কিমিত ক্রমান্বয়
ইব্রাহিমের সামনে ধিরে ধিরে ঘুমের ঘোর পাতলা হতে লাগলো। তার মনে হলো এখনো শরীরে চরম আলস্য লেগে রয়েছে। সে আবার চোখ বন্ধ করে। মনে হয় এই অতলান্তিক অন্ধকারটায় যেন ভাসছে, আর ভাসছে। আবার চোখ খোলে ইব্রাহিম। এই ঘরটার একটা মাত্র জানালা। সেখানে ঝুলছে ভারি কালো রংয়ের পর্দা। বাইরে সবে মাত্র অন্ধকার ধরে এসেছে। আলোর আভাস মিলিয়ে যায় নি এখনো। এখানে ওখানে নানান জিনিষের বিভিন্ন আকারের ছায়া। ইব্রাহিম শুয়ে শুয়ে সেসব ছায়া দেখতে থাকে। ঘরের পাতলা অন্ধকারকে স্পর্শ করে সে। ছায়াগুলো নরম, পাতলা, তুলতুলে কোনটা আবার ককর্শ। ঘরে কোন বাতি নেই। ইব্রাহিম উজ্বল আলো সইতে পারে না। তার কালো কিংবা অন্ধকার ভালো লাগে। সে অন্ধকারে নিজেকে নিরাপদ ভাবে। উজ্বল আলো দৃষ্টিসীমায় আলোর বন্যা আনে। ইব্রাহিমের ভালো লাগে না তা। সে তার বাক্স ভর্তি করে অন্ধকার জমিয়ে রাখে। কত মানুষ কত ধরনের শখের কারবার করে । ইব্রাহিমের শখ অন্ধকার। সে স্বযতনে অন্ধকার পোশে। অন্ধকারগুলো তার মনে হয় জীবন্ত। আর ইব্রাহিম জানালার দিকে এগিয়ে যায়। জানালার মোটা ঠান্ডা গ্রিলের বাইরে হাত দেয়। বাইরের ভেসে চলা নরম অন্ধকারে যেন হাত ডুবে যায় তার। সে আঁজলা ভরে শূণ্য থেকে অন্ধকার নেয়। তারপর ঘরের এক কোণে থাকা সুদৃশ্য বাক্সটা খোলে। বাক্সের ভেতরে থিক থিক করছে বিভিন্ন রকমের অন্ধকার। পরম যতেœ ইব্রাহিম আরো কিছু অন্ধকার রেখে দেয় সেখানে। নামিয়ে রাখা অন্ধকারে বাক্সের ভেতরের আঁধার আরো গাঢ় হয়। ইব্রাহিম মুগ্ধ চোখে দেখে ওসব। এমন সময় ঘরের পুরোন ভারি কাঠের দরজা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে যায়। মুখে গ্রীস্মের ফুটি ফাটা মাটির মত অসংখ্য বলি রেখা নিয়ে ঘরে ঢোকে এক বৃদ্ধ। ইব্রাহিমের এই জীবনের একমাত্র সঙ্গী। বুড়ো হেফাজ তার নাম। অদ্ভুত আলখাল্লার মত একটা পোশাক তার পড়নে। গাঢ় ধুসর রং তার। বুড়ো হেফাজের হাতে একটা মোমদানি। মোমের আলোতে ইব্রহিমের চোখে কষ্ট হয়। সে দু হাতে চোখ ঢাকে। বুড়ো হেফাজ নিচের দিকে তাকিয়ে বলে- ঠিক হয়ে যাবে বাবা। সহ্য হয়ে যাবে। ইব্রাহিম বুড়ো হেফাজের দিকে এগিয়ে আসে।
বাইরে কুকুর ছাড়া হয়েছে? বুড়ো হেফাজ মাথা নেড়ে হ্যাঁ উত্তর দেয়।
বিশাল এই দুর্গের মত বাড়িটাতে ৪টি মাত্র প্রাণীর বসবাস। ইব্রাহিম, হেফাজ, আর দুটি বিশালকায় কুকুর। প্রতি সন্ধ্যায় ওগুলোকে বাড়ির উঠানে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্ধকারে পায়চারি করে ওগুলো। আঁধারে কুকুরগুলোর চোখ জ্বলতে থাকে। ইব্রাহিমের ওই জ্বলজ্বলে জান্তব চোখ দেখতে ভাল লাগে। বুড়ো হেফাজ ইব্রাহিমের পাশে এসে দাঁড়ায়।
বাবা চোখেতো সয়ে গেছে। এবার তাকাও, তোমার নামে একটা চিঠি এসেছে।
বুড়ো হেফাজ ইব্রাহিমের দিকে একটা খাম এগিয়ে দেয়। তার চোখে মোমের আলো সয়ে এসেছে। সে খামটা খোলে। চিঠি লিখেছে কবি সেকেন্দার। মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকে ইব্রাহিম।একটা অদ্ভুত ছায়া নিয়ে কাঁপছে শিখাটা। বুড়ো হেফাজ কোন কথা না বলে চলে যায়। ইব্রাহিম কবি সেকেন্দারের চিঠি পড়তে শুরু করে।
সুজনেষু
সেদিন আবার আপনার লেখাটা পড়লাম। আঁধার নিয়ে এত চমৎকার দৃশ্য বর্ণন এর আগে পড়িনি কখনো। অন্য কিছু কি আর লিখছেন না? আপনার সাথে দেখা করবার ইচ্ছা আছে। সময় সুযোগ করে আসবো এক সময়। আমি নগন্য একজন কবি। আমার সদ্য লেখা একটি কবিতা পাঠালাম। দয়াকরে পড়ে যদি কোন মন্তব্য দেন তবে কৃতজ্ঞ থাকবো।
চিঠির শেষ সুন্দর কালো অক্ষরে একটা কবিতা লেখা। কবি সেকেন্দারের আলো কবিতা।
স্পর্শ রেণু অন্ধকারেও স্পর্শের খোঁজে আলো
কোন বিজনের মধুমাখা সুখ রঙ্গীন সাদাকালো
চিহ্ন বিহীন চিহ্নের এই সমন্বিত মধু
অস্তিত্বের চোখে চোখে আলোকমালার বধু
প্রস্ফুটিল সেই সময়ে গুঞ্জে ফুলে অলি
ষোলকলার আবির্ভাবে পূর্ণ দিপাবলী
যাক ভেসে যাক এই বন্যায় সংক্রমনের ঘর
উড়–ক উড়–ক আলোর পাখিরা রৌদ্রের ভিতর।
