ইউজার লগইন

স্মৃতির নরোম রোদমাখা গলিপথে

গত পনের দিন যাবত অফিসে উদভ্রান্ত কাজের চাপ যাচ্ছে। বেশ ভালই দৌড়ের উপরে আছি। কাজের চাপ বা দৌড়ের উপর থাকাটা উপভোগই করি মোটামুটি। আবার মাঝে মাঝে মন বিদ্রোহ করে বসে, তখন মনকে সুস্থির করার জন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকেই ঘুরে বেড়াই স্মৃতির রাজপথ থেকে গলিপথে গলিপথে।
শিশুবেলার স্মৃতির গলিটা মাখামাখি করে আছে সকালের নরোম রোদে। গলির দু'পাশে সারি সারি দাঁড়ানো ঘর গুলোর জানালা থেকে হাত বাড়িয়ে এই স্মৃতি ওই স্মৃতি আমাকে ডেকে চলে। আমি আনন্দিত হই। আমার রক্তে কাঁপন ওঠে শিশুবেলার স্মৃতিদের দেখতে পেয়ে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই গলির প্রায় শেষ মাথার একটা ঘরে। যেখানে আমার অনেক পুরোনো স্মৃতিগুলোর বসবাস। এই ঘরটার অনেক বাসিন্দাই চলে গেছে সময়ের সঙ্গী হয়ে, আবার কেউ কেউ রয়ে গেছে আমারই মায়ায়।
তাদের ভেতর থেকেই খুঁজে পাওয়া কিছু স্মৃতির সাথে...

*
কেজিতে পরতাম। বাসায় আব্বু মাঝে মাঝে গুন গুন করে গাইতো
"বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের এই বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রুপসী বাংলা রূপের যে তার নাইকো শেষ"
শুধু এই লাইনটাই। আমি কখনো যদি এর পরের লাইন গুলো শুনতে চাইতাম, আব্বুর স্বর আরো নিচু হয়ে যেতো। আব্বু বলতো এখন এই গান গাওয়া ঠিক না, তোমার এখন এই গান শেখার দরকার নেই। বিস্নিত হতাম, কৌতুহলী হতাম, কিন্তু কৌতুহল চাপা দিয়ে রাখতাম।

*
আমার দাদু, মানে আমার বড় বোনের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য ছয় বছরের। কিন্তু সেটার কোনো ছায়া আমাদের দু'জনের দুষ্টুমিতে বাধা হয়নি। ছুটির দিন আমাদের প্রায় অবধারিত খেলা ছিলো বাসার বারান্দায় পানি ঢেলে পিছলা পিছলা খেলা। কখোনো সেই পানির সাথে যোগ হ'তো জেট ডিটারজেন্ট পাউডার, আরো বেশি পিচ্ছিল হয়ে উঠতো বারান্দা। আরো বেশি উচ্ছাস আনন্দ যোগ হ'তো আমাদের খেলায়।

*
একবার প্রচুর বৃষ্টিতে বাসার উঠোন, পাশের বাসার শিরিন আন্টিদের জঙ্গল টাইপের বাগানে হাঁটু পানি জমে গেলো। সন্ধ্যার মুখোমুখি সময়, আম্মু তখনো ভাতঘুম থেকে ওঠেনি। আমি আর দাদু একটা গামছা নিয়ে নেমে পড়লাম সেই পানিতে। মিশন মাছধরা। যদিও মাছ কোত্থেকে আসবে সেই ধারনা নেই। মাছ ধরার আশায় আশায় চলে গেলাম শিরিন আন্টিদের বাগানে। শেষ অব্দি মনেহয় দুইটা না তিনটা পুঁটি মাছ পেয়েছিলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার। আম্মু এদিকে রেগে অগ্নিগিরি। মার পড়েনি পিঠে, তবে নিয়ম ভঙ্গের শাস্তি হিসেবে বিকেলের দুধ বিস্কুট থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম।

