বিড়ম্বনার শেষ কোথায়
নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে শীত পড়ে বেশ । এই শীতের মধ্যে পরীক্ষা দিতে যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা । আমরা মনে করি তাদের না-জানি কত কষ্ট হয় ! আসলে কিন্তু তারা থাকে আনন্দে – পরীক্ষা শেষ হলেই ছুটি, ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়া আর সবচেয়ে আনন্দ যেটা সেটা হচ্ছে নতুন ক্লাশ-নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পাবার আহ্বান । আর যারা আরও ছোট, তারা তো থাকে মহা মহাআনন্দে । তাদের স্বপ্ন স্কুলে ভর্তি হওয়া – বাবা-মা বলেছে আর ক’টাদিন পরেই তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবে ।
সব বাচ্চারাই স্কুলে ভর্তি হবার জন্য বাবা-মাকে ভারী জ্বালাতন করে । স্কুল ড্রেস পরে হৈহল্লা করতে করতে স্কুলে যাবার স্বপ্ন তাদের অভিভূত করে রাখে । সমস্যা ও আতঙ্ক ভর করে বাচ্চার মা-বাবার মাথায় । আমাদের আমলের কথা বাদ দিলাম, আমার ছেলেমেয়েরা যখন স্কুলে ভর্তি হয়, তখন তাদের ভর্তি নিয়ে, তাদের স্কুলে যাওয়া-আসা নিয়ে আমাদের তেমন কোন চিন্তা করতে হয়েছে বলে মনে পড়েনা । আমার নাতনী ধানমন্ডির একটা স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠল এবার । তার ধারণা ভিকারুন্নেসা সবচেয়ে ভাল স্কুল (তার দুই খালা ও অন্যদের সেখানে পড়তে দেখে)। তার মা-বাবা সেখান থেকে ফরম আনলো, মেয়েসহ সাক্ষাৎকার দিল, নাতনী আমার প্রাথমিক বাঁছাইয়ে টিকল । আশায় গদগদ অবস্থা – শেষ হলো নিরাশা দিয়ে, লটারীতে নাম ওঠেনি, অতএব বাদ । নাতনী আমার আশাহত হল, নিরাশার মেঘ আমাকেও ক’দিন আচ্ছন্ন করে রাখলো ।
গতকাল সারাদিন খবরের কাগজ পড়িনি । এবি’র পিকনিকের আমেজে সে কথা মনেও হয়নি । পিকনিক থেকে ফিরে পিকনিক নিয়ে একটা পোস্ট মনে মনে দাঁড় করাচ্ছিলাম আর প্রথম আলোটা নাড়াচাড়া করছিলাম ।হঠাৎ চোখ আটকে গেল চিঠিপত্র কলামে । ‘আমরা বন্ধু’র এক বন্ধু মাইনুল এইচ সিরাজীর ‘স্কুলে ভর্তির আগেই...’ শিরোনামে একটা পত্র ছাপা হয়েছে । পিকনিকের ক্লান্তি, পিকনিকের আনন্দ, পিকনিকের পোস্ট দেবার আগ্রহ এক ফুৎকারে নিভে গেল । ‘আমরা বন্ধু’র পিকনিকে যারা যেতে পারেননি, তারা হয়তো এ পত্রখানি পড়েছেন । কিন্তু যারা গতকাল আমার সহযাত্রী ছিলেন তারা হয়তো পড়েননি । মনে হলো, তাদেরকেও মাইনুল এইচ সিরাজীর মনোকষ্টের অংশীদার করা দরকার । তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করা নিয়েও তো নিত্য এমন ঘটনা ঘটছে, বা ঘটতে পারে – তাদের পূর্ব প্রস্তুতি আবশ্যক ।
সিরাজী লেখক মানুষ – তার অনুভূতি তিনি যেভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন তা আমার পক্ষে সম্ভব নয় । তাই তার মনোবেদনা তার মুখ দিয়ে শুনলেই তার কষ্ট ও মানসিক অবস্থা বুঝতে সুবিধা হবে ।
“আমাদের পাঁচ বছরের মেয়ে কুশিয়ারা। একটু বড় হওয়ার পর যখন সে খাতা-পেনসিলে আঁকিবুঁকি করতে শিখল, তখন থেকেই সে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। টিভিতে যখন সে স্কুল ড্রেস পরা শিশুদের দেখে কিংবা কোনো স্কুলের সামনে দিয়ে যায়—তখন বলে, ‘মা, আমি কখন স্কুলে যাব?’ বলে, ‘বাবা আমাকে স্কুল ড্রেস কিনে দাও না কেন?’
