ইউজার লগইন

এসব দেখি কবির হাট-বাজার

কখনো কখনো কবিতা লেখার চেষ্টা আমার বদঅভ্যাসগুলোর মধ্যে একটি। আবার কখনো বা গল্পও লিখতে চেষ্টা করি। তবে নিজেকে কখনো কবি বা গল্পকার হিসেবে দাবি করার মত কলিজা যে আমার নেই তা আমি অকপটেই সবসময় সবার কাছে স্বীকার করি। কখনো কখনো কেউ কেউ আমাকে বারবার প্ররোচিত করেছে, কেন একটা বই বের করছি না। তাদেরকে কিভাবে বলি আমি আসলে দুর্বল মনের মানুষ। ওটার কথা ভাবতে আমার সাহস হয় না। হাজার হাজার লেখকের মূল্যবান বইয়ের ফাঁকে আমার কায়া সাদৃশ্য একটি বই পাঠক বিনা অথর্ব অপেক্ষা করে রয়েছে যুগের পর যুগ। কিংবা কোন এক নিভৃত কোণে তা চমৎকার ব্যাবস্থা করেছে উই-ইঁদুরের অন্নসংস্থানের, এ কথা মনে হলেই আমার কলজে শুকিয়ে আসে। ল্যাংড়া, বোবা, কালা যাই হোক সমাজের সবার কাছে তা বোঝার মত হলেও সন্তানটি কিন্তু জন্মদাতার প্রিয়ই থাকে। তার সামাণ্য অবহেলা জন্মদাতার বুকের মধ্যে শেলের মত বিঁধে। এছাড়া প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন “মুদ্রণ যন্ত্র সহজ লভ্য হওয়ায় এখন এমন অনেক কিছুই ছাপা হইতেছে যা ছাপা হওয়ার যোগ্য নয়”। তাই বইয়ের কথা পাঠকের কথা ভাবলেই আমার বুক দুরুদুরু করে। শেষে না কেউ প্রমথ চৌধুরীর কথাটাই আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে বসে। যাই হোক নিজেকে লেখক বা কবি বলে পরিচয় না দিলেও কাকতালীয়ভাবে হঠাৎ করেই কিছুদিন থেকে যেন পড়ে গেছি কবি লেখকদের মহাসমূদ্রে। যেদিকে তাকাই আমার চারপাশে এখন কেবল কবি আর কবি। লাল কবি, নীল কবি, সতেজ কবি, নিস্তেজ কবি, লম্বা, বেটে, ভালো, খারাপ সব যেন ভিড় কওে দাঁড়িয়েছে আমায়। একসময় শুনতাম বাংলাদেশে নাকি কাকের চাইতে কবির সংখ্যা বেশি। এখন যেন কেউ তা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি একটি মাসিক পত্রিকায় কাজের সূত্রে আমার দিনের অনেকটা সময় কেটে যায় শাহবাগের বিখ্যাত আজীজ সুপার মার্কেটে। এই মার্কেটের আড্ডা, গাল-গল্পের কথা এতদিন কেবল শুনতাম লোকজনের মুখে। তবে আমাকেও যে কখনো সেখানেই খুঁটি গাঁড়তে হবে এমনটা ভাবিনি। দিনে দিনে সহকর্মী শফিক হাসান কৌতুকচ্ছলে প্রতি দিন দিয়ে যান কবি পাঠ। প্রতিদিনই অফিসে কোন না কোন কবির আগমন। প্রতিদিনই নতুন নতুন কবির গাল-গল্প। শফিক অবশ্য নিজেও লেখক, কিন্তু আশ্চর্য রকম দক্ষতায় নিজেকে বাঁচিয়ে চমৎকার হিউমারাস কথাবার্তায় অফিসে আসা এমন কোন কবি নেই যাকে নিয়ে সে বিদ্রুপ করবে না। অদ্ভুত বিষয় হলো যাকে নিয়ে বিদ্রুপ করা হচ্ছে সে মোটেও বুঝতে পারেনা শফিকের এসব হিউমার। তাই শফিকের তীব্র তির্যক কথাবার্তায়ও আগত কবিটি যেন নিজের পদবির আনন্দে অভ্রভেদি হয়ে উঠতে চায় তার মাথা। শফিকের এ বড় মহা গুণ। ইদানিং অবশ্য আমার দিকেও যে দু একটা স্প্রিন্টার ছুটে আসছে না তা নয়। তবু সেই আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয় প্রতিদিন ওই আশ্চর্য ভাবের জগতের সাথে। মার্কেট ঘিরে প্রতিদিনই দেখি অসংখ্য লিটল ম্যাগের আনাগোনা। নতুন নতুন কবিদের উত্থান এখন কেন যেনো আমারো চোখ এড়িয়ে যায় না। কবিতা বা লেখা হোক না কিছু একটা লিখেই তারা নিজেদের নামের পিছনে কবি পদবি জুড়ে দিচ্ছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো মার্কেটের দারোয়ান থেকে শুরু করে ড্রাইভার দোকানদার, চা-আলা, মিস্ত্রিসহ সবাই নাকি এখানে কবি। এমনকি আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি সেটার মালিক থেকে শুরু করে তার গাড়ির ড্রাইভারসহ সবাই নাকি ওখানে কবিতা লেখেন। কবিতা আর কবি এমন পসরা, ভাবা যায়! কোন কোন কবি আসছে কবি তা কিনতে, কেউ কেউ আসছে মার্কেটের আট দশটি প্রকাশনী ঘিরে কবিতা বিকাতে। ভালো, খারাপ, মোটামুটি, জঘন্যসহ সব জাতের কবিতাই নাকি এ মার্কেটে কিনতে পাওয়া যায়। আছে কবিদেও নাম বিভ্রাটও। অনন্ত স্বপ্ন নিয়ে দু একটি পঙতি লেখার পরই নব কবি রুপে দিক্ষিত মানুষটি পাল্টে ফেলছে তার জন্মগত নাম। নতুন নামটি বলতে বা লিখতে যত কঠিন হবে এক্ষত্রে মনে হয় সেটিই ওই ব্যাক্তিটির কবিত্ব পরিমাপের মানদন্ড হিসেবে কাজ করে। এইতো আমার নিজের পরিচিত কয়েকজনের কথাই তো নতুন করে শুনছি আর অবাক হচ্ছি। পরিবর্তিত নামের এসব কবিরা কি অবলিলায় না খাপ খাইয়ে গেছেন তাদের নতুন নামে! পুরোন নাম বড্ড অপাঙতেয়, আর সাধারণ। পরিবর্তিত নামের তেমন একজন কবি আমাকে বলেছিলেন, কবিরা নাকি সাধারণ মানুষ নয়। তারা সৃষ্টিকর্তার বিশেষ সৃষ্টি। তারাই ঈশ্বরের সেই বিশেষ অভিশপ্ত সৃষ্টি যারা নাকি অলৌকিক আন্দের ভার বয়ে বেড়ান। সুতরাং তাহার বক্ষে অপার বেদনাতো থাকবেই। আর এই বেদনাকে শৈল্পিক রুপ দেয় তার পরিবর্তিত নাম।