*
বাসায় কয়েকটা মুরগী পালা হ'তো। একদিন দাদু দুইহাত মুঠ করে নিয়ে এসে আমাকে বলছে দেখ দেখ কি নরোম। আমি দেখি যে দাদুর হাতের মুঠোয় একটা ডিম, আর কি আশ্চর্য!!! ডিমের খোলসটা আসলেই নরোম। একটু পর দাদুর কাছ থেকে সবিস্তারে জানতে পারলাম যে কিছুক্ষণ আগে, আমাদের কালো মুরগীটা ঠিক দাদুর সামনেই ডিম পেড়েছে। দাদু সেটা তুলতে গিয়ে টের পেয়েছে যে এট তুলোর মতো নরোম।

*
বাসায় যখন দাদু আর এলাকার মেয়েরা মিলে রান্না-বাটি খেলতো, নিশ্চিত ভাবে আমি বাজার সরকারের দায়িত্বটা পেতাম। আমারই সমবয়েসী ছেলেদের কেউ পেত বাসার চাকরের দায়িত্ব, কেউ পেত কোনো একজনের বাচ্চা হবার দায়িত্ব। এরকমই একদিন বাজার সরকারগিরি করছি, মাথায় কি ভুত চাপলো বাজারের ব্যাগ হাতে ঢুকে গেলাম আমাদের স্টোর-রুমে। সেখানে একটা পুরোনো টেবিল ল্যাম্প ছিলো, যেটার বাল্ব লাগানো ছিলোনা। আমি আধুনিক শপিংয়ের আনন্দে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অন করে হোল্ডারের ভিতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছি, খেয়াল আর করি নি যে ল্যাম্পের পাওয়ার কানেকশন দেয়া আছে। তো, আঙ্গুল হোল্ডারের ভেতর দেবার সাথে সাথেই হোল্ডার আমাকে আকর্ষণ করে বসেছে। আমি ভয়ে হাত ঝাড়ি দিচ্ছি, কিন্তু হোল্ডার আর আমাকে ছাড়ে না। কোন সময় জানি একটা চিল্লানি দিয়ে সর্বশক্তিতে হাত ঝাড়ি দিয়েছি, তারপর আর কিছু মনে নাই। পরে দেখি যে আমার তর্জনী আর মধ্যমায় ছয়খানা ফোস্কা পড়ে আছে...

*
আমাদের একটা বুড়ো টিয়াপাখি ছিলো। নিয়ম করে দুইবেলা চা বিস্কুট খেতো। খাঁচাবন্দী পাখিটাকে দেখলে আমার পাখিটার সাথে নিজেকেও ভীষণ অসহায় মনে হ'তো কেনো জানিনা। একবার কোনো এক ছুটিতে খুলনা গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরে সবাই দেখে পাখির খাঁচা খালি। সবারই মন খারাপ। এতদিনের পোষা পাখিটা এভাবে ঠোঁট দিয়ে খাঁচার দরজা খুলে উড়ে চলে যাবে এটা মানতে কষ্ট হচ্ছিলো সবারই। আমি কিন্তু উপরে উপরে কষ্ট কষ্ট ভাব দেখালেও ভিতরে ভিতরে খুব খুশি, কারণ বাসা থেকে বের হবার আগে আমিই পাখির খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েছিলাম। এই কথাটা আমি সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলাম প্রায় এক বছর।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের এই বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রুপসী বাংলা রূপের যে তার নাইকো শেষ

লাইনটা আমার খুব পছন্দ।
স্মৃতিচারণ খুব ভালো লাগলো। বড়বেলার স্মৃতিচারণ ও কইরেন। নাইলে বান্ধবীরা সেন্টু খাপে।

রায়েহাত শুভ's picture


সেন্টু মিয়ারে কি কাবাব বানায়ে খাপে?

রাসেল আশরাফ's picture


আজকের লেখাটা বুঝতে পারছি। Big smile Big smile

ভালো লাগছে স্মৃতিচারণ।

রায়েহাত শুভ's picture


আমার লেখা বুঝতে পারেন্না? Sad( Sad( এই দুক্খু কৈ রাখি Sad(

জ্যোতি's picture


আম্মো আজ বৃত্তর লেখা বুঝছি। দাঁতও ব্যাথা হয় নাই।

রায়েহাত শুভ's picture


টিসু টিসু টিসু

লীনা দিলরুবা's picture


স্মৃতির ঝাঁপি আরো খুলে দাও, স্বপ্ন ছাড়া যেমন ভবিষ্যত নেই তেমনি স্মৃতি ছাড়া অতীত মলিন আর আবছা।

