ইউজার লগইন

আমরা এগারো জন- আগস্টের কোন এক আনন্দমাখা সন্ধায়

কলিং বেলের সুইচটা সামনে। আঙুলটা সুইচের উপর রাখার আগেই দরজাটা খুলে গেল। কানে ফোন ধরা তন্ময়ের। আমাকে দেখে ভিতরে যেতে ইশারা করে। আমি আর আমার বর ওর বাসায় ঢুকলাম।

হঠাৎ দেখি চোখের সামনে সবুজ একটা লন। লনের পাশ দিয়ে ছোট্ট একটি রাস্তা চলে গেছে ভিতরে। হাতের বায়ে 'সুরঞ্জনা'। রাস্তা ধরে আমতলায় পৌঁছানোর আগে থেকেই ভীর ভাট্টায় নজর পরে। ভিতরে কথা বলছেন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ।

ধুর কি আবোল তাবোল..। তন্ময়ের গোছানো বাসায় সেই বিসাকের লালরঙা বাড়ি এলো কোথেকে! এই আড্ডা আর সেই আড্ডার ছবি মিলেমিশে একাকার হচ্ছে বারবার। ..তাই তোহ!

দিব্যি দেখা যাচ্ছে আন্দু (আমাদের আন্দোলন) বসে আড্ডা দিচ্ছে। ইশ আমি এবারো লেট।

২৭ নভেম্বর ১৯৯৮, শুক্রবার প্রতিবারের মতো লেট করেছিলাম আমি। ইস্ফেন্দিয়ার জাহিদ হাসান মিলনায়তন ঠাসা আমার বয়সী একগাদা ছেলে মেয়ে। কোনমতে নিজের জায়গা করতে পেরে খুশি।

ঘরে বসে দেখছি এসেছে টোকন, তাসকীন তাদের একমাত্র ছেলে এবং আমাদের সবচেয়ে বড় ভাতিজা তানজীম, ভোটা (রাসেল)...কোথা থেকে টুপুস করে পাশে এসে বসলো তালেব। ওমা পিছনে আউয়ালও আছে! আমাদের ব্যাচের জামাই।

কলেজ কমর্সূচীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে আমি আর আমার কলেজের বন্ধু তানিয়া দেখছি কে কেমন। দেখি আরেক কলেজ বন্ধু এসেছে। তার নামও তানিয়া। কি আজব। কলেজ এক! বিভাগ এক!! এমনকী সেকশনও এক!! তাই কালক্রমে একটি হলো ফরিদাবাদ (কারণ সে ঐ এলাকায় থাকে) আরেকজন হলো নামের একাংশ কেটে- তালেব! তানিয়া নামটিই হারিয়ে গেল একই নামের ফাঁদে।

মাঠের উপর সেদিন দেখা সেদিনের আদিত্য আজকের শিমুল আর সেদিন-এদিনের আমাদের টিন-বন্ধু অনন্তের সাথে। আমাদের দুই চির-কিশোর..

পর্দা সরতেই এক চির-কিশোর শিমুল এসে আমাদের আড্ডায় বসে গেল। দেখছি টেবিলের উপর ইফতারি একে একে সাজিয়ে রাখছে সনি। তন্ময়ের বউ।

মনে পড়ে, প্রথম তন্ময়ের প্রেম-কাহিনী শুনি সুরঞ্জনাতে বসেই। ঠিক এভাবে, তোর নামেই নাম- ফারজানা।

আবার ফিরে আসা তন্ময়ের বাড়িতে।
আন্দু একের পর এক গল্প বলছে। নিজে না হাসলেও আমরা হাসছি। গড়াগড়িভাব।
কে বলবে এই ছেলেটি ছাদের উপর বসে গম্ভীরমুখে উত্তরণের মিটিং করতো! আজ এক শিশুকন্যার গর্বিত পিতা এবং আমাদের ব্যাচের আরেক ডিফল্ট জামাই। কারণ আন্দু আর বিপাশা হলো বাঁধনহারার অন্যতম সফল জুটি গুলোর একটি। বিপাশার একের পর এক এসএমএস-এর উত্তর দিচ্ছে ঠিক ঠিক আবার ভাতিজাকে নিয়ে দুষ্টামি করতেও ভুলছেনা। (বিপাশাও ভাবী হতে পারে..Smile..যে যেভাবে নেয় আর কী)