শফিকের কাছে শুনেছি কবিদের অদ্ভুত অদ্ভুত সব কান্ডকারখানা। এগুলো কি ঠিক হাস্যকর নাকি অন্যকিছু আমি এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। মার্কেটের জনৈক এক বিখ্যাত কবি নাকি ভাবছেন, রবীন্দনাথের পর সমসাময়িক সময়ে যদি দুই বাংলায় কেউ শ্রেষ্ঠ কবি থাকেন সে কেবল তিনিই। শুধু প্রচারের অভাবে তার যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে না। তার মতে, শুধু মাত্র তিনি ছাড়া ইদানিংকালের সব কবির কবিতা নিক্ষেপযোগ্য। এই কবিটিরই আরেকটি ঘটনা বলা যাক। বিখ্যাত সেই কবি গেছেন মার্কেটের টয়লেটে। মার্কেটের বাইরের লোকেরা টয়লেট ব্যাবহার করলে নির্দিষ্ট একটা টাকা দিতে হয় তা সেই কবি বোধয় জানতেন না। তিনি বাইরে এলে যথারীতি তার কাছে টাকা চাওয়া হলো। তৎক্ষণাত কবি যেন বজ্রাহত হলেন। দেশটা কোথায় যাচ্ছে? তিনি একজন কবি, এই দেশে প্রস্রাব করতে গেলেও কবির কাছে টাকা চাওয়া হয় জেনে তিনি দুঃখে কি করবেন ভেবে পেলেন না। এরজন্যই কি কবিরা তাদের কলমকে হাতিয়ার বানিয়ে যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করেছিলেন! এইতো গেলো একজনের কথা এখন আরেকজনের কথা শোনা যাক। ইনি নিজেকে দাবি করেন নব্বই দশকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি বলে। তার ভাষায় যে কবিকে তিনি চেনেন বা বা যে কবি তাকে চেনে শুধুমাত্র তারাই কবি উপাধি পাবার যোগ্য। বাকিরা সব ধুলোমাটি। নোয়াখালী অঞ্চলের এ কবি হয়তো অফিসে এস বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলেন। বাকপটু শফিক তাকে আরো ফুলিয়ে দেয়। সেই জনৈক কবি যেন শফিকের তীব্র রসাত্মক উক্তিতেও হাওয়ায় উড়তে থাকেন। উনি দাবি করেন, দেশের মানুষ এখনো গুণী লোকের কদও বোঝে না বলেই তাকে এখনো সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরষ্কার দেয়া হচ্ছে না। যেদিন তিনি সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেয়ে যাবেন তখন কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তা ভেবেই তিনি চিন্তিত। এক কবিকে পেয়েছিলাম নেত্রকোণা অঞ্চলের। সে পেশায় একজন কৃষক হলেও চমৎকার কবিতা লেখেন। বিভিন্ন গ্রাম্য মারামারিতেও নাকি তিনি সমান পটু। মাঝে মাঝেই নাকি মারামারি করে মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে অফিসে আসেন শফিকের কাছে। মুখে বিগলিত হাসি আর পকেটে কবিতা। অঅবার এমন অনেককেও এ কয় দিনে দেখেছি যারা নিজের বই ছাপতে এসেছেন নিজের টাকা দিয়ে। টাকার কোন অভাব নেই, চাই শুধু ছাপার অক্ষরে নিজের নাম। মলাট উল্টে এখন সেই বইয়ের ভেতর ছাইপাশ যাই থাক কোন সমস্যা নেই। সব মিলিয়ে শাহবাগের এই মার্কেটটি যেন কবিদের হাঁটবাজার। প্রতিদিন নিত্য নতুন কবি, কবিতা আসছে বণ্যার স্রোতের মত। কিনছে, বিকাচ্ছে, দরদাম করছে আসলে সব মিলিয়ে পুরো মার্কেটটিতে যেন জমজমাট সাহিত্য সওদার স্থান। এতসব কিছুর ভিড়ে সেদিন অফিসে বসেই নিজের একটা লেখা কম্পোজ করছিলাম। ভয় হচ্ছিলো, কেউ যদি দেখে ফেলে। এতসব কবি লেখকদের ভিড়ে আমি সামান্য এক কথক মাত্র। আমার ওদেও আসওে না যাওয়াই ভালো। মাঝে মাঝে দু একটি লেখা যা প্রকাশ পেয়ে যায়, তা দিয়েই আপাতত গা বাঁচাই না কেন!
আমি বিশ্বাস করি কবি লেখকরা বিধাতার আমুল আর্শিবাদ ধণ্য। আমার কি সেই স্বামর্থ আছে! তবু সাদা খাতার জমিনে নিজেকে সান্তনা দেই, বারবার লিখি-

আমি অকৃতি অধম বলেওতো মোরে
কম করে কিছু দাওনি
যা দিয়েছে তারি অযোগ্য ভাবিয়া
কেড়েওতো কিছু নাওনি।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


একটা লেখার ঘোর কাটার আগেই আরেকটা লেখা দিলে আমার মাথায় প্যাঁচ লাইগা যায় Sad

তানবীরা's picture


বিখ্যাত সেই কবি গেছেন মার্কেটের টয়লেটে। মার্কেটের বাইরের লোকেরা টয়লেট ব্যাবহার করলে নির্দিষ্ট একটা টাকা দিতে হয় তা সেই কবি বোধয় জানতেন না। তিনি বাইরে এলে যথারীতি তার কাছে টাকা চাওয়া হলো। তৎক্ষণাত কবি যেন বজ্রাহত হলেন। দেশটা কোথায় যাচ্ছে? তিনি একজন কবি, এই দেশে প্রস্রাব করতে গেলেও কবির কাছে টাকা চাওয়া হয় জেনে তিনি দুঃখে কি করবেন ভেবে পেলেন না।

Big smile Big smile Big smile

আপনার এমন অনেক মজার অভিজ্ঞতা শোনার অপেক্ষায় রইলাম

সুমন মজুমদার's picture


মজার কিনা জানি না। তবে মানুষের জীবন ঘটনাবহুল। আমি চেষ্টা করবো এমন অনেক অভিজ্ঞতা জানানোর। লেখাটি পড়ে ভালোমন্দ মন্তব্য করলে খুব খুশি হবো

সুমন মজুমদার's picture


ঠিক আছে এরপর গ্যাপ দিয়ে লেখা পাঠাবো। ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সুমন মজুমদার's picture

নিজের সম্পর্কে

দুরবীন দূরের মানুষের কোনো ঠিকানা থাকানা থাকে না।
সে মানুষ কেবলই নিছক বিন্দু
খোলা আকাশের নিচে কখনো বা ধুলোর কণা
উড়ে উড়ে যায়, অচেনা গন্তব্যের পাখায় পাখায়।