ইব্রাহিম কবিতাটা আবার পড়ে। মনে মনে সে বলতে থাকে কবিতার একটা লাইন। ষোল কলার আবির্ভাবে পূর্ণ দিপাবলী। অথবা পূর্ণ দিপাবলী ষোল কলার আবির্ভাবে। সে কাগজটা ভাঁজ করে রাখে। বাইরের পরিবেশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরও অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। আসবাবপত্রগুলোর বিভিন্ন আকারের ছায়া তৈরী হয়েছে মোমের সল্প আলোয়। ইব্রাহিম চিঠির কাগজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। তারপর আবার অন্ধকারে বাক্সটার কাছে আসে। মোমের আলো বাক্সটার গায়েও ছায়া ফেলেছে। বাক্সের ভেতরে থিকথিক করছে বিভিন্ন ধরনের অন্ধকার। সে হাত দিয়ে অন্ধকারগুলো নাড়তে থাকে আর বিরবির করে বলতে থাকে একটু আগে পড়া কবিতার লাইন- উড়–ক উড়–ক আলোর পাখিরা রৌদ্রের ভিতর। আলোর পাখি! রৌদ্রের ভিতর। রৌদ্র শব্দটা মনে আসতেই ইব্রাহিমের মনে হয় তার চোখ উজ্বল সূর্যের আলোতে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। কবি সেকেন্দার উঠতি কবি এই শহরের। ইব্রাহিম সাধারণত ঘর থেকে বের হয় না। কারো সাথে তেমন সখ্যও নেই তার। তবু কৌতুহল বশেই সে একবার স্থানীয় এক পত্রিকায় লেকা পাঠিয়েছিলো। তখন সে জানতো না কবি সেকেন্দার ওই পত্রিকার সম্পাদক। কবিতাটার নাম ছিলো অন্ধ অমানিশা। কে জানে হয়তো কবি সেকেন্দারের ওটা ভালো লেগেছিলো। এরপর থেকে লোকটা কোনভাবে ওর ঠিকানা যোগাড় করেছে। সে প্রায়ই এখন ইব্রাহিমকে চিঠি লেখে। লোকটার চিঠির যন্ত্রনায় ইব্রাহিম বাধ্য হয়ে আরেকটা লেখা পাঠিয়েছিলো। সেই থেকে যন্ত্রনাটা না কমে বরং আরো বেড়ে গেছে। সে কখনোই সেকেন্দারের চিঠির জবাব দেয়নি। আজ তার হঠাৎ মনে হয় লোকটার একটা চিঠির উত্তর দিলে কেমন হয়। সে লক্ষ্য করেছে, লোকটার সব লেখার মধ্যেই একটা ঔজ্বল্য আছে। পৃথিবীর সব কিছু যেন লোকটাকবিতা দিয়ে আলোকিত করে দিতে চায়। ইব্রাহিমের আলো ভালো লাগে না। সে চীর অন্ধকারের মানুষ। আলো তাকে কষ্ট দেয়, সে বিপন্ন বোধ করে। ইব্রাহিম অন্ধকারের বাক্স থেকে এক মুঠো অন্ধকার তুলে নিয়ে চোখের সামনে ধরে। নিকষ অন্ধকারের মাঝেও একটা চিকচিকে আলো জ্বলছে সর্বক্ষণ। সে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকা প্রেতের ছায়ার মত অন্ধকার মেশায় তাতে। কালো অন্ধকার আরো কালো হয়। তারপর আবার সেগুলো বাক্সে ভরে ডালা বন্ধ করে রাখে। এ সময় দরজায় টোকার আওয়াজ হয়। ইব্রাহিম পেছনে তাকিয়ে দেখে ঘরে ঢুকছে চাতক। চাতকের গায়ে উজ্বল রঙের শার্ট। এই অন্ধকারেও মনে হয় যেন তার চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছে শার্টের রঙে।
দুখিঃত তোমার অনুমতি না নিয়েই ঘরে ঢুকে পড়লাম। কি করছিলে? সেই অন্ধকার, খেলছিলে অন্ধকার নিয়ে। চাতক একটা চেয়ারে বসে পড়ে জ্বলতে থাকা মোমের আগুন দেখতে থাকে মনোযোগ দিয়ে। ওর মুখে আগুনের কমলা আঁচ ইব্রাহিমকে কষ্ট দিতে থাকে। চাতক ইব্রাহিমের কেউ নয়। না বন্ধু না আত্মীয়। তবু যখন তখন কেমন করে যেন সে ঢুকে পড়ে ইব্রাহিমের ঘরে। ছেলেটার চেহারা সুন্দর। মুখে সবসময় একটা আলোকিত হাসি লেগে থাকে। কিন্তু ইব্রাহিম ওকে পছন্দ করে না। আবার চাতকও পছন্দ করে না ইব্রাহিমকে। তবু কেন যেন ছেলেটা বার বার আসে তার কাছে। তার মনে হয় সে যেন অসহ্য কৌতুহল বোধ করে চাতকের প্রতি। তবু সে বুড়ো হেফাজকে বলে রেখেছে কোন ভাবেই যেন কেউ তার ঘরে না ঢুকতে পারে। তবু কোন ফাঁকে যেন ছেলেটা একঝাঁক আলো হয়ে ভাসিয়ে দিয়ে যায় ইব্রাহিমের ঘর। বুড়ো হেফাজ কিংবা কুকুর দুটো কখনো আটকাতে পারেনি ওকে।
কি ভাবছো, আমাকে একদম আশা কর না তাই না। মোমের আগুনে আঙ্গুল দিতে দিতে সে বলতে থাকে। তবু আমি আসব। বিশ্বাস করো তোমাকেও আমার একদম পছন্দ নয়। তুমি একটা অন্ধকারের কিট। তোমাকে পছন্দ করবার কোন কারণ নেই। তবু কে যেন আমাকে ধরে বেঁধে নিয়ে আসে তোমার কাছে।
ইব্রাহিম তার দিকে তীক্ষè চোখে তাকিয়ে থেকে বলে- কি চাও আবার? চাতক উঠে দাঁড়ায়, তারপর অট্টহাসি হেসে উঠে। ইব্রাহিমের মনে হয় চাতকের হাসির সাথে যেন খুব উজ্জল এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে যায়। সে দুই হাতে মুখ ঢাকে। চাতক ইব্রাহিমকে খেয়াল করে। সে বলে-তুমি কি আমাকে ভয় পাও?
