সালিশ
আমার বাল্যকাল কেটেছে ছবির মত সুন্দর একটা গ্রামে । মাথাভাঙ্গা নদীতীরের সে গ্রামটির দৈর্ঘ্য নদীর তীর ঘেসে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় মাইল দুয়েক । প্রস্থ কত আর হবে ! হয়তোবা আধা মাইলেরও কম । গ্রামটির একপ্রান্তে সমৃদ্ধ বাজার, গ্রামের বাজারের মত নয় মোটেই, তার আবহ ছিল অনেকটাই শহুরে । সেই পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও সেখানে চায়ের দোকান ছিল, ছিল চা পান করবার মত আয়েশী লোকজনও, যাদের কেউই কম বয়েসী নয় । সে সময় ছোটদের চা পানে মনে হয় কিছুটা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল ।
২
আবার অন্যদিকে গ্রামের বাকী অংশ চিরন্তন গ্রামবাংলার মত নিতান্তই গ্রামীন । ইউনিয়ন বোর্ড (কাউন্সিল নামকরণ হয়নি তখনও), প্রেসিডেন্ট (এখনকার চেয়ারম্যান), মেম্বার, চৌকিদার-দফাদার সবই ছিল, তবুও ছোটখাটো বিচারের (সালিশ) জন্য গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বরের উপর সবাই নির্দ্বিধায় নির্ভর করতো । আমার বড় চাচা ছিলেন ‘মাইনুস সুলতান’ (দ্রঃ দেশে বিদেশে – সৈয়দ মুজতবা আলী), তিনি তার ঘর-সংসার, চাষবাস নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটাতেন । মেজোচাচা প্রবল প্রতাপে গ্রামের স্থানীয় সরকার(?) পরিচালনা করতেন । তাঁর হাঁক-ডাক, গালি-গালাজ ছিল চরমভাবে মোড়লোপযোগী । শুধু আমাদের গ্রামেই যে তাঁর কদর ছিল তা নয়; আশপাশের গ্রাম, এমনকি আমাদের ইউনিয়নের সীমানা পেরিয়েও তার বিচার বিবেচনা ও সালিশ মেনে নেবার মানুষের অভাব ছিলনা ।
জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ, চুরি-চামারী, ঝগড়া-বিবাদ, বিয়ে, তালাক সব ধরণের সালিশই বসতো আমাদের বৈঠকখানায় । মূলবাড়ির বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা পাঁচচালা একটা খড়ের ঘর, আমরা বলতাম খানকাঘর । সামনে বিশাল আঙিনা । সালিশের সময় মেজোচাচা তার পারিষদবর্গ নিয়ে বসতেন এর বারান্দায়, আর বাদী-বিবাদী ও গ্রামের গণ্যমান্য মানুষেরা আঙিনায় । উৎসুক ম্যাংগো পাবলিকের সংখ্যাও থাকতো বেশ উল্লেখযোগ্য । দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে আড়ালে-আবডালে মহিলাদের উপস্থিতিও কম হত না । সালিশ বসতো সাধারণত সন্ধ্যার পরে এবং বাজারের চা দোকানের মতই ছোটদের সেখানে যাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা ছিল । নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেমন করে যেন এমনই এক সালিশ বৈঠকের মূল্যবান কিছু সংলাপ একবার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হয়ে গিয়েছিল ।
৩
