শান্ত ভাই শান্ত হয়ে যাওয়ার পর...
কার্টুনিস্ট তারিকুল ইসলাম শান্ত বড় অসময়ে চলে গেলেন।
১৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে রাজাকারবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষ রা হয়নি। সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন শান্ত ভাই।
আমার কত স্মৃতি, সুখকর অভিজ্ঞতা তার সাথে।
তাকে প্রথম দেখেছি চট্টগ্রামে, বোধহয় ২০০৫ সালে। শিল্পকলা একাডেমিতে কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ কার্টুন প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলো। আহসান হাবীব, আহমেদ কবীর কিশোর, বাবলু, মেহেদী হাসান খান, হাসান খুরশীদ রুমী প্রমুখের সাথে ছিলেন শান্ত ভাইও। শান্ত ভাইকে দেখলাম ‘অকারণ গম্ভীর’। কার্টুনে যতটা প্রাণবন্ত তিনি, বাস্তবে ততটাই গম্ভীর যেন। মনে পড়ে, শান্ত ভাইয়ের সাথে সরাসরি পরিচয় হওয়ার পর বন্ধু সিরাজুল ইসলাম হৃদয়কে বলেছিলাম, ‘ছোকরা তো হ্যাভি হ্যান্ডসাম!’
আসলেই ভীষণ সুদর্শন, সুপুরুষ শান্ত ভাই। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাওয়া যায়, এমন মানুষের।
আমার সেই ‘হ্যাভি হ্যান্ডসাম ছোকরা’ না-ই হয়ে গেলো।
শান্ত ভাই দেখে যেতে পারলেন না রাজাকারদের বিচার কোন দিকে মোড় নেয়। মৌলবাদীদের ভয়াল থাবা আরো কোন কোন দিকে ধেয়ে যায়। প্রজন্ম চত্বরের তরুণরা কীভাবে জেগে থাকে, কীভাবে নাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশের ভিত।
কার্টুনিস্ট হিসেবে শান্ত ভাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা ছিলো আকাশচুম্বী। দৈনিক পত্রিকার ক্রোড়পত্র হিসেবে প্রকাশিত ফান ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বিশাল পাঠক শ্রেণি। দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় দুইটি ফান ম্যাগাজিন প্রথম আলোর আলপিন এবং যুগান্তরের বিচ্ছুতে নিয়মিত আঁকাআঁকি করতেন তারিকুল ইসলাম শান্ত। ’উন্মাদ’ তো ছিলোই। ব্যঙ্গাত্মক কার্টুনগুলোতে পাঠক পেতো অন্যরকম মজা। মজা পাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয় পাঠকের মনে।
‘কল্পদূত’ নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিলো তার। বইয়ের পাশাপাশি ফানি স্টিকার বের করতো কল্পদূত। প্রতি বছর একুশের বইমেলায় দেখতাম কল্পদূতের স্টল। কখনো কখনো পেছনে, আড়ালে বসে থাকতেন শান্ত ভাই। মনে হয়, কেন যেন নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করতেন তিনি। সেই আড়ালে থাকা মানুষটি চিরতরে আড়াল হয়ে গেলেন! তাকে আর আমরা পাবো না, দেখবো না অসম্ভব হিউমারসমৃদ্ধ কার্টুন, লেখনী।
প্রতিভাবান এ শিল্পীর অকাল মৃত্যুর জন্য অবশ্যই রাজাকার এবং মৌলবাদী গোষ্ঠী দায়ী। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় আনতে হবে। নইলে শান্ত ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে না। শান্তি পাবে না বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।
শান্ত ভাইয়ের মৃত্যুর পর মৌলবাদীরা থামেনি। তাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা মন্তব্য করছে। যেমন করছে জামায়াত শিবিরের হাতে খুন হওয়া ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনের নামেও।
মৃত কোনো মানুষকে নিয়ে কটূক্তি করতে হয় না, এই বোধবুদ্ধিটুকুও যাদের নেই, তারাই আবার চড়া গলায় কথা বলে! ধর্মের ফেরিঅলা সাজতে চায়!
ধিক মৌলবাদী, ধিক! ধিক রাজাকার, ধিক!





শান্ত ভাইয়ের মৃত্যুকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। তিনি এক জন পুরো দস্তুর সাংস্কৃতিক কর্মী। শান্ত ভাই যেখানেই থাকেন, যেন খুব ভালো থাকেন।
মানুষ আর মানুষ নাই
ধিক মৌলবাদী, ধিক! ধিক রাজাকার, ধিক!
মন্তব্য করুন