বন্ধু কি খবর বল...
আমার বন্ধুদের মধ্যে সবচে সুদর্শণ ছিল নুরুল ইসলাম।হঠাৎ করে ও সিদ্ধান্ত নেয়-দাঁড়ি রাখবে।সেভ করা বন্ধ করে দেয়ার পর ক’দিনের মধ্যেই দাঁড়ির জঙ্গলে ভরে যায় ওর মুখ।পাড়ার মেয়েরা হায় হায় করে ওঠে...।দিপ্তি নামের এক মেয়ে,নুরুল ইসলামের প্রতি যার দুর্বলতা ছিল প্রায় প্রকাশ্য।সে আমাকে ডেকে বলে, ‘তোমার বন্ধুর হঠাৎ ‘রবিন্দ্রনাথ’ হওয়ার শখ জাগলো কেন?’ আমি বলি, ‘তোমরা যেভাবে ওকে জ্বালাতন কর!তোমাদের যন্ত্রণায় ও এখন ‘হুজুর’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে...শুনছি আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হবে...’।আমি একটু বাড়িয়ে বলি।‘শোন ঈশান,প্লিজ...ওর দাঁড়ি কাটার ব্যবস্থা করো, যদি কাজটা করতে পার...এক’শ টাকা পাবে...’।এক’শ টাকা তখন অনেক টাকা... তার ওপর দিপ্তির মতো সুন্দরী মেয়ের অনুরোধ,আমাকে আর পায় কে ! দশ টাকা দিয়ে রুমানা পেইন্ট’র একটা কৌটা কিনি।তারপর...নুরুল ইসলামের কাছে গিয়ে কৌটার লাল রঙ হাতে ঢেলে নিয়ে ওর দাঁড়িতে লাগিয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়।এখন বাছাধন দাঁড়ি না কেটে যাবে কই! কিন্তু...ঘন্টাখানেক পর একজন খবর দেয়,ও কেরাসিন ভর্ত্তি ডিব্বার মধ্যে দাঁড়ি চুবিয়ে বসে আছে, এবঙ আমার ওপর কঠিন প্রতিশোধ নেয়ার ফন্দি আঁটছে...।বিকেলে দেখি(দূর থেকে) ও দিব্যি মুখে দাঁড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে...।পরে অবশ্য পঞ্চাশ টাকা ‘আক্কেল সেলামী দিয়ে ওর সঙ্গে সন্ধি করি।
আমার একজোড়া লেদার কেডস ছিল।টিউশনির পয়সা জমিয়ে অনেক কষ্টে কিনেছিলাম...যা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছে ঈর্ষার পাত্র করে তুলেছিল...।একদিন বন্ধু হাবিব এসে বলে, ‘দোস্ত,বিথীর সঙ্গে ডেটিং,পায়ে ভালো জুতা নেই,মান–ইজ্জত আর থাকছেনা,তোর কেডস জোড়া ধার দে,প্রেস্টিজ বাঁচাই...’।আমি বলি, ‘ইয়া হাবিবী...,তুই বরং আমার ‘কল্লা’টা ধার নে,আমি কেটে দিয়ে দেই,তবু আমার ‘কলজে’টা চাইস না...’। ‘তোর কল্লা দিয়ে ফুটবল খেলবো কিভাবে,পায়ে যদি কেডস-ই না থাকে!’ও আস্তে করে টিপ্পনি কাটে।আমি ধমকে উঠি, ‘কি বল্লি...?’ ‘কিছুনা দোস্ত,চল ব্যাপারটা নিয়ে হোটেলে বসে ডিসকাস করি...’। অত:পর... হাবিব আমাকে মোগলাই পরোটা আর শিককাবাব খাইয়ে মাত্র দুদিনের জন্য আমার কেডসজোড়া নিয়ে চম্পট দেয়...।দু’মাস চলে গেল হাবিবের পাত্তা নেই।হাবিবকে সামনে পেলে আমি যখন কাঁচা চিবিয়ে খাওয়ার প্রতিজ্ঞা প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছি,তখন একদিন একটি কাগজের শপিংব্যাগ হাতে ও এসে উপস্থিত।আমি রেগে উঠার আগেই ও আমাকে দ্রুত হোটেলে ঢুকায়...।তারপর দু’টি ‘মুরগীহালিম’ অর্ডার দিয়ে বলে, ‘দোস্ত,আমি দু:খিত,আমার মোটেও অতোটা উত্তেজিত হওয়া উচিৎ হয়নি...’।আমি বলি, ‘বিষয়টা কি খুলে বল’।‘বিষয়টা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।সেদিন বিথীর সঙ্গে ডেটিং শেষে ষ্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম খেলা দেখতে...।আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ...টান টান উত্তেজনা...এক পর্যায়ে আবাহনী গোল খেয়ে বসে,আর...আমি ছিলাম আবহানীর সাপোর্টার...’। ‘তো কি হয়েছে?’আমি বিরক্ত হই...।ও কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ‘প্রিয় দলের পরাজয়ে রাগে-ক্ষোভে-উত্তেজনায় তোর কেডস’র এক পাটি পা থেকে খুলে প্রতিপক্ষের উল্লাসরত সমর্থকদের দিকে....’। ‘হায় হায় করেছিস কি হারামজাদা...’।আমার মুখ থেকে আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসে।মুরগী হালিমের বাটিটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাবিব বলে,ঠান্ডা মাথায় থাকলে সে মোটেও একাজ করতো না,সাময়িক ‘উত্তেজনা’র বশেই...।কথা শেষ করে ও কাগজের ব্যাগ থেকে কেডস’র বাকি পাটিটি বের করে আনে...।আমি ওর কান্ড দেখে অধিক শোকে যেন পাথর হয়ে যাই...।কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলি, ‘এক কাজ কর,বাকি পাটিটা তুই-ই বরং নিয়ে যা,আরেকদিন মারতে পারবি...’।আমার কথা শুনে খুশি হয়ে যায় হাবিব।কেডস টা আবার কাগজের ব্যাগে ঢুকায়,তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি তাহলে চলি দোস্ত,হালিমের বিলটা দিয়ে দিস,আজ আমার পকেটের অবস্থা ভালোনা...’।আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে হাবিব।
এক বৃষ্টিদিনে মহিলা কলেজের সামনে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম।এমন সময় কবির নামের এক বন্ধু এসে আমার হাতের ছাতাটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলে, ‘দোস্ত, র-র-রত্নাকে একটু বা-বা-বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি...’।কবিরের তোতলানো কথা শুনে তাকিয়ে দেখি,ওর কথিত প্রেমিকা রত্না কলেজের সামনে বারান্দায় ব্যাগ হাতে একাকি দাঁড়িয়ে আছে।অত:পর...আমরা এক প্রেমিকযুগলকে ক’মুহূর্তপর একই ছাতার নীচে অত্যন্ত রোমান্টিক পরিবেশে ঘনিষ্ট অবস্থায় দেখবো বলে নড়েচড়ে বসি...।কবির ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে রত্নার কাছাকাছি গিয়ে বলে,(পরে ওর মুখে শুনেছি) ‘একা একা এ-এ-এখানে দা-দা-দাঁড়িয়ে আছো কেন!ঠা-ঠা-ঠান্ডা লাগবে যে,চল ...তোমাকে বা-বা-বাসায় পৌঁছে....ধপাস!অর্থাৎ কথা শেষ হওয়ার আগেই পা পিছলে প্রপাত ধরণীতল...।কাদা পানিতে বেকায়দা ভঙ্গীতে পড়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে কবির।ঘটনার আকস্মিকতায় রত্নাও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ক’মুহূর্ত।তারপর...আশ-পাশে কাউকে না পেয়ে নিজেই বৃষ্টির মধ্যে নেমে ওর হাত ধরে টেনে তুলতে তুলতে বলে, ‘বেকুবের মতো হাঁটেন কেন! দেখেশুনে চলতে পারেননা?’অত:পর...আছাড় জনিত ব্যথা আর রত্নার ধমকে বেদনাহত কবিরকে আমরা ধরাধরি করে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি...।পরে অবশ্য কবির বলে,ও পড়ে গিয়ে যতোটা না আঘাত পেয়েছে,তার’চে বেশী কষ্ট পেয়েছে রত্না ওকে ‘বেকুব’ বলায়...।রত্না অবশ্য এখন ওই ‘বেকুব’র সঙ্গেই সংসার করছে...।
টিভিতে ডে-নাইট ক্রিকেট খেলা দেখে রাত দেড়টার দিকে ঘুমিয়েছি...।সবেমাত্র চোখে ঘুমটা লেগে এসেছে,এমন সময় মোবাইলে কল আসে... বিরক্তি হয়ে সেটটা নিয়ে দেখি বন্ধু স্বপন।‘হাঁ স্বপন বল’। ‘দোস্ত মরে গেছে...’।স্বপনের কাঁদো কাঁদো গলা শুনে কলজেটা ধ্বক করে ওঠে।ওর বউটা অনেকদিন ধরে অসুস্থ ছিল।আহা...ভদ্রমহিলা কিযে ভালো আর আন্তরিক ছিল...। ‘কখন মারা গেছে?’আমার কন্ঠ বাস্পরুদ্ধ। ‘এই ঘন্টা তিনেক আগে...হায় বান্টি...ও বান্টি...’।এবার সশব্দে কেঁদে ওঠে স্বপন। ‘বান্টি...?এই বান্টিটা আবার কে?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করি আমি। ‘আমার কুত্তা....গতমাসে কিনেছিলাম,ফুড-পয়েজিং হয়েছিল...এক ডায়রিয়াতেই শেষ!বন্ধু...আমার চল্লিশ হাজার টাকা জলে গেল...’।এবার হাউ-মাউ করে কান্না জুড়ে দেয় ও।দূর থেকেই টের পাই,শালা গলা পর্যন্ত গিলেছে...পুরো টাল,মোবাইলের ভেতর দিয়েই মদের গন্ধ পাচ্ছি।কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে দেয়ায় রাগে আমার মেজাজ খিঁচড়ে যায়, ‘শালা,তুই একটা স্টুপিড!কুকুরের মৃত্যুসংবাদ জানানোর জন্য রাত দুপুরে ঘুম নষ্ট করেছিস!দেখা হলে তোর পাছায় কষে তিনটা লাথি না মারি তো আমার নাম...’।
(আমার এমন পুরোনো সব বন্ধুদের অদ্ভুত এবং হাস্যকর কর্মকান্ড নিয়ে ব্লগারদের ভালোলাগা সাপেক্ষে ভবিষ্যতেও লেখার ইচ্ছে রইলো।)





ভাল লেগেছে।
লেদার কেডস এ দশ ভোট
ধন্যবাদ,তানবীরা।
ভালা পাইলাম
ধন্যবাদ আপনাকে বাতিঘর।
বন্ধুদের কাহিনী পড়তে গিয়ে হাসতে হাসতে শেষ।

বড় ভালো লাগলো! ঈশান, দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ুন।
ধন্যবাদ রশীদা,প্রথম কিস্তির জন্য যেভাবে মোবাইলে থ্রেট পাচ্ছি.....দ্বিতীয় কিস্তি লেখাটা এখন ফরজ হয়ে গেছে...।
ইয়ে ঈশান, আপনার বউ কি ব্লগ পড়ে? মহিলা কলেজের সামনে বসে আড্ডাবাজির শানে নুযুল জানতে মন চায়।
রশীদা,আমার সব লেখার প্রথম পাঠক(পাঠিকা)হলেন আমার স্ত্রী।
প্ৃথীিবর সেরা চাপা এটি!!!!
লিটন,আপনার এই মন্তব্যটি আমার বউকে দেখালাম,সে হাসেত হাসতে খুন...
আমার মনে হয় এইটাও চাপা

লিটন ভাই কনফার্ম করেন
রিকর্নফাম করলাম।
মমিনুল ইসলাম লিটন,
ঈশানের কম্পিউটারটা যেভাবে রাখা তাতে তার ওয়াইফ পড়তে পারেও! তবে তোমার ও আমাদের জনপ্রিয় টুটুল ভাইর মত আমিও সন্দেহ প্রকাশ করি। ওয়াইফ কখনো ভাল পাঠক হয় না। লিখে এদের দেখালে এমন একটা মুখ ভেংছি মারে - ওরে বাপ, লেখার সাধ মিটে যায় এবং বাজারের থলি হাতে উঠে যায়!!
অনেক লেখকের অকাল মত্যুর জন্য তাদের ওয়াইফ দায়ী! আমিও মরতে বসেছিলাম অনেক বার! আজকাল (১২ বছর পর!) আর কেয়ার করি না। পড়তেও দেই না।
অনেক হারিয়েছি।
উদরাজী এবং অন্য সব বন্ধুর অবগতির জন্য বলছি,আমার বউ আমার কম্পিউটার বিষয়ক সকল কর্মকান্ড অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করেন।কম্পিউটারটা যেহেতু বেডরুমে,তাই....ওনার দৃষ্টি এড়িয়ে কোন কিছু করা বা দেখা(কত কিছুইনা করতে বা দেখতে মনে চায়) সম্ভব নয়।'...ওয়াইফ কখনো ভাল পাঠক হয় না। লিখে এদের দেখালে এমন একটা মুখ ভেংছি মারে - ওরে বাপ, লেখার সাধ মিটে যায় এবং বাজারের থলি হাতে উঠে যায়!!'.....উদরাজী, তোমার এই মন্তব্যের সংগে আমি সম্পুর্ণ একমত।স্বামীদের লেখালিখি বিষয়ে স্ত্রীদের অনাগ্রহ চিরন্তন।
চুপচাপ পড়ে গেলাম!
খুবই ভদ্র ছেলে.....
দারুন ! গতি অব্যাহত রাখলে সবার মুখে হাসি থাকবে দুর্নিবার । না ফাটলেও পেট ব্যথা হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে । সাবাস !
অনেক ধন্যবাদ, নাজমুলভাই....।
দারুন। দারুন। দারুন। নীরবে হাসলাম শেষে আবার কলিগরা পাগল না ভাবে।
আপনার নীরব হাসিটা কল্পনা করে আনন্দ পাচ্ছি...।
লিখে যান ঈশান
উৎসাহ পেলাম সিরাজী,ধন্যবাদ।
ঈশান, আপনার লেখাটা অনেক আনন্দ দিয়েছে। অনেক সুন্দর হয়েছে। শুধু একটা অনুরোধ শেষের অংশটি একটু বিবেচনা করুন। স্ত্রীর অসুস্থতার সাথে কুকুর মারা যাবার বিষয়টার মধ্যে কেমন যেনেএকটা নিষ্ঠুরতা রয়েছে। আশাকরি আমাকে ভুল বুঝবেন না।
সুন্দর একটি লেখার জন্য অভিনন্দন!
আরিফ বুলবুল,ভাই রাত দেড়টা/দুইটায় কেই যদি আপনাকে ফোন দেয়,আপনি উদ্বিগ্ন হয়ে কত খারাপ কিছুই ভাবতে পারেন, তাছাড়া.... জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের ভাবনার চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে যায়।তবুও....আপনার ফিলিংস'র প্রতি অআমার গভীর শ্রদ্ধা রইলো।
লাত্থি মারছিলেন সকালে উইঠা?
নারে ভাই,আমার সেই বন্ধুটি এখন ফোনে আমাকে উল্টো লাথি মারার হুমকি দিচ্ছে...।
ইশান, বাংলা টাইপিং এ খেয়াল রাখো। আমিও অবশ্য তেমন পারি না। আজ তোমার 'নিজের সম্পর্কে' পড়েতে গিয়ে দেখলাম - প্যারা, দাড়ি, কমা ভাল করে দিলে পড়তে আরো সুবিধা হত। এ লেখাটায় প্যারা ভাগ করলে আরো পড়তে সুন্দর লাগত।
চালিয়ে যাও বন্ধু।
তোমাকে ধন্যবাদ উদরাজী, বাংলা টাইপিং'এ আমি এখনো শিক্ষানবীস।আস্তে আস্তে শিখছি...।
মন্তব্য করুন