওয়া। সেই কাঁপাকাঁপি নিমিষেই উবে গেলো।
সাধারণত কোন বিশেষ ব্যক্তিত্বের লেখা ছাপা হলে আমি একটু টেনশনে থাকতাম। যদি এমন কোন ব্যক্তিত্ব যাকে আমি শ্রদ্ধা করি- কোন কারণে রেগে বসেন। অনিচ্ছার ভুল যদি হয়ে যায়। তেমন ভয় একটু ছিল সেবারও। তারেক-ক্যাথেরিনের সত্যি জীবন ছাপা হওয়ার পর মোবাইলে দেখলাম তার নাম্বার ভেসে উঠছে। আক্ষরিক অর্থে গলা শুকিয়ে গেল।
আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষকে উৎসাহ দেয়ার কোন দরকারই ছিলনা, অথচ তিনি লেখার স্টাইল নিয়ে বেশ আলাপ করলেন। বললেন তার সাথে দেখা করতে।
গিয়েছিলাম, তিনি আলাপের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, সাংবাদিকতা ভালোবাসলে যেন না ছাড়ি। আরো অনেক কিছু। যখন দেখা হতো উনি হাসতেন। এরপর আরো স্মৃতি আছে। টুকরো টুকরো। থাক সেগুলো। তেরো তারিখকে আনুষ্ঠানিক অমঙ্গল ঘোষণা দিয়ে তিনি চলে গেলেন। কেঁদেছি। আর কি করার আছে? আমাদের মতো অথর্ব জাতির? শহীদ মিনারে গিয়ে "শেষ দেখায় কর্তব্য শেষ"- যেখানে আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে প্রতিবাদ করবে কারা।
মিশুক মনীর এবং তারেক মাসুদসহ মোট পাঁচজন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। আমরা হারালাম দেশের গৌরবকে। 'করছি'- 'গেছি'রা এখন্ আরো গ্রাস করবে চলচ্চিত্রের মতো বড় মাধ্যমকে।
তারচেয়ে বড় কথা হলো, অনেক কিছু শেখার বাকি ছিল এনাদের কাছ থেকে। দেশপ্রেম- দেশের জন্য কিছু করা, আরাম আয়েশ-এর পিছনে না ছুটে নিজের দেশের মানুষের জন্য কাজ করা। আমাদের শিখানো। আরো কতো কি! এখন এদেশ কোথায় পাবে তাদের বিকল্প?
হাই ওয়েতে আর কতো দুঘর্টনার দায় এড়াবে এ জাতি? যেহেতু আমরা সব সহ্যের জাতি- দায়টা তো আমাদেরই। জাতীয় সম্পদের হত্যাকাণ্ড এটি, মোটেই দুর্ঘটনা নয়।
৫.
এই যে এতো অবহেলা কোনটারই কিন্তু সমাধান হচ্ছেনা। একটির পর একটি চলমান দুর্ঘটনায় আগেরটা ভুলে পরেরটা নিয়ে কথা শুরু হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য যে দেশে মন্ত্রীরা এতোই রসিক(!) সে দেশে আমাদের আলোচনার বিষয়ের অভাব হবেনা কখোনই।
আমার কিছু জানার ছিল- বছরের নানান ঘটনা থেকে..
ক. ঢাবি শিক্ষক রুমানাকে অন্ধ করে দেয়া হাসান সাঈদের কেসের কি হলো?
খ. পরিমলের বিচারের কতোদূর? হোসনে আরা ছুটিতে কেন?
গ. একই বছরে অনিরাপদ সড়কে বিভিন্নভাবে নুহা, প্রায় অর্ধশত কিশোরের মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ প্রাণ হারানোর পরও কেনো তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরকে অনিরাপদ সড়কে প্রাণ দিতে হলো?
আর কজন মারা গেল মন্ত্রী মহদোয়ের টনক নড়বে? (আগের বছর এবং এবছরের সড়ক-হত্যাকাণ্ডের অন্যান্য হিসাব না হয় দিলামই না)
ঘ. নিজের দেশে চলাচলের নিরাপত্তা কবে পাবো?
ঙ. এতো বড় সমুদ্র সৈকতে কবে দক্ষ উদ্ধারকারী দল নিয়োগ দেয়া হবে সম্পূর্ণ এলাকাজুড়ে?
চ. হাই ফান্ডা হাসপাতালের প্রাণের বাণিজ্য কবে শেষ হবে? এদের জন্য আইন কি হবে?
৬.
আরো অনেক কথা বলার ছিল। ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছিনা। শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এমন দেশে নিজের সন্তানের জন্ম একদিন হবে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
একারণেই হয়তো দেশ ছেড়ে যাচ্ছে অনেকে। হয়তো একদিন আমিও..
দেশের আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী আমরা। আমরা অথর্ব। পলায়ন ও পশ্চাদপদে যাত্রায় অভ্যস্ত।
কারণ আমরা ভুলে যাই- অতি সহজে ভুলে যাই অবহেলায় প্রাণ হারানো আসলে দুর্ঘটনা নয়- হত্যাকাণ্ড। যার প্রতিটিতে আমাদের সমর্থন আছে।





লেখা নিয়ে কোন মন্তব্য করব না, লেখা ভাল লেগেছে।
আর বাকি কথাগুলো? না, সেগুলো নিয়েও কিছু বলার নেই, কীইবা বলার থাকতে পারে !!
রূম্পা, প্রশ্নগুলো সংবাদপত্রে তুলে দিন না, প্লিইইজ। আরো বেশি লোককে ভাবাক এগুলো
এটাই দুঃখ..এখনও বলে কয়ে ভাবাতে হয়!!
চমৎকার েলখা রুমপা।
আমার েতা ভয় হয় কেব না েতার আবার আমােক িনেয় েলখা লােগ।
এখন েতা িনরাপেদ মারা যাওয়ার ও েকােনা িনশচয়তা নাই।
নিউজের ফলোআপ প্রকাশে পত্রিকাগুলো তৎপর নয়। আপনার করা প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবেন কি করে? অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকতার প্র্যাকটিসই আমাদের এখানে নেই। নেই খবরের ভেতরের খবর জানাবার উদ্যোগ।
আর দূর্ঘটনার কথা যা বললেন, একরাশ খারাপ লাগা অনুভূতি প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই বলবার নেই।
My PC is not supporting Bangla. That’s why im replying in English..
We are the new generation, we should not believe on “Bangladesh can’t change” ..
Dear all its time to speak up and following up.. Just Express Condolence, Manob Bondhon, Candle Light Walk is not enough…
We have to create pressure on our Leaders.. Write on Newspaper, Say in Radio, Show in TV, talk in School, College, We all have to learn to follow the Rules…. Whatever it is…Need to create a well aware and alert Generation….
Rumpa thanks… you have started something…
Regards
Roksad
চমৎকার লেখা রুম্পা।
কিন্তু যাদের টনক নড়া দরকার তারা এটা দেখলেই হ্য়।
যারা দেশের মাথা তারা যখন সত্যি সত্যি আন্তরিক ভাবে এগুলো নিয়ে ভাববে তখন জনগণও তারে স্বভাব পরিবর্তন করা শুরু করবে।
উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সারা দেখে পরীক্ষায় নকল প্রবনতা যে মহামারী আকার ধারণ করেছিলো, মন্ত্রী আর কছু আমলাদের ভাল চিন্তার কারণে নকল প্রবনতা এখন নেই। এভাবে প্রতিটি বিষয়ই আমাদের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে যারা আছেন তাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় সফল করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
আমাদের মন্ত্রী এত বড় দুর্ঘটনার পর ও হাসতে থাকে। ভিকটিমকে দোষারোপ করতে থাকে। আমাদের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে বোধদয় হবে ক্যামনে?
মন্তব্য করুন