না আমি তোমাকে ভয় পাই না। তোমার হাসির আলোক কখনোই এই বিশাল অন্ধকারকে দুর করতে পারবে না।
চাতক আবার হেসে উঠে। তবু আলোকই শ্বাশত। জগতের সৃষ্টি আলোতে। তাই অলোর সন্তানদের জন্য তা অবারিত।
জগতের সৃষ্টি আলোতে হলেও তার স্থিতি কিন্তু অন্ধকারে। আর্লো কেবলই কোলাহলময়। আর অন্ধকার, এই যে দেখ রাত কি সুন্দর নির্জিব, শান্ত। ইব্রাহিম তার ঘরের সামনের বড় বারান্দাটায় চলে আসে। চাতক তার পেছনে। চেয়ে দেখ আকাশে, ওই যে মহাশূণ্য, কি বিশাল অন্ধকারের জগৎ। শান্ত এবং অবিনশ্বর।
তবু আলোর কাছে সবসময় হারতে হয়েছে অন্ধকারকে। এটাই নিয়ম ইব্রাহিম।
না আলো কখনোই মুছে দিতে পরেনি অন্ধকার। যেটুকু আলোকময়, মনে রেখো তার ইতিহাস। তার পেছনে কেবলই অন্ধকার। আর ভবিষ্যত- একএকটি গনগণে আগুনের সূর্যকেও নিভে যেতে হয় কোন এক দিন। তারপর আলো হারিয়ে সে কিন্তু আশ্রয় খোঁজে অন্ধকারেই। অতঃপর কৃষ্ণগহ্বর।
চাতক আবারো মুচকি হাসে। রাতের পর কিন্তু আবার দিন।
তীব্র রাগে ইব্রাহিম চিৎকার করে উঠে। হ্যাঁ দিনের পর আবার রাত। কে তুমি? কেন বার বার আসো আমার কাছে? কি চাও? আমার তর্ক করতে ভালো লাগছে না। আমি একা থাকতে চাই।
কেন যে আমি আসি, তা যদি আমি জানতাম তবে তোমার মত আঁধারের ঘৃণ্য প্রাণীর কাছে কখনোই আসতাম না। চাতক তীব্র ঘৃণায় বাইরের অন্ধকারে এক দলা থুথু ছুঁড়ে দেয়। তারপরও কেন যেন তোমার কাছেই আমার আসতে হয়।
কেন কি কারণে ? ইব্রাহিম অন্ধ রাগে গজরাতে থাকে।
হয়তো কোন আকর্ষন। যে আকর্ষন আদি এবং মনে হয় অকৃত্তিম। কালোর প্রতি যেমন আলোর তীব্র আকর্ষন অথবা আলোর প্রতি কালোর।
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো। তাই হবে হয়তো। ঠিক যেমন রাতের প্রতি দিন আর দিনের প্রতি রাতের আকর্ষন। ইব্রাহিম শান্ত হয়ে আসে। তবু তার চাতককে অসহ্য লাগে। চাতকের হাসি, চলাফেরা, পোশাক, কথা বলা সব কিছু থেকেই যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে আলো। সে বারান্দার রেলিং খামচে ধরে। অনুরোধ করছি, তুমি আর আমার কাছে এসো না। তুমি যাও।
আমিও তোমার কাছে আর কোন দিন আসতে চাই না। তবু আসতে হয়। চাতক উঠে দাঁড়ায়।
কিন্তু কেন?
কে যানে হয়তো নিয়তি। আলো এবং অন্ধকারের চীরকালিন নিয়মে তুমি আমি হয়তো বন্দি হয়ে গেছি। আজ আমি যাচ্ছি ইব্রাহিম। আমিও আর কোন দিন তোমার মুখ দর্শন করতে চাই না। তবে ইমিয়াকে নিতে আমি আবার আসবো।
ইমিয়ার কথা আসতেই ইব্রাহিম চমকে উঠে। তার মনে হয় কানের সামনে দিয়ে যেন ছুটে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ আরবি ঘোড়া। সে দাঁতে দাঁত চেপে চাতকের দিকে এগিয়ে যায়। ইমিয়াকে তুমি কখনোই পাবে না। আমি কখনোই দেব না ওকে। কারণ ও আমাকেই ভালবাসে।
চাতক আবার অট্টহাসি হাসে। ইব্রাহিম তার হাসির চমকে ছটফট করতে থাকে। চাতক তার চোখে চোখ রেখে বলে- তোমার ধারনা ভুল। মেয়েটা আলোর পূজারি। আর আমিই সে আলোকিত মানুষ। সে আমাকেই ভালবাসে।
না, ইমিয়া অন্ধকারেই সুন্দর।প্রচ্ছন্ন ছায়ার মত ও। সে কখনোই তোমার নয় চাতক।
শোন ইমিয়াকে আমি আলো দিয়েই জয় করে নেব। তোমার মত অন্ধকারে বন্দি করে নয়। বিদায়।
চাতক চলে যায়। ইব্রাহিম আচ্ছন্নের মত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সে ঘরে ঢুকে ফু দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দেয়। তার মনে হয় মেঘের মত অন্ধকারেরা ভাসতে ভাসেতে ঘিরে ধরেছে ওর শরীর। সে হাত দিয়ে সেই পেলভ অন্ধকারগুলো ছুঁয়ে দেখতে দেখতে ভাবতে থাকে।
ইমিয়া আব্রাম। উচ্ছল সুšদর এক তরুণী। পৃথিবীতে মাত্র এই একজনকেই নিজের বলে ভাবতে পারে ইব্রাহিম। ওর মনে হয় ইমিয়াকে নিয়ে সে যুগের পর যুগ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে অন্ধকারে। মেয়েটাও হয়তো ওকেই ভালবাসে। কারণ ইমিয়া যখন আসে তার ঘরে তখন ইব্রাহিমের মনে হয় যেন আঁধার আমবশ্যার আকাশে যেন চিকচিক করছে কোটি কোটি তারা। মেয়েটা কোথায় যেন কাজ করে। ক্লান্তি ওকে ছেয়ে ধরেছে। এই তো গত রাতে যখন ইমিয়া এলো ইব্রাহিমের ঘরে, তখন সে জমানো অন্ধকার নিয়ে খেলছিলো আনমনে। মেয়েটা পা টিপে টিপে এসে আলতো করে টোকা দিয়েছিলো ওর পিঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো ইমিয়ার কথাই তখন ভাবছিলো সে। তার স্পর্শ পেয়ে ইব্রাহিমের মনটা আনন্দে নেচে উঠেছিলো। ইমিয়ারে চোখে মুখে তখনো সারাদিনের একঘেয়ে কাজের ক্লান্তি। ওর সুন্দর মুখটা ক্লান্ত আর বিষন্ন দেখায় এই সব মুহূর্তে। ইমিয়া ইব্রাহিমের জমানো অন্ধকার দেখতে দেখতে বলেছিলো- আবার তোমার কাছেই এলাম। সারাদিনের কোলাহল, ক্লান্তি অসহ্য হয়ে উঠেছিলো। এসা, উঠো বসে থেকো না স্থবিরতায়। অন্তত যতক্ষণ আমি আছি।
মেয়েটা ইব্রাহিমের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো বারান্দার প্রগাঢ় আঁধারে। তারপর মিষ্টি হেসে বলেছিলো- তোমার কাছে কেন আসি জানো?