রাজুও চলে এলো। আইসক্রিম হাতে। এই ব্যাটা সেই ৯৮-৯৯ এর পর আমার সীমানা থেকে হারিয়েই গেল! আবার ওকে আমাদের মাঝে ফিরে পেয়ে বেশ ভালো লাগে। ভালো লাগে প্রতিটি আয়োজনে ওর অংশগ্রহণ..
এই তো, চলে এসেছে ফরিদাবাদ। সেই আইসক্রিম!! এই নিয়ে উপহার হিসেবে আইসক্রিমের সংখ্যা হলো চার (এটি আবার এডিট করে সংখ্যা চারটি করলাম- আগের বার মিস করেছিলাম)। ভাগ্যিস আমরা শেষ পর্যন্ত কেক নিলাম। ভাবতে ভালো লাগো.. জীবনগড়ার ব্যস্ততাকে সামলে বাঁধনহারার দল আবার বাঁধনে ধরা পড়ছে।

কেন্দ্রের একথাল ছোলামুড়ির দৃশ্যটির বদলে এখানে ছিমাছাম সনির চমৎকার আয়োজন। আহা। ছাদে এসে চুপ করে বসে থাকার মতোই চুপ করে মবিন খেয়ে যাচ্ছে। আমাদের সেই -এই আলাপে এর কোন হু-হা-রু-রা কিস্সু নাই।
ইফতারের কিছুক্ষণের মাঝে অনন্ত এসে হাজির। ওরে একটা হাফ প্যান্ট পরায় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করাতে আমাদের একটুও অসুবিধা হবেনা- সেটা বোঝা গেল ওরে দেখেই।
আবার আড্ডা। আড্ডা বিষয়- আরো কে কয়টা মাস্টার্স করবে, কে কোন ভালো সুযোগ কোথায় লুফে নেবে, পাশাপাশি কথা হলো ফ্যামিলি নিয়ে- সচেতনতা নিয়ে। ভাবা যায়! আমরা- ফিল্ম বানাবো- নাকী স্বপ্ন প্রদীপ ছাপাবো সেটা নিয়ে গল্প করতে করতে আজ ডায়টেশিয়ান আর অনাগত শিশুর আলাপ করছি। ভাবতেই ভালো লাগে...আজো আমরা যেকোন আলাপে সেই ৯৮ এর মতোই আছি প্রাণবন্ত। নো সঙ্কোচ! না হলে বন্ধুত্ব কিসের!

পরে একফাঁকে শিমুলের জন্মদিনের কেকও কাটাও হয়ে গেল। সেই ছাদের উচ্ছাস আজো আছে আমাদের। আহ! স্বস্তির শ্বাস এখনও আমার অনুভবে।

একযুগ- বন্ধুত্বের পথ পারি দিয়ে বাঁধনহারার ১১জন সেই আড্ডায় ফের মোজে গেলাম চেনা অতীতের মতোন। আর এগারো জনের আড্ডায় অদৃশ্য হয়েও অংশ নিল যারা অনুপস্থিত ছিল তারা। এবারের পার্থক্য একটাই। এবার আমাদের পাল্লা ভারী করতে সাথে ছিল আমাদের লাইফের 'টপিং' -আউয়াল, হাসিব, তাসকীন, সনি আর ভাতিজা- তানজীম।

কেন্দ্রের লাইট বন্ধ হয়ে যাবে। ক্যান্টিনের মামু ছাদ ছাড়তে বলে দিচ্ছে। হমম বাসায় যেতে হয়। রিকশা ভাড়া থাকতো অর্ধেক পথের (হয়তো)। রাসেল-আমি এক এলাকার। চলো বন্ধু হাটা দেই। এক হাটাতে আজিমপুর।
এরপরের আড্ডায় কে কোন মুভি দেখে গপ্প জুড়বে- বা কোন সাহিত্য বা সামাজিক সচেতনতার পরিকল্পনা হবে- এই আলোচনার সমাধান না নিতেই বিদায়।