জয়নাল তার ছোটমেয়ে কুলসুমের বিয়ে দিয়েছে কলিমুদ্দির বড়ছেলে হায়দারের সাথে । তাদের বাড়ী পাশাপাশি, সম্পর্ক বরাবরই ভাল । দেনা-পাওনা বা অন্য কোন কিছু নিয়ে তাদের মধ্যে কখনও বিবাদ-বিসম্বাদও নাই । তাদের মধ্যে যখন বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তখন তাদের ছেলে-মেয়ে দু’জনই নাবালগ । হেসে-খেলে বেড়ায় বর-বধু, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় । কখনও এ-বাড়ি, কখনও ও-বাড়ি করে কুলসুম ও হায়দারের সময় কাটে । শ্বাশুড়ীর সাথে কুলসুমের সম্পর্ক নিয়ে কোন বাহুল্য কথাও শুনা যায়না । হায়দারেরও শ্বশুর বাড়িতে যথেষ্ট আদর-যত্নের ত্রুটি হয়না । এমনি করে দু’জনে বড় হতে থাকে ।
৪
বছর তিনেক পরের কথা । এবার কুলসুম তার বাপের বাড়ি এসেছে একা – অন্যবারের মত হায়দার সাথে আসেনি । মা জিজ্ঞাসা করলো, “অ কুলসুম, একা এলি যে, জামাই আসলো না কেন”? “তার এখন অনেক কাজ, এখন আসতি পারবেনা”, কুলসুম জবাব দেয় । ক’দিন পরে জামাই এলো, আদর আপ্যায়ন, খাওয়া-দাওয়া হলো – জামাই ফিরেও গেল । মা জিজ্ঞাসা করে কুলসুমকে, “জামাইকে থাকতি বললিনা ?” কুলসুম মুখ ঝামটা দেয়, “কিসের জন্যি, কিসের জন্যি থাকতি বলবো !” মা অবাক হয় মেয়ের এই আকস্মিক মুখ ঝামটিতে । এরপরও কয়েকবার হায়দার আসা-যাওয়া করলো, নিয়ে যেতে চাইল কুলসুমকে; কিন্তু কুলসুম আর ও বাড়িতে যাবার আগ্রহ দেখায়না । কলিমুদ্দিও অবশেষে এলো – কিন্তু কুলসুম অনড় । সে যাবে না । দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হল এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হলো একটি সালিশ বৈঠকের ।
৫
বৈঠকখানায় (আমাদের খানকাঘরে) ও তার সামনের আঙিনায় অনেক মানুষের উপস্থিতি – আমরা বুঝলাম, আজ কোন সালিশ বসবে, এটা হয়তো কুলসুম-হায়দারের বিবাহবিচ্ছেদের সালিশ । সন্ধ্যার পরপরই হারিকেন, নম্প (ল্যাম্প-কুপি) হাতে গণ্য-মান্য মুরুব্বিরা এসে উপস্থিত হলেন । মেজোচাচা এসে বসলেন আসরের মধ্যমণি হয়ে । টুকটাক কথাবার্তার পরে শুরু হলো সালিশের কাজ । মেজোচাচার আদেশে প্রথমে কুলসুমের বাপ জয়নাল তার বক্তব্য পেশ করলো । সে যা জানালো তার মূলকথা, “আমার মেয়ে আর হায়দারের ভাত খাবেনা । কারণ হায়দার এখনও ছোট – সে একেবারেই ছেলেমানুষ”।
এবার কলিমুদ্দির বক্তব্যের পালা । ছেলের বাপ হয়ে সারা গ্রামের সব মানুষের সামনে এহেন হেনস্তা সহ্য করা যায়না । হায়দারের বাপ কলিমুদ্দির ধৈর্যধারণ কষ্টকর হয়ে উঠল । সে কিছুক্ষণ একথা সেকথা, এযুক্তি সেযুক্তি দেখালো । কথা বলতে বলতে ক্রমেই তার রাগ বাড়তে লাগলো । মেয়ের বাপের কাছে সে হেরে যাবে ? সে তার বক্তব্যের ইতি টানলো জয়নালের প্রতি সুকঠিন এক প্রশ্ন রেখে, “জয়নাল, কুলিম সাপ (কেউটে/গোখরো), ছোট হলেও তার বিষ আছে । কি ছোটসাপের বিষ থাকে না ?” ।
জয়নালের আর কিই বা বলার আছে । এখন সালিশে যা সাব্যস্ত হয় তাই তো মেনে নিতে হবে । কিন্তু পর্দার আড়ালে, বৈঠকখানার পাশে উপস্থিত মহিলাদের মধ্য থেকে গুঞ্জন শোনা গেল । কেউ একজন হঠাৎ বেশ জোরে বলে উঠলো, “অ কুলসুমের বাপ, উনারে কও, বিষ আছে তো কামড়ায় না কেন ?”
আমরা এরপর হা হা ম গে । সালিশে কি সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা অনুমেয় ।





হ, ঠিক কতা...
“অ কুলসুমের বাপ, উনারে কও, বিষ আছে তো কামড়ায় না কেন ?”
জবাব কি আছে তার ?
চুয়াডাঙ্গার লোকজন ইরাম করি তো কতা কয় না দাদাভাই।
তা'হলি ক্যারাম ক(ই)রি বোলে, তা আপনিই বু(ই)লি দেন ।
হাহামগে
হাসলেন ? লজ্জ্বার কথায় হাসতে হয় এমন করে ?
স্মৃতিচারণ ভালো পেলাম।
শুভেচ্ছা জানবেন।
ধন্যবাদ ।
অশ্লীষ অশ্লীষ!!!

আরে ভাই এটাতো জলজ্যান্ত সত্য ঘটনা !
আরে ভাই এটাতো জলজ্যান্ত সত্য ঘটনা !
মাসুম্ভাই স্টাইলের স্মৃতিচারন একদম
স্টাইল নকল ? মডু মারবে নাকি ?
সাঈদ কেমুন? কামড়াইতে পারেন?
সাঈদ ভাই মনে হয়,
ছোট সাপ টা কে ? কুলিম না হায়দার??
জটিল হিউমার।
) 
দুনিয়াটা একদম কামড়া কামড়ির জায়গা। কামড়া কামড়ির মাঝেই আমাদের বেঁচে থাকা। তবে বেশী কামড়া কামড়ি করলেও আবার উলটা হতে পারে!
জোস, জাক্কাস!
বেশী কামড়া কামড়ির উলটাটা আবার কী চীজরে ভাই ?
ওপেন আলোচনা করা যাবে না।
কেন ? মডু মারবে ?
শুধু কামড়াতে না পারা অপরাধে স্বামীকে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত! তাও বয়স হওয়ার সুযোগও না দিয়ে!!
আপনাদের এলাকার মেয়েরা ব্যপুক, অতি ব্যপুক।
হুম্! আঞ্চলিকতা !
সত্যিই হাহামগে।
তবে সে সময় সালিশও গ্রামের লোকজনদের এক ধরনের বিনোদন জোগাতো। এ কসময় আমিও শালিসে যেতাম। সালিশ বা বিচার কার্য শুরুর আগে উপস্থিত লোকজন নানা ধরনের মুখরোচক কথাবার্তা, ঘটনা বলতো। সেগুলোর মাঝে হাস্যরস যেমন থাকতো তেমনি থাকতো সূক্ষ্ম বুদ্ধি বা কূটকচালের উপস্থিতি।
'এক ধরনের বিনোদন' ? বলতে পারেন অন্যতম বিনোদন । সকলে একত্রিত হওয়ায় উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হত ।
শব্দটা বোধহয় নাবালগ না নাবালক
হাতের কাছে বাংলা-ইংরেজি কোন অভিধানই নেই, তাই নিশ্চিত হতে পারছি না ।
নাবালেগ, নাবালক, নাবালিগ ।
ভীষণ মজা পেলাম কাহিনী পড়ে
।
প্রাণ খুলে হাসুন - দীর্ঘজীবি হউন ।
বাংলা একাডেমীর অভিধান দেখলাম । আপনি ও আমি দু'জনেই ঠিক ।
সত্যিই হাহামগে। ভাল লাগলো স্মৃতিচারণ।
ভাল লাগার আনন্দটুকু আমাদের শক্তি ও উদ্যম ।
দারুণ লিখেছেন
ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন