আমার ছেলেবেলার "ফল"
জানালার কপাটগুলো খুটখুট করে নড়ছে..ঘরের ভিতরে দেয়ালে কাঁপাকাঁপা ছায়া..পিনপতন নীরবতার চাইতেও বেশি কিছু। ভয়ে কুঁকড়ে পারলে বালিশের তলায় আশ্রয় নেয়ার যোগাড়... কোনমতে চোখ বন্ধ করে রাত পোহাবার অপেক্ষা। কলোনীর ঐ জামগাছ নিয়ে সে কি নানা রকমের গদ্য। সেই জাম গাছে নাকী ভূত আছে! রোজ রাতে ভূতটা আঁচল মেলে বসে আর মায়াতে সবাইকে ডাকে...শুনে ভয় পেতাম, রাতে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকতাম..মনের অজান্তে ঘুম। আর ঘুম শেষে ঝলমলে সকাল। জানালার কপাট খুলতেই ধ্যাড়ধ্যাড়ে হয়ে ওঠা জাম গাছটার সবুজ ডালপালা। যে গাছের ছায়া দেখে রােত ভয়েই অস্থির, সেই জাম গাছটাই আমার দিনের আলোর সবচেয়ে পছন্দের গাছ। হাত বাড়ালেই ধরা যেতো ছোট ছোট জামের গোছা। কখনো কখনো নীচে গিয়ে জাম গাছটায় উঠার অদম্য ইচ্ছা। সেই তখন থেকেই জামের প্রতি অদ্ভুদ একটা টান আমার এখন পযর্ন্ত। দাঁত কিড়কিড় না করা পর্যন্ত জামা চিবাতে হবেই।
কলোনীর এমনই আরেক গপ্প ছিল গাব গাছটা নিয়ে। গাব গাছটা ছিল অশ্লীল একটা জায়গায়। নীচে ইয়াব্বড় একটা ডাস্টবিন। সারাক্ষণ তার বাসে হাসফাস করতো এলাকার লোকজন। ঐ গাছে নাকী পেত্নী থাকতো। রাত ১২ টা বাজলেই গাছের নীচ দিয়ে যারাই যেত তাদের লাল শাড়ির আঁচল দিয়ে বেধে ফেলতে। অথবা "পি" করে দিতো। যদিবো আমার ধারণা পারতলা থেকে ফেলা ভাতের মার বা নষ্ট ডালই সেই "পি"-এর রহস্য, কিন্তু কে শোনে কার কথা। ভূতের গল্পের মূর্তমান প্রতীক ঐ গাছের ফল হাতে নেয়া যে কি রোমাঞ্চকর ছিল বোঝানো মুশকিল। হাজার হোক পেত্নীর গাছের ফল বলে কথা।
আর বাসার সামনের বেড়ার ফলের কথা না বললেই নয়। স্ট্রবেরি নামক ফলটাকে ছবিতে চিনতাম। আর জানতাম সেটা বড়লোকের ফল। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, বাসার সামনে যে ছোট্ট বাগান (সরকারি মাঠকে নিজের করে বাগান বানানো আর কি), সেই বাগানে স্ট্রবেরির মতো দেখতে কি যেনো হয়। আদ্য স্ট্রবেরির মতো দেখতে কিনা তা কে জানে। সেটা ভাবাভাবির চিন্তাও না করে বাগান ঘেরার জন্য ৈতরি করা ঝোপ থেকে রোজ নিতে থাকলাম লাল লাল সেই ফল। একটু টক, ফুলের মতো পাতা ছিড়ে খেতে হয়। আম্মার হাতে ধরা খেলাম যেদিন সেদিন জানতে পারলাম, এই ফলের নাম চুকাই। ধরা খাওয়া সার্থক হলো কারণ, কিছু দিনের মধ্যেই আম্মা মজার জেলি বানালো এই চুকাই দিয়ে। আহা কি মজার যে জেলি টা..
খাবার বিষয়ে সব সময়েই আমি একধাপ এগিয়ে। তাই বাদ যায়নি মালাও। স্কুলের সামনে মালা করে একটা অজাইরা ফল বিক্রি করতো। ফেরিওয়ালা ভাইজান কইতো মালা ফল, আর আমি সত্যি সত্যি মালা গলায় দিয়ে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলতাম।
আর ঐ যে ছোট ছোট বেত ফল। কিযে খেতাম। ২ টাকা দিয়ে এতো গুলো বেত ফল বীট লবণ দিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেতাম অনেকক্ষণ ধরে। ফলটা দেখতেই এত্তো মজার ছিল, খেতে তো বটেই..
দেখতে মজা লাগতো ডালিম গাছটাও। মাঝে একটা মজার বাসায় গিয়েছিলাম থাকতে। বাসাটার সামনে ছেট্ট উঠোনন। যে উঠোনটা এখনও মনের মাঝে জেগে আছে। সেই উঠোনের এক কোণায় ছিল ডালিম গাছ। লম্বা বারান্দা ঘেষে। বাসাটা ভালো লাগতো কারণ রোজ বিকেলে হাজার হাজার টিয়ে পাখি বাসার উপর দিয়ে উড়ে যেত। আর এতো এতো রঙিন পালক পড়ে থাকতো উঠোনটায়। পালক গুলো নিয়ে বইয়ের পাতায় জমিয়ে রাখতাম। পালক কুড়াতে কুড়াতে চোখ পড়লো ডালিম গাছে। আস্ত একটা ডালিম ঝুলে আছে! কিন্তু ঐ গাছ তো ধরা নিষেধ! ক্যামনে নেই!! সেই গাছটায় ধীরে ধীরে দুইটা ডালিম হলো, তিনটা, চারটা... পাঁচ নম্বর ডালিমফুলটাও তৈরি তখন। সারা রাত ধরে অপেক্ষার পর ডালিম কুমার আমার হাতে। বাড়িওয়ালা টেরই পেল না পাঁচ নম্বর ডালিমটা আদৌ হয়েছিল কি না।
ভাবছি আবার এই গাছগুলোর কাছে যাবো। দেখি ক্যামন লাগে..দৌঁড়ানিও খেতে পারি।
আজকাল আমটা, তরমুজটা খুব খাওয়া হয়। হাতের কাছে আসে বলে। আর তখন গাছটা হাতের কাছে ছিল বলে এমনিতেই অনেক ফল থাকতো মুঠোয়। এরমাঝেই হঠাৎ আবিষ্কার করলাম জীবন থেকে জাম নামের ফলটা নাই হয়ে যাচ্ছে..তখন মনে হলো সেই অপ্রিয় সত্যটা, ভাবাভাবির যখন অবকাশ ছিল না, তখনই ঘটে গেছে কত রোমাঞ্চকর ঘটনা- যা নিয়ে এখন ভাবি... আর ভাবতেই থাকি...






পুরানো কথা ভাবতে ভালোই লাগে।
আমারও...
সুন্দর লেখা।

বেত ফলটা মজার। আপনে যে ফলগুলার কথা লিখলেন সবগুলাই মজার, কিন্তু খাওয়া হয় অনেক কম। আমার ধারণা, আমরা আসলে সবচেয়ে বেশি যে ফলটা খাই সেটা হচ্ছে কলা।
কলা??
...
ইয়েস। পূর্বপুরুষের আমল থেকে খেয়ে আসছি এবং এখনো খাচ্ছি। দেখেন না রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলোয় বছরভর কলা ঝুলতে থাকে?
ইয়ে মানে..ঐ দোকানগুলোর বনরুটি আর কলা আমার প্রিয় নাশতা কি না..
''ভাবাভাবির যখন অবকাশ ছিল না, তখনই ঘটে গেছে কত রোমাঞ্চকর ঘটনা- যা নিয়ে এখন ভাবি... আর ভাবতেই থাকি...''
ভাবাভাবির কোন অবকাশ থাকেনা বলেই বোধহয় ছেলেবেলাটা এত মধুর হয়!
দুর্দান্ত হয়..
সুন্দর লেখা।
আম ছাড়া আর কিছু নিজে পেড়ে খাইছি বলে মনে পড়ে না। প্রিয় ফল মনে হয় লিচু!
আচ্ছা রূপকথা'পু,
আপনি কয়দিন পর পর ডুব দিয়া কই যান কন তো?!
অতলের রহস্য খুঁজতে যাই..
ছেলে বেলায় ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখে একটা ফল বের হত সেটার ভয়ে রীতিমত কাঁপুনি ছুটে যেত।
সে আর বলতে..
ফল ফলান্তি খেয়ে সূখে থাকেন!
বড়বেলায় যেহেতু সবকিছু নিজের যোগাড় করে নিতে হয়, সেকারণে জাম বাজারে আসার প্রায় একমাস পর দুগ্গা খেতে পেরেছি..এই দু:খ কারে বলবো..
আমার ছেলে ফলের পাগল। আবার বাবা কিছুদিন লিবিয়ায় পোস্টিং ছিল। ক্রেট ভর্তি আনার আর আঙুর আসতো। সেই কথা খুব মনে পড়ে। বাবার কথা ভাবলে কত কিছু যে মনে পড়ে
আমারো মনে পড়ে..
মালা ফল, ছোট ছোট, বেশ কালারফুল..., মুড়ির মতো একমুঠ মুখে দিতাম। এই ফলটার সত্যিকারের নাম আজও জানা হইল না!!!
বেতফল আর মালা, আহা কি কথা মনে করে দিলা। আর একটা ফল ছিল ডেউয়া বলতো আমাদের কুমিল্লার ভাষায়। আমার দাদু নিয়ে আসতো, শুকনা মরিচ পুড়িয়ে তার ভর্তা, আহাহা সেই স্বাদ
আপু কত ফল যে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে "জীবনের ফল" খোঁজার ব্যস্ততায়!!..

বেতফলটা বড্ড মিস করি..আর ডেউয়া ফলটাও আমি খেয়েছি...এগুলো কোথায় পাবো এখন?
town hall & krishi market kacha bazare powa jay. choila aso. ami last
week e kinchi.
মন্তব্য করুন