ইব্রাহিম মোহাবিষ্টের মত দেখছিলো ইমিয়ার আঁধার অবয়ব। তারপর বলেছিলো-কেন? নিশ্চই তুমি অন্ধকার ভালোবাসো। আমার অন্ধকার জগতই টেনে আনে তোমায় ইমিয়া।
অন্ধকারে ইমিয়ার খিলখিল হাসি শোনা যায়। না, ইব্রাহিম না। আমি আলোতেও আছি, আবার অন্ধকারেও আমার গমন। তোমার কাছে আমি আসি নির্জনতার খোঁজে। আমার যেমন চাই আলোর কোলাহল , তেমনই চাই অন্ধকারের নির্জনতা।
তুমি ঠিকই বলেছ, আঁধার বড্ড নির্জন আর রহস্যময়। ঠিক তোমার মত।
ইমিয়া ইব্রাহিমের কাছে এগিয়ে এসে বলেছিলো- আমি? রহস্যময়?
হ্যাঁ, অন্ধকারের মত। মনে হয় হাতরেই শুধু সারা। স্পর্শ আর মেলে না কোনদিন। আচ্ছা ইমিয়া, তুমি কি আমায় ভালোবাসো?
মেয়েটা বারান্দার এমাথা থেকে ওমাথা হাঁটছিলো। সে ইব্রাহিমের প্রশ্ন শুনে থমকে দাঁড়িয়ে বলেছিলো-হ্যাঁ বাসি ইব্রাহিম। তোমাকে আমি সত্যিই খুব ভালোবাসি। আবার চাতককেও ভালোবাসি আমি।
ইমিয়ার মুখে চাতকের নাম শুনে ইব্রাহিমের ভালো লাগে না। সে বাইরের জমাট অন্ধকারে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলো-না, চাতককে ভালোবাসতে পারো না তুমি।
পারি, ইব্রাহিম পারি। আমি যে আলো অন্ধকার নিয়েই বাঁচতে চাই। কেবল আলো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। আর দীর্ঘ অন্ধকার ক্লান্ত করে আমাকে।
না ইমিয়া, তবু আলো অন্ধকার আলাদা চীরদিনই।
ইব্রাহিম আমি তোমাদের মাঝেই বাঁচতে চই। তোমরা আসলে আলাদা কেউ নও। তোমরা একে অপরের ভিন্ন রুপ।
তবু ইমিয়া তুমি অন্ধকারেই সুন্দর। আমার অন্ধকার জগতে এসো ইমিয়া, এসো। উব্রাহিম ইমিয়ার দিকে বাহু প্রসারিত করেছিলো। কিন্তু ইমিয়া আসেনি। সে বলেছিলো, না, কেবল অন্ধকারে আমি ধরা দেব না কখনো।
তবু তুমি আমার কাছেই এসো ইমিয়া। আমার কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ আরাধ্য তুমি। যেও না আমায় ছেড়ে।
ইব্রাহিম আলো বিহিন অন্ধকার কলঙ্কের মত। আর অন্ধকার বিহিন অলো কেবলই বৈধব্যের দৃশ্যসাজ।
ইব্রাহিম উৎগ্রীব হয়ে বলেছিলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি ইমিয়া। খুব খুব খুব ভালোবাসি।
আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি ইব্রাহিম। কিন্তু কি করবো বলো একই রকম খুব ভালো যে বাসি চাতককেও
ইব্রাহিম ইমিয়াকে বোঝাতে পারেনি। এতক্ষণ ইমিয়ার ভাবনায় খেয়াল করেনি সে। নিচে কুকুর দুটো করুন সুরে কাঁদছে। ইব্রাহিম ওর বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে অনুভব করে রাত বাড়ছে ধিরে ধিরে। ঘরের অন্ধকারগুলোও যেন পরম যতেœ ছায়া দিচ্ছে ওকে। বুড়ো হেফাজ দরজা ঠেলে আবার ভেতরে ঢোকে। সে নিভে যাওয়া মোমটা বাইরে থেকে ধরিয়ে আনে আবার। ইব্রাহিম আলো থেকে বাঁচতে চোখ ঢেকে শুয়ে থাকে। বুড়ো হেফাজ বলে-বাবা রাত বাড়ছে, খাবে না? চল উঠো বাবা।
না হেফাজ আজ কিছু খাব না আমি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো কিছু?
কই বাবা কিছ্ইু তো শুনতে পাচ্ছি না।
শুনতে পাচ্ছ না অন্ধকারের শব্দ। শোন হেফাজ, কান খাড়া করে শোন। সব অন্ধকারেরই ভাষা আছে। আজকের রাতটা দেখ, কেমন নিস্তব্ধ আর রহস্যময়। ওই যে ওইদিকে যে ছায়াগুলি, দেখ কেমন কানাকানি করছে ওরা। আজ রাতে কি কিছু ঘটতে চলেছে হেফাজ?