তার সঙ্গে আমরাও স্বপ্ন দেখি, চার-পাঁচ বছর হলেই তাকে স্কুলে দেব। সাদা-মেরুন কিংবা সাদা-আকাশি পোশাক পরে সে স্কুলে যাচ্ছে—আমাদের স্বপ্নের দৃশ্য!
লেখাপড়াটা সে উৎসাহ নিয়েই করে। অঙ্ক, বাংলা, ইংরেজি, ছবি আঁকা—সবকিছুতেই তার আগ্রহ ও দখল। সব বাচ্চাই হয়তো এ রকম। তবু নিজের মেয়ে বলে আমাদের কাছে কুশিয়ারাই সেরা।
২১ ডিসেম্বর ছিল কুশিয়ারার স্বপ্নের স্কুলের ভর্তি-প্রক্রিয়ার শুরুর দিন। অর্থাৎ জীবনের প্রথম স্কুলের ভর্তি পরীক্ষা। সাধারণত সকাল ১০টার আগে সে ঘুম থেকে জাগে না। কিন্তু ২১ তারিখ আটটার আগেই সে জেগে তৈরি হয়ে গেল। বাসা থেকে বের হলাম এক ঘণ্টা হাতে নিয়ে। পরীক্ষা ১০টায়। রিকশা নেই। ১৫ মিনিট হাঁটলাম। মেয়ে তো যেন দৌড়াচ্ছে তার স্বপ্নকে ধরার জন্য। সকাল পৌনে ১০টায় স্কুলে পৌঁছে ভিড় ঠেলে মেয়েকে পাঠিয়ে দিলাম পরীক্ষাকেন্দ্রে। অনেক বাচ্চাই মা-বাবাকে ছেড়ে একা একা কাঁদছিল। অনেকে পরীক্ষা না দিয়ে চলেও এসেছে। কিন্তু কুশিয়ারা উৎসাহের সঙ্গে পরীক্ষার কক্ষে ঢুকেছে।
দেড় ঘণ্টা উৎকণ্ঠায় কাটিয়ে দিলাম। সবার মতো আমাদের চিন্তা হচ্ছিল—না জানি কী করছে ওরা ভেতরে! প্রশ্ন বুঝতে পারছে তো! শিক্ষকেরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন তো!
পরীক্ষা শেষ হলো। ভিড়ের ভেতর থেকে মেয়েকে খুঁজে নিলাম। কোলে উঠেই মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ম্যাডাম আমাকে মেরেছে।’ আমি তো অবাক! রিকশায় আসতে আসতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাসায় ফিরে জিজ্ঞেস করলাম। তার একই কথা—প্রশ্ন বুঝতে পারেনি বলে ম্যাডাম ওকে থাপ্পড় মেরেছে। আমি, ওর মা বারবার বললাম—ওটা থাপ্পড় নয়, গালটিপে তোমাকে আদর করেছে। বিরক্ত হয়ে এবার সে নিজের গালে কষে থাপ্পড় বসিয়ে বলল, ‘ঠিক এভাবে মেরেছে।’ আমরা নির্বাক! কী বলব! কী করব!
স্কুলে শারীরিক শাস্তি দণ্ডনীয় অপরাধ—এটা নাহয় বাদই দিলাম, ও এখনো স্কুলে ভর্তিই হয়নি, তবু তাকে শাস্তি দেওয়া হলো—এটাও বাদ দিলাম, বাচ্চাদের স্কুলের শিক্ষকেরা বাচ্চার মনস্তত্ত্ব বোঝেন না—তাও বাদ দিলাম; আমি শুধু ভাবছি—আমাদের মেয়ের এক আনন্দময় স্বপ্নের ক্ষেত্রকে নিরানন্দ, বিষাদময়, আতঙ্কসঙ্কুল করে দেওয়ার শাস্তি কী। কে দেবে সেই শাস্তি।
মেয়ে যখন বলে, ‘বাবা, স্কুল আমার ভালো লাগেনি’, তখন আমরা কী করতে পারি! আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি।”
মাইনুল এইচ সিরাজীর এই লেখা পড়বার পরে পিকনিক নিয়ে পোস্ট দেবার সাধ থাকে আর ? একটা শিশুর স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেবার অধিকার কি কেউ কাউকে দিয়েছে । এমনই হাজারো শিশুর স্বপ্ন অহরহ ভাঙছে, সিরাজীর মত তারা তা কাউকে জানাতেও পারেনা, শুধু গুমরে মরে অন্তরে !





