ফুলপরীরে ঢিল- কান নিয়েছে চিল..
বরিশালের গহীণে কোন একগ্রামে নানাবাড়ি। ঈদের লম্বা ছুটি.. কোথাও না গেলেই নয়। বাড়ির একদল ঠিক করলো, এবার না হয় বরিশাল। কিছু দিন সবুজ আর পাখির সাথে বসবাসের ইচ্ছা আর ইচ্ছে কংক্রিটের মাঝে বড় হতে থাকা ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া মেয়েটিকে শাপলার পুকুর দেখানো।
যেই ভাবা সেই কাজ। দুই খালা আর ছোট খালার দুই মেয়ে পুষ্পা-পরমা ঈদের তৃতীয় দিন (ঈদের প্রোগ্রামের তালিকা অনুযায়ী) কাক-ডাকা ভোরে রওনা দিলেন গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে। নিতান্তই গ্রামের বাড়ি বলতে যা বোঝায়, সেখানেই তাদের বাড়ি। ঝিঁঝি পোকার ঢাকে সন্ধ্যা. জোনাকির আলোয় রাতের ঝিকিমিকি উঠোন আর পাখির ডাকে সকাল। বেশ চমৎকার পরিবেশ। ছোট্ট ডিঙ্গিতে করে শাপলার ঢেউ ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মাঝির মুখের হাসি আজকাল কয়টা জায়গায় দেখা যায়! শহরে তো একদমই না। এখনও যেখানে বিদ্যুৎ চমক দেখাতে পারেনা, সেখানে শহরের চঞ্চলতা তো নেইই - তেমন নেই কোলাহল..
একারণেই হয়তো প্রাগৌতিহাসিক অনেক বিষয় আজও এলাকাবাসীর মনে মনে পুষে রাখে নিষ্ঠার সাথে। কি যে বিপদ!
মানে অপরের জন্য..। এমনিতে পুষ্পা-পরমা বিচ্ছু গোছের। ছেলেবেলা থেকে তিন গোয়েন্দা- ফেলুদা পড়ে পড়ে ভয়-ডর সব গুলে খেয়েছে। জিন-পরীদের কথা শুনলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে গড়ে..এর মাঝেই তারা শুনলো পরীর গল্প। বলছে বাড়ির ভাবি, আর মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে বাগড়া দিচ্ছেন ছোট্ট খালা। গল্পটি এমন-
বাড়ির একটি ছোট্ট ছেলে। ধরে নেই তার নাম মানিক! একদিন মানিক স্কুলে যাচ্ছিল। ভাবির বর্ণনায়-
- মানিকের পরনে সাদাশার্ট আর নীল হাফ প্যান্ট। মুখে কি যেন চাবাইতেছিল.. বিয়ানে বাড়ির থেকে বের হইলো। পাজীর ঘরের পাজী। ইশ্কুলে যাওয়ার আগে এদিক তাকায় ওদিক তাকায়। .. সোজা হাঁইটা গেলই হয়! না তা করবো ক্যান! বদের বদ। আবার যায় ঢিল ছুড়তে ছুড়তে!!.. তোরে কে কইছে ঢিল ছুড়তে! এমন সময়, বাড়ির থেইক্যা বেশ দূরে.. পুকুরপাড় দিয়া আগাইলে ফুলের বাগান আছে না? ওনো দিয়া যাইতে যাইতে মানিকে ছুড়লো ঢিল.. ঢিল গিয়া কই লাগলো জানেন? লাগলো ফুলপরীর কুরাতে ..(কুরাত মানে পায়ের উপরের অংশ)
ছোট খালা- কুরাতে লাগছে? কে দেখছে? মানিক?
ভাবি- মানিক দেখবো ক্যামনে, ফাজিলের কি এতোদিকে নজর আছে? দেখছে হুজুর!
খালা- হুজুর?
ভাবি- আফা, শুনেন না..
এরপর পরীর নজর পড়লো আমার মানিকের দিকে.. মানিক তো তখন ক্যামনে ক্যামনে প্যান্টে 'হাইগা-মুইতা' দিছে..পরীর নজর পড়ছে না! হ্যায় তখন বাড়িতে আইসা পড়ছে, আর ইশকুলে যাইতে পারে নাই। এরপর থেইক্যা মানিক ক্যামন চুপ মাইরা গেল.. খালি আকাশ দেখে- বাতাস দেখে..বুঝলেন না গো আফা? পরীর নজর পড়ছে না! মানিকের মনের উপর বশ তো!
এরপর একদিন কি হইলো..রাইতে মানিক ঘর থেকে বের হইছে প্রস্রাব করতে.. এই একটু দূরে, ধরেন দশ-বারো হাত, তখন পরী গাছ থেইকা নাইমা আসছে..মানিকের পিছন থেইকা দুই হাতের তল দিয়া আলগা কইরা উড়ায় নিছে..
ছোট খালার বাগড়া- উড়ায় নিয়েছে - সেটা কে দেখলো? মানিক?
ভাবি- কি যে কন আফা, মাইনকার কোন হুশ আছে নি? কইছে হুজুর..
ছোট খালা- হুজুর দেখছে??
ভাবি- হ! শুনেন তাড়াতাড়ি, পরী শুইনা ফালাইলে আমারে তুইলা নিয়া যাবে!
.. তারপর মানিকরে নিয়া গেছে পশ্চিমদিকের তাল গাছের মাথায়..
ছোট খালার ফোড়ন- কে দেখছে?
ভাবি- ক্যান! হুজুর! শোনেন, আমরা তো মানিকরে বিছরায় বিছরায় শ্যাষ। তারে পাইনা..যত গাছ আছে, একটা একটা কইরা পাতা তুইলা দেখছি.. মানিক নাই। এরপর বাড়িতে দাওয়াত দিছি হজুর রে.. এই হুজুর হইলো জ্বীন-পরীদের বশীকরণের উস্তাদ। হুজর আইসে চোখ বন্ধ কইরা সূরা পইড়া কইলো - মানিক বাড়ির আশে পাশে আছে.. আমরা তো ব্যাক্কল। আবর খুঁজতে গিয়ে দেখি.. বাড়ির পিছের ঝোপের মইধ্যে মানিক ঘুমাইতেছে.. আল্লাহর কি কুদরত! হুজুর আইতে না আইতেই মানিকরে দিয়ে গেছে ঐ ফুলপরী..
খালা- পরীই দিয়ে গেছে কে কইলো? মানিক?
ভাবি- হের তো হুশই নাই। কইছে হুজুর। তারপর কত দোয়া! কত সূরা পইড়া মানিকরে ফুলপরী ছাড়া করছে এই হুজুর.. হেরপর হুজুর আসন নিয়া আমাগো কইছে মানিকরে কখন ক্যামনে পরী উড়ায় নিয়ে গেছে.. বুঝছেন আফা.. একা একা বের হইয়েন না..আপনের মাইয়াদেরও কন, ঘরে থাকতে..
..এই ফুলপরীর ঢিলের গল্প শুনতে শুনতে ফিক ফিক করে হেসেই চলেছে পরমা.. পুষ্পাও.. খালাও মহা বিরক্ত.. কুসংস্কার শুনলেই তার মাথা গরম হয়..সেটার সাথে ধর্মকে কচলালে আরো রেগে যায়..কি আর করা.. যেখানে শিক্ষার প্রবেশ এখনো ঘটেনি সেখানে তাদের বিশ্বাস ভাঙানো আসলেই মুশকিল..