সনিকে বিদায় দিয়ে নীচতলে নেমে দৃশ্যটা সেই পুরোন। প্রেক্ষাপটটা নতুন। আমরা এগারোজন বিদায় নিলাম এরপর আরো বাঁধনহারাকে বেধে এক করে আড্ডা দেয়ার শপথ নিয়ে। (উফ! আমাদের শপথ নেয়া থামলোই না!!..Smile..) তাও নুরুল্লাহর ক্যাফেতে। (বন্ধুগণ ক্যাফেটা অসাধারণ। আমি গিয়েছি একবার। এরপর আড্ডা সেখানেই- আবার শপথ..Smile..)
সাফায়েত এরপর এলে ওরেও নিয়ে যাবো সেখানে। দোস্ত- ঐখানে পরেরবার ট্রিট দিও।

১৯৯৮-২০১১। কই আমি তো কোন পরিবর্তন দেখিনা! তোরা কেউ দেখিস? কে বলে বন্ধুত্ব হেরে যায় সময়ের কাছে? কে বলে মানুষ হয় পাথর। যদি তাইই হতো তাহলে ক্যামেরার প্রতিটা ক্লিকে আমাদের বত্রিশ পাটি করে দাঁত বের হবে ক্যান...??!!

(ভালো হোক-মন্দ হোক,এই লেখা উৎসর্গ করলাম আমার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে। যেখানে থাকিস- যে ভাবেই থাকিস- সশরীরে -অশরীরে পাশে থাকিস..)

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


আড্ডা দেয়া ভালু না Tongue Wink

প্রিয়'s picture


আপনার লেখাটা পড়ে আমার ক্যাম্পাস লাইফের কথা মনে পড়ে গেল। এম্নিতেই আমি খুব বেশি নস্টালজিয়ায় ভোগা টাইপ মেয়ে। আর এখনতো আরো বেশি মিস করি সেই লাইফটাকে। খালি মনে হয় ক্যান বড় হয়ে গেলাম আমরা সবাই? তাতে আর কিসুই হইলোনা মাঝখান থেকে জটিলতাগুলা বাড়লো। আপনি অনেক লাকি বারো বছর পরে এসেও বন্ধুগুলাকে পাশে পাইসেন একদম ঠিক আগের মতো। আর আমরা? এক বছরও পুরা হয়নাই এমএ পাস করসি, কিন্তু এর মধ্যেই সবাই বদলে গেসি। দোয়া করি আপনার বন্ধুদের সাথে এই বন্ধুত্ব সারা জীবন যেন ঠিক এইরকমই থাকে।

রুম্পা's picture


ক্যাম্পস লাইফ ছেড়েছি মাত্র কিছুদিনই তো হলো, বেশি দি নয়। আমরা কিন্তু অতো বুড়ো নই আপু। ৯৮ আমাদের এসএসসি ইয়ার, ২০০০ এইচএসসি ইয়ার। তখন থেকে এখন, ক্যারিয়ার গড়া বা ফ্যামিলির দ্বায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেকের বাধনই ছুটে যায়। আমাদেরটা মাশাল্লাহ ছুটে নাই। যেখানেই আছি- পাশে আছি..Smile

moin's picture


good one rumpa.... Smile.......KB

Roksad's picture


“I am busy so I can’t meet my friend… “ is the most lame excuse we all regularly give.. but in real if we want we can easily makes time to meet friends… Coz we know the road to a friends’ house is never long

Roksad....

লীনা দিলরুবা's picture


বন্ধুত্ব অমলিন থাকুক।

টুটুল's picture


বন্ধুত্বের জয়গান... চলুক...

Tonmoy's picture


Smile valoi likhechho he...ekebare adhunik short film er moto...barbar flash back...onekei taalgol pakiye felbe. tate oboshsho kichhu jay ashena...tui chalaya ja...

ar ye... mone porse, tor AAM niye ashar kotha asilo!! AAAAM koi???grrrrrrrrrrrrrr.....

শিমুল's picture


দোস্ত সেরাম লিখা হইসে! পুরান দিনে ফিরে গেসিলাম । মেনি থাঙ্কস ! Smile

১০

তানবীরা's picture


বন্ধুত্ব অমলিন থাকুক।

১১

একজন মায়াবতী's picture


বন্ধুত্ব অমলিন থাকুক।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রুম্পা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি তো ভালো মানুষ। বেড়াতে, বই পড়তে আর ঘুমাতে পছন্দ করি। আর অন্তত তিন মাস পর পর একদিন একদম একা থাকতে পছন্দ করি।