রায়েহাত শুভ's picture


স্মৃতির ঘরে বেড়াতে যেতে ভালোই লাগে। কিন্তু আঁকড়ে ধরে থাকতে ভাল্লাগেনাহ Glasses

মীর's picture


আপনের লেখা তো বেশ সাবলীল আর বোধগম্য হয়। মানুষ বোঝে না নাকি? আজব তো!Surprised
আমি সাধারণত আেপ্নর প্রতিটি লেখাই বুঝি বৃত্তভাই, অসুবিধা হয় না; কিন্তু আজকেরটা কেন যে মাথার উপর দিয়ে চলে গেল At Wits End

১০

রাসেল আশরাফ's picture


আমাদের মাথার এন্টেনা আপনার মাথার এন্টেনার মতো হাই ফ্রিকোন্সী ওয়ালা না।তাই বুঝি না।এতে আজাব ওজুবের কিছু নাই। Crazy

আজকেরটা লোয়ার ফ্রিকোয়েন্সীর তাই আপনার এন্টেনায় ধরে নাই। Glasses

১১

মীর's picture


এই কমেন্টটা তো অনেক টিউনিং কৈরেও ধর্তার্লাম্না। এন্টেনায় হইলোটা কি বাংলাদেশ

১২

রাসেল আশরাফ's picture


ও এতোক্ষনে বুঝছি।

আপনার এন্টেনাই শুধু হাই লেভেলের না আপনি অনেক ওপরতলার মানুষ। Glasses

১৩

লীনা দিলরুবা's picture


আপনার এন্টেনাই শুধু হাই লেভেলের না আপনি অনেক ওপরতলার মানুষ।

কত তলার মানুষ! মীর ঝাইড়া কাশেন, আসলে আপনে কত তলার উপরে থাকেন Big smile আকাশের উপরে?

১৪

মীর's picture


দোতলায় থাকি। বেশি উপরে বলে তো মনে হচ্ছে না।
আকাশরা কয় তলায় থাকে লীনা আপু?

১৫

লীনা দিলরুবা's picture


রাসেলের কথা কে তো ফেলে দিতে পারি না Big smile আকেল মানকে লিয়ে ইশারাই কাফি Wink

১৬

মীর's picture


হ আমিও মনে হয় এখন একটু একটু বুঝতে পারতেসি বিষয়টা।

১৭

রাসেল আশরাফ's picture


SmileySmileySmileySmileySmileySmileySmiley

১৮

রায়েহাত শুভ's picture


মীর আপনেও? পার্লেন??? Sad Puzzled

১৯

মীর's picture


Big smile ... সান্তনা

২০

লীনা ফেরদৌস's picture


- হুমমম বেশ দুষ্টু ছিলা মনে হয় ! Smile

খুব ভাল লাগল বৃত্ত Cool আমার ছোটভাই আর আমার দুষ্টুমীর কথা মনে পড়ে গেল Smile

২১

রায়েহাত শুভ's picture


কোন অংশটা কোট করছিলেন লীনাপা?
আমার ভাগ্নি কেমন আছে???

২২

লীনা ফেরদৌস's picture


্কি রে ভাই দুই দুইটা লাইন কোট ক রলাম, তারা কই হারাইলো Shock খালি দেখি সবুজ লাইন আসল Shock

২৩

হাসান রায়হান's picture


আশচ্ার্য বড় বোনরে অদ্ভূত নামে ডাকে ক্যান মাইনষে! কেউ বাজি, কেউ দাদু, কেউ জেঠা!!!

২৪

লীনা দিলরুবা's picture


Big smile
আমার এক বান্ধবী ছিল মিথুন, ও ওর বোনকে ডাকতো, মেজো ভাইয়া Shock

২৫

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আমি আমার বড় বোনরে নাম ধরে ডাকতাম Cool

২৬

রায়েহাত শুভ's picture


আমার ছোট বোন আমারে নাম ধরে ডাকে Big smile

২৭

রায়েহাত শুভ's picture


Shock কি কন? এত কিছু থাকতে মেজো ভাইয়া???

২৮

রায়েহাত শুভ's picture


রায়হান ভাই, আমি অনেকদিন গবেষণার পর বের করতে পারছি কেন আমি আমার বোনেরে দাদু ডাকি।
আব্বু বোনকে "মা" বলে, আর বাবার মা দাদু হয়।
সো শিশু সাইকোলজিতে বোনরে দাদু ডাকা জায়েজ Tongue

২৯

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


মজা লাগলো পড়ে Smile

৩০

রায়েহাত শুভ's picture


আরে এইটা কে??? Shock

অনেকদিন পর তোমারে দেইখা ভালো লাগলো এপু...

৩১

সামছা আকিদা জাহান's picture


স্মৃতীর পাতাগুলি অবসরে উলটা উলটে দেখতে খুব ভাল লাগে। লেখাটা পড়ে লগ ইন না করে পারলাম না। ভাল আছ তো ভাই।

৩২

রায়েহাত শুভ's picture


আমি ভালোই আছি, আপনি কেমন আছেন রুনা আপু?

৩৩

শওকত মাসুম's picture


আমার মাকে তাঁর ছোট বোনরা ডাকে নানু, আমার পরের খালাকে ডাকে তাঁর ছোট বোনরা দাদু।

বৃত্ত যে এতো সহজ কর লিখতে পারে মাঝে মধ্যেই ভুলে যাই। দারুণ লাগলো লেখাটা।

৩৪

রায়েহাত শুভ's picture


আরে মজার তো Smile

পরের লাইনের জন্য Steve Sad

৩৫

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


আপনার লেখার স্টাইল এত্ত সুন্দর। ভালো লাগল

৩৬

রায়েহাত শুভ's picture


রিশাদ, আপনার গল্পগুলোও আমার দারুণ লাগে। শুধু আলস্যের কারণে কমেন্ট দেয়া হয় না Sad

৩৭

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আহা শৈশব...স্মৃতি তুমি বেদানা Smile)

৩৮

রায়েহাত শুভ's picture


আহা স্মৃতি তুমি বেদানা... সাথে কলা, দুধ, আপেল, কাস্টার্ড পাউডার দিলে বেশ মজাদার কাস্টার্ডও হৈতে পারে Tongue Tongue

৩৯

আহমাদ মোস্তফা কামাল's picture


আহা, মধুর শৈশব...

লেখাটা দিনেই পড়ছিলাম, কিন্তু কিছু কই নাই, আমার নাম না থাকায়.. Puzzled Sick Worried

৪০

রায়েহাত শুভ's picture


আপনি পড়ছেন তাতেই মুগাম্বো খুশ হুয়া Big smile

৪১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


অতীব সাদামাটা আর সোয়াদ লাগলো লেখাটা কাউয়া ভাই...

৪২

রায়েহাত শুভ's picture


আপনে আমারে ভাই বলা ধর্লেন কবেত্থে??? Shock Shock

৪৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


তোমারে না, কাউয়ারে বাই কৈছি Big smile Wink

৪৪

রায়েহাত শুভ's picture


কাউয়া কৈ???

৪৫

জেবীন's picture


লেখা ভাল্লাগছে অনেক! Laughing out loud

পিঠাপিঠি ভাইবোন সহ এমন অনেক কান্ড করেছি। মুরগির ডিম(আমাদের কবুতরও ছিলো), মাছ ধরাটা, পিছলা খাওয়াটা পুরো মিলে গেছে! এছাড়াও কতো কি যে করছি! অনেককিছু মনে পড়লো! Smile

৪৬

জেবীন's picture


স্মৃতিকথা লেখার শুরুটা দারুন হইছে! অন্যরকম Smile

৪৭

রায়েহাত শুভ's picture


ওরে থেংকু থেংকু...

৪৮

তানবীরা's picture


ভালো লেগেছে স্মৃতিচারণ।

৪৯

রায়েহাত শুভ's picture


আজকাল স্মৃতি আপার সাথে সময় কাটাতে আমারো ভালো লাগে... Laughing out loud

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রায়েহাত শুভ's picture

নিজের সম্পর্কে

©
সকল লেখালেখি ও হাবিজাবির সর্বসত্ব সংরক্ষিত...