ঘটনাটি শুনে, হাসতে হাসতে বললাম.. আর বেশিদিন নাইরে.. কিছু দিন পর কোন উড়ন্ত ঢিল গায়ে এসে পড়লে আমরাও হয়তো ঢাকায় বসেই বলে উঠবো- ফুলপরীতে ঢিল মেরেছে.. আর চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিব- 'কান নিয়েছে চিলে' বলে .. যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়-গুলো থেকে "বিদ্যা" চর্চা অপসারিত হয়ে অপচর্চা আর কুচর্চা শুরু হচ্ছে.. তাতে করে তড়িৎ থাকলেও 'ডিজিটাল' দেশের এগিয়ে যাওয়ায় তড়িৎ-গতি থাকবে না..
হাসিটা মনের অজান্তেই থেমে গেল...
(উৎসর্গ- ছোট খেলা বাপ্পুকে, যিনি এই গল্প এতো সুন্দর করে বলেছেন এবং পুষ্পা-পরমাকে, যারা এবারও গড়াগড়ি করে হেসে গল্প বলাতে উৎসাহ দিয়েছে..)





হুম !!
পড়লাম।
?
পরী আমি ভালো পাই; পরীকাহিনী ভালু পাইছি!!

একেবারেই আমার মনেক কথাটা বলেছেন
এটা আমারো মনের কথা..
পরী আমি ভালো পাই; পরীকাহিনী ভালু পাইছি!!
এরকম গ্রামের বাড়িতে বসে এসব কলপকথা শুনতে খুব ইচছে করে আজকাল
মজারু।
গল্পটায় মজা পেলাম।
আমারো একটা পরী বিষয়ক কবিতা ছিলো
এই কুসংস্কার গুলা মানুষের মন থেকে দূর করার উপায় কি বইলা আপনার ধারণা?
আপনি আমি বা কিছু মানুষ উদ্যোগী হলেই বা কি হবে, যেখানে এফেম রেডুর মত ডিজিটাল মিডিয়ায় ঘটা করে ভুত এফেম নামক হাবিজাবি প্রচার কইরা মানুষের ভিতর কুসংস্কার ইঞ্জেক্ট করাইতেছে?
একটি মনের কথার কমেন্ট দিবো। মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানেন? ৭১ এ বুদ্ধিজীবিদের খুন করা হয়েছিল যেন দেশটা খোড়া হয়ে যায়. আর এখন বুদ্ধিজীবি তৈরিই হতে দেয়া হবে না যেন দেশটা আজীবন পঙ্গু এবং জিম্মি থাকে। অপেক্ষায় আছি- কবে নীলক্ষেতের বইয়ের মার্কেটটা পুড়িয়ে দেয়া হবে....

যদি মানুষের চিন্তা চেতনাকে এভাবে নষ্ট করার পায়তারা চলতেই থাকে, তাহলে আবার "ওঝা"- "সাঁপুড়ে"র যুগ চলে আসবে..আর যদি মানুষের চেতনার বিকাশ হতে দেয়া হয়, তাহলে পরীরা শুধুই গল্পে থাকবে..জুজু হয়ে ঘাড়ে চাপবে না...
পরীর গল্প শুনতে ভালোই লাগে কিন্তু পরে ভয় ও পাই
ভয় পাওয়ার কিছু নাই.. এগুলোর কোন ভিত্তি নেই..
পরীর গল্প ভাল পাইলাম।

বরিশালে যাওয়া হয়না অনেকদিন। এইবার গেলে দিঘীর পাড়ে আপনার ছোট খালার গল্পের পরীরে খুঁজতে হবে !
এবি থেকে একটা বরিশাল ট্রিপ হয়ে যাক..কি বলেন?
মজা লাগলো পরীর গল্প শুনে! আমার এক মামাতো ভাই কে নাকি পরীরা ধরে পরীদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল! মা'র কাছেই শুনেছি! ইসসস! আমারেও যদি নিয়া যাইতো
ফেরত দিয়েছে তো? নাকী এখনও পরীর সাথেই আছে?
পরী কাহিনী ভালো পাইলাম।
মন্তব্য করুন