নাহ! মনটাই খারাপ করে দিলেন। এরা শিক্ষক নামের কলঙ্ক।
কি করবোরে ভাই । কষ্ট এত বেশি হচ্ছিল যে কাউকে না জানিয়ে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না । যে জানবে তারই মন খারাপ হবে তা বুঝেও পোস্টটা দিয়ে ফেললাম তাই ।
ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় নাজমুল ভাই। এবি বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের মনোযন্ত্রণা শেয়ার করার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আপনার লেখা পড়তে পড়তে আমার চোখ ভিজে এসেছে। আপনারা আছেন বলে ভেজা চোখ আবার মুছতে পেরেছি।
কুশিয়ারাকে সেই স্মৃতি ভোলানোর চেষ্টা করছি। সবাই েদায়া করবেন। তার স্বপ্নের ফুলটা নিশ্চয়ই আবার পাপড়ি ছড়াবে।
কুশিয়ারার স্বপ্নের ফুল পাপড়ি ও সৌরভে দিক-দিগন্ত ভরিয়ে তুলুক ।
চুপচাপ পড়ে গেলাম।
রাসেল আশরাফের পোস্টে আপনার মন্তব্য "(আত্বীয় স্বজন যখন বলে আর একটা নিয়ে নে, আমি তখন ভাবি। মাঝে মাঝে গালিও দেই, হালার হুত - মদন নাকি! হা হা হা। আপনার আর একজনের ইচ্ছা আছে কি!)" একেবারে চুপচাপ না পড়ে অন্তত এমন একটা মন্তব্য করে দুঃখের মধ্যে একটু আনন্দ দিতে পারতেন তো ।
হুদা ভাই, অনেক কিছুই বলা যায়। মনে আমার অনেক কথাই জমে আছে। কিন্তু কি হবে বলে! আমি এজন্য সিরিযাস বিষয় নিয়ে ব্লগে আসি না। ফান নিয়ে পড়ে থাকি, এতে মনে শান্তি মিলে।
ব্লগে সিরিয়াস কিছু নিয়ে আলোচনা করতে আমারও তেমন ভাল লাগেনা । ব্লগকে আড্ডা হিসেবেই আমার পছন্দ । তবু আমি কষ্টের কথা বলি । আমার কষ্টের অংশীদার যদি বন্ধুরা না হয়, তা'হলে কেমন বন্ধুত্ব । এ মন্তব্যটাকে সিরিয়াস হিসেবে না নিলেই ভাল হয় ।
হতাশা!
আমার ভাবনার সংগে মিলে যায়...।
৭ বছর আগে ঠিক এরকম এক মনঃকষ্ট পেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে অনেক হয়েছে,আর নয়, এবার দেশ ছাড়তে হবে।সিভিল সার্ভিসে (প্রশাসন ক্যাডারে) সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ছুড়ে ফেলে এক মাত্র মেয়েকে নিয়ে দেশ ছেড়েছি। আমার মেয়ে এখন লন্ডনের সেরা স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে, মেয়ের চোখে মুখে যে আনন্দ দেখি তাতে আমার অন্য সব কস্ট ম্লান হয়ে যায়। জীবনের সেরা সিধান্তটা সঠিক সময়ে নিতে পেরেছি বলে নিজেকে অনেক চপমুক্ত মনে হয়।
অতিথি ভাই, আপনার নামটা অন্তত জানতে দিন আমাদের । সিভিল সার্ভিসে (প্রশাসন ক্যাডারে) আমার চাকরি শেষ হয়েছে বছর সাতেক আগে । আপনি সাহসী মানুষ । ভীরু আমি, দেশেই আছি । শুভ কামনা ।
মারলো কেন?
যে মেরেছে সে ছাড়া আর কেউ এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না । যে মার খেয়েছে সেও তো জানেনা যে, সে কেন মার খেয়েছে ? জাতি জানতে চায়, মারলো কেন ?
অনেক বাচ্চার জন্য স্কুল একটি যন্ত্রণা আর আতংক ছাড়া কিছু না। আমার বড় ছেলেটি এক সময় স্কুলে যেতে চাইতো না কোনো এক শিক্ষকের ভয়ে। তারপর তার সেই শিক্ষক স্কুল থেকে চলে গেলে ক্লাস করাটা তার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠেছিলো।
কোনো শিক্ষকের হাত চলে বাচ্চাদের উপর তেমন শিক্ষকদের প্রাইমারি লেভেলে নিয়োগ না দেওয়াটাই ভালো মনে করি।
পত্রিকায় এমন সংবাদও পড়েছি যে, শিক্ষিকার প্রহারে ছাত্রের মৃত্যু।
মন খারাপ হয়ে গেলো। কুশিয়ারার মন ভালো হোক, সে আনন্দ খুঁজে পাক, এই কামনা
কুশিয়ারাসহ সব শিশুরা আনন্দে থাকুক, এত সামান্য একটু চাওয়া তাও পূরণ হয়না, আমরা এমনি অভাগা !
মন্তব্য করুন