কিউ বা ঘটবে আজ রাতে। এসব তোমার বাবা কল্পনা।
আচ্ছা হেফাজ, তোমারও কি অন্ধকার ভালো লাগে? আমার মত। ঘন কালো নির্জন অন্ধকার।
বুড়ো হেফাজ যেন এ কথাটার জন্য প্রস্তুুত ছিলো না। সে দেয়ালে মোমের কম্পমান আলোতে ছায়া দেখে নিজের। ইব্রাহিম লক্ষ্য করে বুড়ো হেফাজের বয়সের মত দেয়ালে ওর ছায়াও যেন জীর্ন। ঠিক যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা বুড়োটার। আচ্ছা, মৃত্যু কি অন্ধকার! নাকি অন্ধকারই মৃত্যু? হেফাজ দেয়ালে নিজের ছায়ার উপর হাত রেখে ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে- আমি জানি না বাবা আমার অন্ধকার ভালো লাগে কিনা। তবে তোমার এই অন্ধকারেরও একটা মায়া আছে। এই আমার মুখের দিকে দেখ, সময় কত আলোর ভাঁজ ফেলে গেছে। অথচ জানো আমিও আলো ভয় পাই। জীবন প্রদিপ এখন আমার ওই মোমের শিখার মত। এই যে অন্ধকার তুমি পুশে রাখো, সেটা ক্ষণস্থায়ী, বড্ড হালকা। সবচেয়ে দীর্ঘ আর পরম অন্ধকার হলো জীবনের শেষ প্রান্ত।
হেফাজ তুমি সেই প্রান্তে পৌছাবার অপেক্ষায় আছো না? সেই প্রান্তের জন্য আমিও অপেক্ষা করছি। পরম অন্ধকার, অতলান্তিক। জানো, ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে , মনের বোতলে ছিপি এঁটে আমি সমস্ত আরো বন্ধ করেছি। শুধু হারাতে পারিনি ওই একটি আলোকে। হেফাজ তুমি ইমিয়াকেতো চেনো। ওকে আমি ভালোবাসি। আমার ভেতরের সমস্ত অন্ধকার শুধু ওর প্রতিক্ষাই করে। ওর প্রতিটি পদক্ষেপ, আঁধার অবয়ব সব কিছু ভালোবাসি আমি।
বাবা, সে তোমার কেউ নয়। ইমিয়া তুমি নিজেই। তুমি নিজেই তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে ফেরো। তুমি আসলে একা। অন্ধকারের একা মানুষ। তুমি নিজের জন্যই নিজেকে ভালোবাসো।
হঠাৎ ইব্রাহিম রেগে যায়। সে বুড়ো হেফাজের দিকে তীব্র চোখে তাকায়। হেফাজ কোন কথা না বলে নিঃশব্দে ঘর থেকে চলে যায়। ইব্রাহিম স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। হঠাৎ তার চোখ পড়ে কবি সেকেন্দারের রেখে দেয়া চিঠিটার উপর। সে চিঠিটা হাতে নেয়। কবিতার শেষ লাইনটা আলো নিয়ে লেখা। সে লাইনটা বিড়বিড় করে কয়েকবার বলে। ইব্রাহিম স্পস্ট বুঝতে পারে কবি সেকেন্দার কবিতাটা লেখার সময় মনের গহিনে তীব্র আলো নিয়ে লিখেছে। ইব্রাহিমের অসহ্য বোধ হয়। সে চিঠিটা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে। কবি সেকেন্দারকে চেনে না ও । দেখেও নি কোনদিন। তবু ওর প্রতি লোকটার এত আগ্রহ কেন! একটা মাত্র কবিতার সূত্র ধরে ইব্রাহিমকে চিঠি লিখছে সে। নাকি শেষ আলোর নিঃশেষিত লেখক লোকটা। ইব্রাহিম কখনোই সেকেন্দারের চিঠির জবাব দেয়নি। আজ সে ঠিক করে একটা ফিরতি জবাব সে লিখবে। ইব্রাহিম কাগজ কলম নিয়ে বসে।
জনাব,
চিঠি পেয়েছি। আপনার কবিতা সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবো না। কারণ ওটা আমার ঠিক বিপরীত। দয়া করে আমার সাথে দেখা করতে আসবেন না। আলো দিয়ে কবিতা লেখেন আপনি। আলো দিয়েই চাষ করেন কলমের প্রান্তর। আলো কিন্তু শ্বাসত নয়। মনের ভেতর আরো একটু উঁকি দিয়ে দেখুন- কত রহস্যময় অন্ধকারের বাস সেখানে। কলমে বর্ণনা করুন তাদের। দেখবেন কেমন অবারিত প্রশ্নের দুয়ার লুকিয়ে সেখানে। সবশেষে আপনার জন্য একটা উপহার পাঠালাম। ঝড়ি ভর্তি অন্ধকার আর অমানিষার কবিতা। বিদায়-
মুক্ত অমানিষা মধ্য প্রান্ত জুড়ে
আদ্যপ্রান্ত আঁধারের ঘর বাস
এমন অলক্ষ্য অল্প কিছু দুরে
দিনের শেষ রাত্রির উদ্ভাস।
অবয়ব মাখা অপার্থিব হাতছানি
শেষ ভুলের এমন একটু খুত
হাসির মধ্যে কোন খানে না জানি
চাষ চরেছে ফসলের কিম্ভুত।
ইব্রাহিম কবিতাটা লিখে শান্তি বোধ করলো। কবি সেকান্দারের জন্য উপযুক্ত এটা। সে ঘরের কোণে থাকা অন্ধকারের ডালা খোলে। বাক্সের ভেতর থিকথিকে অন্ধকারে সে হাত ডোবায়। মুঠো ভরে গন্ধ নেয় অন্ধকারের। তারপর একটা পুটলিতে ভরে নেয় কিছু। এটা কাব সেকান্দারকে উপহার পাঠাবে সে। ইব্রাহিম বুড়ো হেফাজকে ডাকে। সে পুটলি আর চিঠিটা দেয় ওকে কবি সেকান্দারের ঠিকানায় পোস্ট করতে। বুড়ো হেফাজ চলে যায়। ইব্রাহিম ফু দিয়ে মোমটা নিভিয়ে দেয়। ঘরে আবার জমাট বাঁধতে থাকে অন্ধকার। একটু আগে কবি সেকান্দারের জন্য লেখা কবিতাটার কথা মনে পড়ে ওর। মাঝে মাঝে এই কবিতা লেখার নেশা পেয়ে বসে ওকে। ওর মনে হয় পৃথিবীশুদ্ধ কলমের কালি খরচ করেও শেষ হবে না কবিতায় অন্ধকার বর্ণন। ইমিয়াকে নিয়েও সে কবিতা লেখে। লাইনের পর লাইন সে বর্ণনা দেয় ইমিয়া নামের সেই আঁধার সুন্দরীর।
ইব্রাহিম ইমিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে খেয়ালই করেনি কখন চাতক আবার এসে ঢুকেছে ওর ঘরে। তার মুখ উজ্বল। যেন গণগনে একটা সূর্য প্রচন্ড্র আলোর অহঙ্কারে অন্ধকারকে ব্যাঙ্গ করতে করতে হাসছে।
আবার তোমার কাছে আসতে হলো ইব্রাহিম। কেন এসেছি, কি কাজে এসেছি জানি না। শুধু এতটুকু জানি আসতে চাই নি কখনো এই নরকে আর।
চাতককে দেখে ইব্রাহিম রেগে যেতে থাকে। ওর াালোকময় মুখের তীব্রতা যেন সুঁইয়ের মত বিদ্ধ করতে থাকে ইব্রাহিমকে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে-
আসতে চাওনি, তবু কেন এলে? নাকি আলোর অহঙ্কার শেষ হবে কালোতে এসেই।
ভুল ইব্রাহিম, ভুল মানুষ তুমি। কালোতে এসে শেষ হয় না আলো। বরং দুর করে অন্ধকার।
চাতক তুমি চলে যাও এখান থেকে। আলো আর অন্ধকারের যুদ্ধে আমি ক্লান্ত।
আমিও চলে যেতে চাই ইব্রাহিম। আমারও ভালো লাগে না এই মৃত্যুর মত অন্ধকার। আমি শুধু চাই আলোকময় জীবন। আনন্দ আর জীবনের অপার সম্ভাবনা। যে সম্ভাবনা আমাকে স্বপ্ন দেখতে শেখায় ইমিয়ার। আমি আর ইমিয়া বাঁচতে চাই একসাথে, আলোকধারা মাঝে।
চাতক ইমিয়ার কথা বলতেই ইব্রাহিমের মনে প্রচন্ড্র ধাক্কা লাগে। মনে হয় উজ্বল এক পাথরের তলায় চাপা পড়ে গেছে ওের নিশ্বাস। সে তার বিছানায় চুপ করে বসে। তারপর বলে-
তুমি ইমিয়াকে কখনোই পাবে না চাতক। ইমিয়া কেবলই অন্ধকারের। ওকে আমি নিজেই গড়েছি অন্ধকারের মমতায়। দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ আমি আঁধারের পটে রাত্রির রঙ দিয়ে এঁকেছি ওর ছবি। ওর হাতে দিয়েছি রাত্রির সুষমা। চোখে কালো কাঁজল। ওর মুখে দিনের পর দিন হন্য হয়ে খুঁজেছি প্রশান্তির মানচিত্র। ইমিয়া আমার অন্ধকার আকাশের মধ্যমনি। আমি ভালোবাসি ওকে। ইমিয়াকে তুমি কখনো পাবে না চাতক।
ইব্রাহিম আমিও ভালোবাসি ওকে, ঠিক আমার মত করে। আমিও দিনের পর দিন ওকে দেখেছি আলোর বিভায়। ওর হাসি, ঔজ্বল্যতা, প্রাণশক্তি প্রতি মুহূর্তে আমাকে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে আমাকে আবার। ওকে আমি দেখেছি সূর্যে, ওর স্পর্শ আমি অনুভব করেছি অনুভুতিতে। ও আমাকে শিখিয়েছে আলোর রঙধনু। ও শুধু আমার কাছেই আসবে।
ইব্রাহিম আর চাতক এরপর কেউ কোন কথা বলে না। ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে একে অপরের। দুজন শুধু অনুভব করে দুজনের অস্তিত্ব। ওদের দুজনেরই মনে হয় ইমিয়ার কথা। ওরা একই সাথে দুজনেই যেন অসহায় বোধ করতে থাকে। সত্যি ইমিয়া যাবে কার কাছে! আলো নাকি অন্ধকারে? ওদের মনে হয় ব্রক্ষান্ড জোড়া এক বিরাট সাপ যেন নিজের লেজ থেকে গিলতে শুরু করেছে নিজেকেই। ইব্রাহিম বলে,
মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো? মনে হয়, আমরা দুজন যেন অবতীর্ন হয়েছি এক ভয়ঙ্কর জুয়ায়। আলো আর অন্ধকারের ভয়ঙ্কর পাশা খেলা।
কিন্তু ইব্রাহিম এ খেলায় জিততে আমাকে হবেই। কারণ ইমিয়া না থাকলে তো তুমিই জিতে গেলে। আমার পৃথিবী তখন ঢেকে যাবে অন্ধকারে। আমি ইমিয়াকে হারাতে পারবো না।
তুমি কৃষ্ণগহ্বরের নাম শুনেছ চাতক? সে জানে কিভাবে আলোর শেষ বিন্দু চুষে নিতে হয়। ইমিয়াকে পেতেও আমি তাই করবো। আধাঁর যেমন প্রশান্তি আর নির্জনতার। তেমনি াাঁধার ভয় আর হিংসারও প্রতিক।
ওরা একে অপরকে ঘিরে ঘুরতে থাকে। ইব্রাহিমের মনে হয় ঘরের অন্ধকার যেন ক্রমেই আরো কালো হচ্ছে। সে বড় করে নিশ্বাস নেয়। অন্যদিকে চাতকের মনে হয়, একটা তীব্র গতির আলো যেন পার হচ্ছে অন্ধকার সুরঙ্গ। সামনে যেন শুধু অন্ধকার, কিন্তু গতি ক্রমেই পেছনে ফেলছে ওটাকে।
সত্যি তুমি কে চাতক? কবে কখন কোথায় প্রথম মিলেছিলাম আমরা? আলো আর অন্ধকারের মধ্য সীমারেখায়, নাকি...
প্রশ্ন সেই একই। তে তুমি ইব্রাহিম? কিভাবে হলো এই ধুরন্ধর সাক্ষাত!
মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই বুঝি তুমি। আবার কখনো তুমিই হয়তো আমি। কে জানে তোমার স্রস্টা হয়তো আমি নিজেই।
তবে ইমিয়া?
আলো আর অন্ধকারকে এক বিন্দুতে রেখে, চারদিক ছাপিয়ে গেছে সেই নারী। ইমিয়া আসলে প্রত্যহের প্রতিক। তাই আমার অপ্রাত্যহিক অন্ধকারে সেই সবচেয়ে বেশি আরাধ্য।
না সে তোমার হতে পারে না ইব্রাহিম।
ইব্রাহিম চাতকের চারপাশে ঘিরে থাকা অন্ধকার থেকে আঁজলা ভরে আঁধার তুলে নিয়ে ছিটিয়ে দেয় আবার। পূনরায় আঁলা ভরে অন্ধকার নিয়ে বাক্সের ডালা খুলে স্বযতেœ ভরে রেখে দেয় অন্ধকারটুকু। পারে চাতক, ইমিয়া শুধু আমারই হতে পারে।
ইব্রাহিম এতক্ষণ খেয়াল করেনি। চাতক কখন যেন নিঃশব্দে চলে গেছে ঘর থেকে। কোথায় গেছে ও! ইমিয়ার কাছে ? না ইব্রাহিম কখনো ইমিয়াকে চাতকে হতে দেবে না। ধিরে ধিরে রাত মনে হয় আরো গভীর হতে থাকে।তার চারপাশের অন্ধকারের যেন পুঞ্জিভূত হয়ে পাক খায়, গর্জন করে। হঠাৎ ইব্রাহিমের হাসি পায়। সে ঘর কাঁপিয়ে হাঁসতে থাকে। তার হাসি শুনে নিচের কুকুর দুটো ডাক ছাড়ে। কি হচ্ছে তার সাথে এসব, কেন হচ্ছে! না ইমিয়া কখনো অন্যের নয়। ইব্রাহিম রাগে ওর চারপাশে ঘিরতে থাকা অন্ধকারগুলোকে থাবা দিয়ে লন্ডভন্ড করে দেয়। তবু অন্ধকারেরা তুলোর মত উড়ে বেড়াতে থাকে ঘরময়। ইব্রাহিম খেয়াল করে ওগুলোকে। কেমন ঠান্ডা আর বিষন্ন যেন আজকের অন্ধকার। ওর মনে হয় পৃথিবীর সব অন্ধকারেরা যেন রহস্যের গলিপথ পেরিয়ে একে একে দেখতে আসছে ওকে। এ যেন মৃত কোন মানুষের শোক মিছিল। অন্ধকারেরা যেন শোকযাত্রী। ওরা যেন আলতো করে ঢুকে যাচ্ছে ওর মাথায়, পেটে, চোখে, হৃদপিন্ডে। হঠাৎ সে অন্ধকারে একটা কন্ঠ শুনতে পায়। কন্ঠের সেই অবয়বকেই যেন এতক্ষণ খুঁজছিলো ও। ইব্রাহিম ছুটে যায় তার কাছে।
তুমি এসেছো ইমিয়া।
হ্যাঁ আবার ফিরে এলাম।
আমি জানতাম তুমি আসবে। আসতে তোমাকে হবেই।
না ইব্রাহিম তুমি জানো না। আমি আসলে ফিরে এেেসছি চলে যাবো বলেই।
ইব্রাহিম প্রচন্ড্র শব্দে হাসতে থাকে। কোথায় যাবে তুমি, চাতকের কাছে? আলোর আশ্রয়ে!
যেতেও পারি আবার নাও যেতে পারি। এখন মধ্য রাত। অন্ধকার পেরিয়ে এসেছে অনেকটা সময়। আলো পুটতেও বাকি নেই খুব। এই মধ্য সময়টা বড় বেশি ক্লান্তিকর ইব্রাহিম। না আলো না রাত। এত অনিশ্চয়তা আমার ভালো লাগে না।
ইমিয়া আমার রাত তোমাকে আশ্রয় দেবে। আলোর তীব্রতা থেকে বাঁচতে দেবে ছায়া। ওরা ঘিরে থাকবে তোমায় প্রহরির মত। অনন্ত ভালোবাসা আমি তোমাকে দেব। অনন্ত এবং অনন্ত।
ইমিয়া খিল খিল করে হেসে উঠে। সে অন্ধকারে ইব্রাহিমের কাছে এসে দাঁড়ায়। ইব্রাহিমের মনে হয় সে ইমিয়ার গন্ধ পাচ্ছে প্রাণভরে। মেয়েটার শ্বাস পড়ছে ওর মুখে। ইমিয়া তার হাত নিজের হাতে তুলে নেয় এবং নরম ঠোঁট দিয়ে হাতে চুমু খায়।
তোমাকে খুব ভালোবাসি ইব্রাহিম। তুমি আমার নির্জনতার আশ্রয়।
কিন্তু চাতক?
