বড়দিন ১৯৬২ - যে রাতের কথা অজানা অনেকেরই
যেভাবে বিকৃত হয়েছে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টের পরে আমাদের ইতিহাস, তাতে ২৫শে মার্চ মধ্যরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুর বেতারে ভেসে আসা সেই বাণীগুলোর আগ পর্যন্ত কিংবা ৭ই মার্চের আগ পর্যন্ত অনেকেই মনে করি স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও নাকি চেয়েছিলেন স্বায়ত্ত শাসন। দোষ আমাদের নয়, ঠিক এভাবেই প্রচার করা হয়েছে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে। আজ জানবো জাতির এই মহান নেতা কত আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন স্বাধীন রাষ্ট্রের, কত আগেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলার তার অন্যতম এক ঘটনা।
পূর্ব পাকিস্তানের ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনে রাজনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরীরত অবস্থায় ততকালীন ইত্তেফাক অফিসের পাশে অবস্থিত পুরোন ঢাকার চক্রবর্তী ভিলাতে বাস করতেন শশাংক এস, ব্যানার্জী। ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৬২ ইং মধ্যরাতে (ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ২৫শে ডিসেম্বর) এক সহকর্মীর বাড়িতে স্বপরিবারে বড়দিনের নিমন্ত্রণ থেকে সবে ফিরেছেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়লো কেউ একজন। কিঞ্চিত ইতস্ততা কাটিয়ে দরজা খুলে তিনি দেখলেন একটি অনুর্ধ ১৪ বছরের বালক সালাম বিনিময়ের পরে ভদ্রভাবেই তাকে জানালো, ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া তার সাথে তার অফিসে দেখা করতে চান। বালকটি চলে যাবার সময় ব্যানার্জী সাহেবকে জানিয়ে গেলেন মানিক মিয়ার সাথে আরো একজন ব্যক্তি রয়েছেন। তখনি তিনি ধারণা করেন কোন এক রাজনৈতিক গোপন আলোচনায় হতে পারে, তবুও কোন প্রস্তুতি ছাড়া তিনি সেখানে পৌছান কিছুক্ষণের মধ্যেই। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নিজের পরিচয় দেয়ার পরে যেই মানুষটিকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তাকে খুব চেনা মনে হচ্ছিলো ব্যানার্জি সাহেবের। পত্রিকায় ছবি দেখেছেন তিনি অনেকবার তাই চিনতে কষ্ট হলোনা তার। তিনি আর কেউ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শশাংক সাহেবের ভাষায়, ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিল ডান এর বর্ণনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায় এখানে।

Sashanka S. Banerjee – India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan (a political treatise) পৃষ্ঠা - ১০
একই বইয়ের ঠিক পরের পৃষ্ঠায় ব্যানার্জী সাহেব উল্লেখ করেছেন, তিনি তখনই বুঝতে পেরেছিলেন স্বায়ত্ত শাসনের আড়ালে আসলে বঙ্গবন্ধুর আল্টিমেট লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনতা এবং সেদিনের সেই আলোচনার শেষে তা পরিষ্কার হয়েছিলো তার কাছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন, মানিক মিয়ার কিছু লিখায় সরাসরি স্বাধীনতার ইঙ্গিত থাকলেও পাকিস্তান প্রশাসন কেন তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি ধারণা করেন, হয়তো বাঙ্গালী দোভাষীরা কখনই সত্যিকার ভাবার্থ জানায়নি প্রশাসনকে। তার এই কথায় কিন্তু আপামর বাঙ্গালীরের প্রতিটি শ্রেণীতেই বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাবার পূর্ণ সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যার পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি গোপনে বঙ্গবন্ধু করে যাচ্ছিলেন বিভিন্ন বুদ্ধিজীবি এবং ততকালীন আরো কিছু আওয়ামীলীগের বিশ্বস্ত নেতাদের সহযোগীতায়। সে রাতের দীর্ঘ দুইঘন্টা ব্যাপী আলোচনায় উঠে এসেছিলো বিশ্ব রাজনীতি, কিউবার ক্ষেপনাস্ত্র সমস্যা এবং চীন-ভারত সম্পর্কের বেশ কিছু দিক সহ ততকালীন দুই পরাশক্তি আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক কিছুই।
ঐতিহাসিক সেই দীর্ঘ দুই ঘন্টার আলোচনার শেষের দিকেই ছিলো মূল চমক। শশাংক সাহেব লক্ষ্য করলেন, বঙ্গবন্ধু এবং মানিক মিয়া কিছু একটা বিষয় নিয়ে ইতিস্তত করছেন। শশাংক সাহেব সরাসরি জানতে চাইলেন প্রশাসনের উচ্চতর বিভাগের কাছে কোন মেসেজ কিনা, জবাবে বঙ্গবন্ধু আর ইতস্তত না করেই শশাংকা সাহেবকে জানান, সেদিনের আলোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিলো, তিনি অতি গোপনীয় একটি চিঠি পাঠাতে চান ততকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহুরুলাল নেহেরুর নিকট। বঙ্গবন্ধু খুব তাড়া দিচ্ছিলেন সেই চিঠিটি যত শীঘ্রই সম্ভব পাঠানোর জন্য। শশাংক সাহেব বঙ্গবন্ধুকে জানালেন, এই চিঠি প্রধানমন্ত্রীর নিকট পৌঁছানোর পুর্বে আরো দুইজন কর্মকর্তা তা পড়বে। বঙ্গবন্ধু তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান সেই দুইজন ব্যক্তি হলেন ডেপুটি হাই কমিশনার জনাব সূর্য কুমার চৌধুরী এবং পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ক ভারতীয় গোয়েন্দা নির্বাহী কর্ণেল এস সি ঘোষ। সেদিন উভয় পক্ষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে তারা প্রত্যেকেই এই চিঠির গোপনীয়তা রক্ষায় অঙ্গীকার করেন।

Sashanka S. Banerjee – India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan (a political treatise) পৃষ্ঠা - ১৪
তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, পন্ডিত জহরুলাল নেহেরুকে ব্যক্তিগতভাবে সম্বোধন করা ঐ চিঠিতে সংক্ষিপ্ত সূচনার পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বর্ণনা করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তারিত পরিকল্পনা, যা তিনি করেছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু মানিক মিয়ার সাথে আলোচনা করে।
যেহেতু ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু সেই চিঠিতে তার যাবতীয় কর্মকান্ড ঢাকার পরিবর্তে লন্ডন থেকে পরিচালনার ইচ্ছা পোষণ করেন। সেই চিঠিতে এও উল্লেখ ছিলো, এদিকে মানিক মিয়া তার পত্রিকায় স্বায়ত্ত শাসনের আন্দোলন জোড়দার করবে, অপরদিকে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে প্রবাসী সরকার গঠনের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী থেকে ১লা মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা দিবেন। চিঠির শেষাংশে পন্ডিত নেহেরুর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সহযোগীতা চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ পূর্বক ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ইচ্ছা পোষণ করেন বঙ্গবন্ধু।
অনেকেই ধারণা করে থাকেন, এই ঘটনাই ছিলো স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রথম কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
সূত্রঃ Sashanka S. Banerjee – India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan (a political treatise)
[পরবর্তী ঘটনা নিয়ে পোস্ট শীঘ্রই]





দারুন পোষ্ট!
ধন্যবাদ ভাই
এমন জায়গায় থাম্লেন ভাই!
তাড়াতাড়ি নেক্সট পার্ট দেন।
চমৎকার পোস্ট।
ধন্যবাদ ভাই, তৈরী করছি, আসলে সপ্তাহে সময় পাই দুইটা দিন, তাও আবার রান্না, ঘর গুছানো, এরপরও যেহেতু শুরু করেছি, পরের পর্ব পাবেন খুব তাড়াতাড়ি
প্রয়োজনীয় পোস্ট...
হ, তয় রেস্পন্স এত কম দেইখ্যা উৎসাহ কইমা যায়
দারুণ মিশু
ধন্যবাদ ভাই
দারুণ । জানলাম ।
ধন্যবাদ ভাই
দারুণ পোস্ট! এসব জানা দরকার। এসব তো কিছুই জানি না!!!!!
ধন্যবাদ, আসলেই আমরা অনেক কিছুই জানিনা
গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট। স্টিকি হওয়ার মতো।
গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট। স্টিকি হওয়ার মতো।
ঐতিহাসিক তথ্য ক্রস চেক করার জন্য এই ঘটনাকে নিয়ে অন্তত আর দুটো (০২) ভিন্ন তথ্য সুত্র আশা করছি
মন্তব্য করুন