আঁটকে থাকা কাঁটা
আমাদের দেশ সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে বেশ সমৃদ্ধই বলা যেতে পারে। বক্তার সংখ্যার হিসেবে বিশ্বে ৭ নম্বর অবস্থানে রয়েছে আমাদের ভাষা। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ জাতী তার মুখের ভাষা হিসেবে ধরে রেখেছে এ ভাষাকে। এজন্য অবশ্য ইউনেস্কো থেকে আমরা একটি দিনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও আদায় করে নিয়েছি। আমাদের এই ভাষায় কিছু বললে এনকার্টার আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী অন্তত বিশ্বের বিশ কোটি মানুষ তা বুঝতে পারার কথা। আর যারা লিখাপড়া জানেন তারাতো বাংলায় কিছু লিখলে পড়তে পারার কথা। এটা আমাদের ভাষার লেখকদের বেশ উৎসাহ যুগিয়েছে। এটা অবশ্যই একটা ভাল দিক। তবে একথাও সত্য যে ব্লগিং এর একটা বিশার ভূমিকা আছে নবীন লেখকদের সাহস যোগানোর পেছনে।
একটা সময় ছিল, অনেকেই অনেক গল্প উপন্যাস এবং আরো অনেক কিছুই পড়ে নিজের মত লিখালিখি করতো, সেসব লিখা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে। তবে যাদের লিখা প্রকাশ হত বই কিংবা সংবাদপত্রের কলাম আকারে, তাদেরতো মেলা সম্মান। বর্তমানে যে লেখকদের সম্মান কমে গেছে তা কিন্তু নয়। লেখকরা চিরকাল সব জাতীর কাছেই সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কারণ লেখকরা তাদের লিখার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে থাকেন, অনেক সময় সে সকল সমস্যা সমাধানের ঈঙ্গিতও পাওয়া যায়। লেখকদের অনেক ক্ষমতা, তারা তাদের লিখার মাধ্যমে খুব সহজেই যেকোন বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে পারেন। তাই লেখকদের আমার সব সময় সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাধরদের তালিকার মানুষ মনে হয়। তবে, এই লিখা যদি হয় ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে তখন সেই লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা কি আর থাকে? যারা কোন কিছু বিবেচনা না করে শুধু প্রিয় লেখকের লিখা গিলতে অভ্যস্ত তাদের কথা একেবারেই আলাদা। তাদেরকে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী লেখকরা সমাজে অনেক প্রতিপত্তি হাসিল করেছেন।
এতক্ষন আমার এসব কথা পড়ে মনে হয়েছে আমি বুঝি আজ লেখকদের ক্ষমতার পরিমাপ কিংবা তাদের সুনাম কিংবা কটুক্তি করতে বসেছি। সত্যিই তাই। তবে সুনামের চেয়ে কটুক্তি বেশি করবো, আর তা করবো আমাদের দেশের প্রথম সারির লেখকদের দেশের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণের কারণে।
আমরা জানি, দীর্ঘ ৩৯ বছর পরে ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ গেজেটে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপণ জারীর মাধ্যমে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল। ১৯৭৩ সালে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুন্যালস) আইনের আওতায় প্রতিষ্টিত এই ট্রাইবুন্যালের মূল লক্ষ্য ১৯৭১ সালে বাঙ্গালী জাতির উপর যেসকল মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে সেগুলোর সাথে সম্পৃক্তদের আইনের আওয়ায় এনে বিচার করা।
এ দাবীটি এই জাতির প্রাণের দাবি। আর কতকাল এই কলঙ্ক বয়ে বেড়াবে এই জাতি? আর কতকাল আমাদের শহীদদের আত্মা তাকিয়ে থাকবে আমাদের দিকে কবে হবে তাদের খুনীদের বিচার, কতকার বীরঙ্গনারা মুখ বুজে চেয়ে থাকবে রাজাকারের গাড়িতে আমাদের জাতীয় পতাকার দিকে? আর কতকাল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা অত্যাচার সহ্য করবে সেই দালালদের আর লুকিয়ে কাঁদবে? এর শেষ হওয়া উচিত। আমার বিশ্বাস সেটা অনেকেই মানেন এবং মনে প্রাণে চায়। তবে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই চাহিদা কোন এক অজ্ঞাত কারণে খুব কম পরিলক্ষিত হয়। তাদেরকে সবাই চেনে। তাদের নাম আমরা সকলেই জানি। আমি কোন জামায়াত নেতার নামের কথা বলছিনা। তারা হলেন আমাদের দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় লেখক, কলামিস্টরা। এর কিছু কারণ আমি বোঝার চেষ্টা করেছি। যদিও এসব একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত।
আজ পর্যন্ত কোন প্রথম সারির কলামিস্টকে দেখলাম না এই নিয়ে কোন কলাম লিখতে। তারা কি জানেনা তাদের কথায় তরুন প্রজন্ম বেশী উদ্দিপ্ত হবে? তারা কি জানেনা, তাদের কথার গুরুত্ব এবং প্রভাব অনেক বেশী? দেশের সবাই জানে, আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। কিন্তু এর পক্ষের খবরের চেয়ে বিপক্ষের খবর বেশী জানতে পারছে আমাদের দেশের জনগন। তার কারণ একটায়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আসামীদের বাঁচাতে যেই গোষ্ঠি মরিয়া হয়ে উঠেছে তাদের পক্ষের লেখক এবং সামাজিক কর্মীরা অনেক বেশি সক্রিয়। ঐ পক্ষের লেখকরা ব্যবসায়ী লেখক নন কিংবা তারা তেমন জনপ্রিয় লেখকও নন। তাই তাদের হারানোর ভয় নেই, যে ভয় আছে দেশের প্রথম সারির কিছু লেখকদের। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে এক সময় অনেক বড় বড় কথা বলেছেন, কিন্তু কোন এক অলৌকিক শক্তি তাদের আজ এ বিষয়ে লিখার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। তারা যদি আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে লিখা শুরু করেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শিবিরে তাদের যে পাঠকচাহিদা রয়েছে তা কমে যাওয়ার ভয় আছে। তারা দেশ নিয়ে ভাবেন না, ভাবেন তাদের কোন বই/কিংবা লিখাকে কিভাবে বিক্রি করা যায়। সেকারনেই এক বইকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার, জাতির জনকের হত্যার ইতিহাস নিয়ে রূপকথা, টিনেজারদের মত রোমান হরফে বাংলা লিখা এসব বেশ চোখে পরে। কেউ কেউ তো আছেন, পারলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করেই দেন।
কিছু কথা না বললেই নয়, ছোট বেলা থেকেই জেনে এসেছি সমাজের প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষের সমাজের প্রতি কিছু দায়িত্ব এবং কর্তব্য থাকে। একজন সিটি কর্পোরেশনের স্বেচ্ছাসেবক যেমন সকালে উঠে রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে পেট চালান ঠিকই কিন্তু তার ঐ পেশার দ্বারা তার নিজের সংসার চলার পাশাপাশি সমাজ কিছু পাচ্ছে। ঠিক তেমনই আমাদের সকলেই উচিত নিজ সামর্থ্য এবং ক্ষমতা অনুযায়ী দেশের এবং সমাজের জন্য কিছু করা। কিন্তু আমাদের এই প্রথম শ্রেণীর সম্মানিত লেখক বৃন্দ কি করছেন? অন্তত জাতির এই একটা ইস্যুতে আপনারা কেন এত নীরব ভূমিকা পালন করছেন? আপনাদের হাত কে বেঁধে রেখেছে?
আপনারাতো ঠিকই দেশ বিদেশ ঘুরছেন, আপনাদের চেনে দেশে এবং দেশের বাহিতে অসংখ্য বাঙ্গালী এবং অবাঙ্গালী লোকজন। যে কাজ দেশের চিহ্নিত রাজাকাররা কোটি কোটি টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে চরমভাবে আমাদের ট্রাইবুন্যালকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে আমাদের দেশ এবং জাতির নামে, সেখানে আপনারা কি আশা করছেন সরকারের পক্ষ থেকেও সম-পরিমাণ টাকা খরচ করা হলে এবং আপনার পকেট কিঞ্চিত ভারী হলে তবে আপনাদের কলমের জ্বালানী খরচ উঠবে? নাকি ভয় করছেন যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে আপনাদের যে সকল পাঠক আছে তারা আপনাদের বর্জন করবে? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বলবো, আপনারা যেভাবে আপনাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোটি বিবেক আপনাদের বর্জন করবে যখন বুঝতে পারবে আপনাদের এই অসহযোগীতার কারণ।
আপনাদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস লিখে কিংবা নাটক/সিনেমা বানিয়ে এক সময় দেশের মানুষকে জানিয়েছেন এই ছোট্ট দেশটি কিভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ১৯৭১ সালে, তারা আজ এভাবে চুপ থাকার কারণে জাতি কি ভাববে না, আপনাদের সেই সকল উপন্যাস/নাটক/সিনেমা ছিল শুধুমাত্রই ব্যবসায়ীক কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল? সব কিছু বাদ দিয়ে, আপনারাতো অন্তত অনেক বেশী জানার সুযোগ পেয়েছেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই রাজাকার, আলবদর বাহিনীর বর্বরতা সম্পর্কে, অনেকে নিজের চোখেও দেখেছেন, আপনাদের বিবেকে কি আপনাদের দংশন করেনা বিন্দুমাত্র, যখন কোন যুদ্ধাপরাধী আদালতে কোন এক সাক্ষীকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে আর আপনারা স্বপরিবারে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে বেড়াতে যেয়ে সেই ছবি আপলোড করছেন ফেইসবুকে? হয়তো আপনাদের মত জনপ্রিয় মানুষ অনেক কিছু হিসেব করতে হয় কিছু একটি ব্যাপার নিয়ে লিখতে, তবে আমার মত মানুষের তা করতে হয় না, কারণ আমাদের মত ক্ষুদে যোদ্ধারা ৭১ সালে যেমন ছিল, এখনো আছে। তারা নিরন্তর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানেই দেখছে রাজাকারের বাচ্চাগুলো আমাদের জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে কিংবা আমাদের জাতীয় বীরদের খাট করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানেই এই খুদে যোদ্ধারা প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দাঁড়াচ্ছে। হয়তো এ কাজগুলো আমাদের এই সকল খুদে যোদ্ধাদের পক্ষে যতটা কঠিন ঠিক ততটাই সহজ ছিল আপনাদের। কিন্তু, আমরা নতুন প্রজন্ম আপনাদের দিকে তাকিয়ে বসে নেই। আমরা প্রতিবাদ করতে শিখে গেছি, আমরা আমাদের রণ কৌশল নির্ধারণ করতে জেনে গেছি, আমরা নিজেরা পাশে কাউকে না পেলেও একা এগিয়ে যেতে হবে সেটাও জানি। তবে আমরা একা নই, আমরা তরুনদের সাথে নিয়ে নতুন প্রজন্ম একটা একটা করে রাজাকার এবং তাদের বীজজাতগুলোর মুখোশ উম্মোচন করবো। আমরা ব্যবসায়ী নই, আমরা আমাদের জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আশাহত করবো না। অন্তত আমাদের তরুন প্রজন্মের ইতিহাস সচেতনতা থেকে এ কথা বলতে পারি, এক সময় আর আমাদের কোন জাতীয় দিবসে কেউ ভুল ইতিহাস বলবে না। চল্লিশ বছর ধরে আমাদের গলায় যে কাঁটা আঁটকে আছে সেটা বের করে ছুড়ে ফেলবই।
[এই লিখাটি কারো প্রতি কোন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রসূত নয়। চরম ক্ষোভ এবং দুঃখ থেকে লিখা।]





tara asan tadyr moto......apni ame amra sobbi jani tadyr chetona ak matro bisys bisys din gulo ty e prokas pay.....noyto noy....karon ta ata hoty pary j tadyr oi din gulo ty e mony pory tara a desh ar 'SOMMANITO BUDDHEJIBI(?)'.tara to r apni ame na........tara onak(?)bysto tadyr bidys ghora,seminer,bla bla nea.tadyr time koi????!!!!
অসাধারণ একটা লেখা মিশু। স্যালুট তোমাকে
ধন্যবাদ আপু
সত্যিই অসাধারণ লেখা মিশু। হাল ছেড়ো না। চালিয়ে যাও।
অসাধারণ লেখা, আপনি এত কম লেখেন কেন?
লেখকরা কি আসলেই কথা বলছেন না?! কিছু লিখছেন না?!
এ-কথার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না।
লেখার বাদবাকী অংশ মনের কথাই বলেছে। তাই সাধুবাদ।
হ্যাঁ বলছেন, তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখকরা যেখানে আর বেশী বলতে পারেন, সেটা বিপক্ষের সারির লেখকদের তুলনায় কিছুই না।
মন্তব্য করুন