হ্যাঁ আমি চাতককেও ভালোবাসি। ঠিক তোমার সমান। সে আমার প্রাণ শক্তি। আলোর ঠিকানা।
ইব্রাহিম হাত ছাড়িয়ে নেয়। না না তুমি কখনোই চাতকের হতে পার না।
ইমিয়া আবার ইব্রাহিমের হাত ধরে। চলো তোমাকে আজ ঘরের বাইরে যেতে হবে। ভয় পেয়ো না, আলোতে নয়। œন্ত নক্ষত্র মন্ডলির নিচে। নক্ষত্র দেখবো তোমাকে নিয়ে।
ইমিয়া ইব্রাহিমকে ছাদে নিয়ে আসে। এখানে অন্ধকার তার মনে হয় অনেক বেশি পাতলা। ঠিক কুয়াশার মত ছঁয়ে যায় ওগুলো। মাথার উপর ওদের অনন্ত আকাশ। সেখানে আলোর ফুটকির মত জ্বলছে অগণিত তারা।
ওই যে তারাগুলো দেখছো, ওরাও কিন্তু অন্ধকারেই থাকে। অনন্ত অন্ধকারের মাঝে গণগনে আলো হয়েই কিন্তু জ্বলে। তোমাকে একটা কথা বলি ইব্রাহিম। আমার মনে হয় তুমিও আসলে তারাদের মতই কেউ। বিস্তৃত অন্ধকারে তুমি আসলে একটা ছদ্দবেশি আলো।
ইব্রাহিম চমকে উঠে। না, কখনোই নয়। আমি চীর অন্ধকারের।
তুমি আসলে আলো ইব্রাহিম। এই যে তোমার কবিতা, মাথার ভেতর ভাবনাসকল সবইতো আলোকিত হবারই লক্ষণ। তুমি কি সত্যিই আমায় ভালোবাসো?
হ্যাঁ আমি তোমাকে ভালোবাসি। মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের চেয়ে বেশি।
তাহলে মনে রেখো অন্ধকারে ভালবাসা যায় না। ভালোবাসা আলোকিত মানুষের জন্য। তুমি আসলে অন্ধকারে থেকেও আলোর পথযাত্রী।
না, না, না আমি আলো চাই না। আমি আলোকিত নই, হতে পারি না। আমার জীবনে আলোর স্থান নেই। আলোয় আমার চোখ ধাধিয়ে যায়। ওটা আমাকে কষ্ট দেয়। ইব্রাহিম মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে। আমাকে ছেড়ে যেওনা ইমিয়া।
আমি আসলে জানি না, সত্য আসলে ঠিক কতটা কঠিন। তবে এভাবেই হয়তো তোমাকে বাঁচতে হবে। একা এবং নির্জনে। চলে যাওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই। কিন্তু আমি যদি তোমার কাছে থেকেও যাই ক্রমেই অন্ধকারের প্রাচুর্যে আমাকে হারিয়ে ফেলবে তুমি। আসলে এক সময় তুমি আরো একা হবে। নির্জন থেকে নির্জনতর। প্রথমে নিজের কাছ থেকে, তারপর পৃথিবীর সব কিছু থেকে।
ইব্রাহিম তীব্র চোখে ইমিয়ার দিকে তাকায়। তার মানে তুমি চলেই যাবে তাই না।
হ্যাঁ, আমাকে রোখার সাধ্য কিংবা সামর্থ কোনটাই নেই। একটু পরেই নতুন দিনের শরু। নতুন আলোতে আমার আবার অবগাহন ইব্রাহিম।
যদি যেতে না দেই। তুমি ছাড়া আমার অন্ধকার অপূর্ণ ইমিয়া। আমার অন্ধকারের বাক্সটা, যেখানে আমি সিন্ধু সেচা ডুবুরির মত এখান ওখান থেকে কুড়িয়ে এনে জমিয়েছি ছায়া। যদি সেখানে ডুব দাও তুমি, কেমন হবে ইমিয়া? তুমি ছাড়া আমি মহা শূণ্য। তোমােেক কখনোই যেতে দেব না আমি।
তুমি আমাকে আটকাতে পারবে না । কারণ আলো ছুঁয়ে যায় প্রত্যেককেই। চোখ ঢেকে আলো থামিয়ে রাখা যায় না। আমার পথ আমার জানা।
না, তা কখনোই হতে পারে না। সৃষ্টির শুরু অন্ধকারে, লয়ও সেখানে। মাঝখানে আলোকময়তা সাময়িক বুদবুদ। তুমি আলোতে যেতে পার না। কখনোই পার না।
কথা বলতে বলতে ওরা কখন ছাদের কিনারায় চলে এসেছে খেয়াল করেনি কেউ। ইমিয়া হঠাৎ যেন ব্যপারটি বুঝতে পারে। তবু ইব্রাহিম দেখে কেমন যেন ভাবলেসহীন মেয়েটার মুখ। সে ইমিয়ার আরো কাছে এগিয়ে আসে।ওই দেখ, অন্ধকার কেমন আপন করে টানছে তোমায়। ওখানে আলোর স্থান নেই। ওখানে কেবল আমি তুমি আর আমরা।
ইব্রাহিম ইমিয়াকে ছাদ থেকে নিচের দিকে ঠেলে দেয়। ইমিয়ার শরীরটা মুহূর্তের মধ্যেই আপন করে নেয় ওগুলো।
পরিশিষ্ট
সকালের রৌদ্রে যখন ধুয়ে গেছে অন্ধকার, তখন ওই দুর্গের মত রহস্যময় বাড়িটার উঠানে শক্ত কংক্রিটের উপর পাওয়া গেছে ইব্রাহিমের লাশ। ওর মুখটা ছিলো প্রশান্তিময়। এই বানের জলের মত আরোর মাঝেও চোখ ধাঁধায় নি ওর। আবার অন্ধকারের নির্জনতাও ছেড়ে যায় নি এতটুকু। এদিকে বাড়ির ভেতরেও ওই আলোহীন ঘরটাতে বসে আছে ইব্রাহিম। বাইরের আলো একটুকু পৌছায়নি সেখানে। ওর সামনে সেই অন্ধকারের বাক্স। তার নিচে রাখা একটা কবিতা। নিজের লেখা কবিতাটা তখন বিড়বিড় করে পড়ছে ও
এখানে যা গিয়েছিলো শোনা
ওখানে তাল লয় কাটা সুর।
এখানে কেবল উর্ণাজাল বোনা।
সম্পর্কের ঘুর্ণাবর্ত আড়াল চক্ষুদুর।
এখানে গোপন কানে কানে কানাকানি
বিকৃতি আর পূঁজ গন্ধময়
আলো আঁধারে হারানোর হয়রানি।
সমমূল্যে কিনে রাখা সব ভয়।
ওখানে যা গিয়েছিলো শোনা
এখানে তারা সকল ভাগ্যভুক
অন্যখানের ইতিহাস কাল গোনা
ক্রমে ক্রমে নিজেই আগন্তুক।
------------------শেষ----------------





লেখাটা ভাগ করে দিলে পড়তে আরাম হতো।
সুন্দর লাগলো...
ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন