'গুরু' তোমাকে সালাম
সন ১৯৭৪ - যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ - বিধ্বস্ত অর্থনীতি - অত্যাসন্ন দুর্ভিক্ষের আহাজারি চারদিকে - রাজধানী ঢাকাও এর ব্যতিক্রম নয় - এরকম সময়ে - বিষন্ন এক সন্ধ্যা - কমলাপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন বস্তির পাশ দিয়ে হাঁটছেন দীর্ঘদেহী একজন মানুষ - লম্বা পাঞ্জাবি - কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল - কিছুটা যেন অন্যমনস্ক - তারপর কেন যেন থমকে গেলেন তিনি - তীব্র কান্নার শব্দ ভেসে আসছে বস্তির কোনও ঘর থেকে - একটু এগিয়ে যেতেই দেখলেন - এক মা তার শিশুর মাথা কোলে নিয়ে কাঁদছেন - সেটা ছিল ক্ষুধা আর দারিদ্রের বিরুদ্ধে এক মায়ের ব্যর্থ করুণ আহাজারি - সাদা পাঞ্জাবির আড়ালে লুকানো একটি হৃদয় সেদিনকার সেই আহাজারি ভুলতে পারেনি - সেই সন্ধ্যায় জন্ম হয়েছিল একটি বিখ্যাত গানের (রেললাইনের ওই বস্তিতে - জন্মেছিল একটি ছেলে) - জন্ম হয়েছিল একজন শিল্পীর - আমি আসলে খুব কম বললাম - ওই সন্ধ্যা ছিল বাংলা গানের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের জনক - এবং সেই অধ্যায়ের নায়ক একজন - শুধুই একজন - পপ সম্রাট আজম খান.
মানুষটা একটু অদ্ভুতুড়ে ছিলেন - কিছুটা কর্কশ - কিছুটা রাগী - কিছুটা যেন অভিমানী - কিন্তু সত্যিকারের একটা হৃদয় ছিল তার - আর ছিল অদ্ভুত এক গায়কী - এভাবে কেউ গায় না - এভাবে কেউ গাইতে পারে না - কখনো পারেনি - তিনি এক বা দুই নম্বর ছিলেন না - তার স্থান অন্য কোথাও ছিল - হয়ত মানুষের হৃদয়ে - মানুষটাকে সবসময় আমি নিজের 'হিরো' মেনেছি - এখনো মানি - তার প্রতিটা গানই যেন একটি গল্প - সমালোচকেরা অন্য কথা বলবেন - ব্যাকরণের কথা বলবেন - কিন্তু আজম খান বহুমাত্রিক মানুষ - তিনি তার নিজের ব্যাকরণে গাইতেন - যেখানে দাঁড়িয়েছেন - সেটাই তার মঞ্চ হয়েছে - মানুষটা হৃদয় থেকে গাইত - তাই ব্যাকরণের পাতায় নয় - সমালোচকের কলমের ডগায় নয় - সাধাসিধে হৃদয়ের উপরই তার রাজত্ব.
২৮ ফেব্রুয়ারি , ১৯৫০ ঢাকার আজিমপুরে - মূল নাম মাহবুবুল হক খান - বাবা আফতাবউদ্দিন আহমেদ - সরকারী চাকুরে, মা জোবেদা খাতুন । চার ভাই তিন বোনের মাঝে তিনি তৃতীয় - ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন এবং পড়াশোনার সমাপ্তি এখানেই. কারণটা সুস্পষ্ট - দেশের প্রয়োজন ছিল তখন একজন যোদ্ধার - এবং আজম খান হাতে অস্ত্র তুলে নিতে সেদিন বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি.
স্টেজ কাঁপানো এই মানুষটি প্রকৃত অর্থেই যোদ্ধা ছিলেন - ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুথানে ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ - রাজপথে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্যরূপে বিপ্লবী গণসঙ্গীত পরিবেশন করতেন - এলো ১৯৭১ - বাবার কাছে অনুমতি চাইলেন যুদ্ধে যাবার - অনুমতি পেলেন তিনি - শর্ত একটাই - দেশ স্বাধীন না করে ফিরতে পারবেন না - কি অসাধারণ এক বাবা - আর তিনিও তো সেই 'বাপ কা বেটা' - তাই কথা রাখলেন - অস্ত্র হাতে হয়ে উঠলেন জ্বলামুখী - দুই নম্বর সেক্টরের একজন গেরিলা কমান্ডার ছিলেন - যাত্রাবাড়ি-গুলশান-ডেমরা এলাকায় অনেকগুলো দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশনে নেতৃত্ব দেন - অপারেশন তিতাস ও অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল এর কথা তো লোকের মুখে মুখে ফিরেছে - তার নেতৃত্বে ঢাকার অদূরে মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে ও কালিগঞ্জের সম্মুখ সমরে পাকসেনাদের পর্যুদস্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা - মাঠের যুদ্ধ শেষ হলো - ঘরে ফিরলেন আজম খান - কিন্তু বুকের মাঝের যোদ্ধা তখনও জেগে আছে - যুদ্ধ পরবর্তী হতাশা , বেকারত্ব, অরাজকতা তখন চারদিকে - আজম খান তাই চুপ থাকতে পারেন নি - হাতে তুলে নিলেন নতুন অস্ত্র - গীটার.
তিন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তুললেন নিজের ব্যান্ড "উচ্চারণ" - টিভির পর্দায় তাকে দেখা গেল ১৯৭২ এ - গাইলেন দুটি গান - 'এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না' আর 'চার কলেমা সাক্ষী দিবে' - বাঙালি শ্রোতাদের জন্য এটা ছিল নতুন অভিজ্ঞতা - সুর তাল লয় সবকিছুই অন্যরকম ছিল - এ যেন গান নয় - উদাত্ত প্রাঞ্জল সত্যভাষণ - সঙ্গীত বোদ্ধারা সমালোচনার ঝড় তুললেন - ব্যাকরণ বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন - মন্থরগতি নিরুপদ্রব গানের জগতে এই আগ্রাসী গায়ককে তারা মেনে নিতে পারেননি - কিন্তু তরুণ প্রজন্মের বুকের রক্ত ছলকে উঠেছিল - আজম খানের ধারালো গায়কী তাদের অন্তরের অন্তস্থলে গিয়ে বিধেছিল - তারপর এলো ১৯৭৪ - টিভির স্ক্রিনে আবার আজম খান - স্টেজে দাঁড়িয়ে আজম খান উগড়ে দিলেন বুকের সমস্ত জ্বালা -'ওরে সালেকা ওরে মালেকা, ওরে ফুলবানু পারলি না বাঁচাতে' - গান নয় - যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ - ছন্দ নয় - যেন ঝড়ের তান্ডব - হতাশায় ধুঁকতে থাকা সমাজ যেন ওই গানে নিজের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পেয়েছিল - সহস্র নারীর বঞ্চনার গল্প যেন বলে গিয়েছিল ওই গান - এবং দুরদর্শীরা সেদিন ঠিকই বুঝেছিলেন - আজম খান নামের এই দাপুটে ঝড় অচিরেই বাংলা গানের প্রচলিত অনেক ধারণা বদলে দেবে.
ঘটেছেও তাই - আজম খান একটার পর একটা গান গেয়েছেন - প্রতিটা গানই যেন নতুনত্বের মোড়কে মোড়া - ঝাঁঝালো ভালোলাগায় ভরা - গান - সেটা ভালবাসা কিংবা বিরহের হোক - ভাঙ্গা কিংবা গড়ার হোক - আজম খানের গায়কীতে তা হয়ে উঠেছে অনবদ্য - স্টেজের উপর দাঁড়িয়ে আজম খান যেন গাইতেন না - ছুড়তেন অব্যর্থ শব্দবাণ - প্রতিটি গানেই ছিল সহজ উপস্থাপনা - অজানা অথচ চিরচেনা গল্পের আবহ - তাই অনায়াসে তা মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে .
'পাপড়ি কেন বোঝে না' বলে যখন টান দিয়েছেন দরাজ গলায় - শ্রোতাদের বুকের মাঝে বিঁধেছে এক প্রেমিকের অন্তর্জ্বালা - যে প্রেমিক আজম খান নিজেই - পরে সাক্ষাতকারে স্বীকার ও করেছেন নিজের সেই ব্যর্থ প্রেমের কথা - বড় অকপট মানুষ ছিলেন তিনি.
একদিন গাইলেন - 'রেললাইনের ঐ বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে মা তার কাঁদে ছেলেটি মরে গেছে - হায় আমার বাংলাদেশ' - গান নয় যেন আর্তনাদ - তার সাথে পুরো বাংলাদেশই আর্তনাদ করে উঠেছিল - এমনি জাদু তার কন্ঠে - 'আলাল আর দুলাল' কে নিয়ে গান বেঁধেছেন - সে যেন এক রূপকথা .
আজম খান খোলা মনের মানুষ বলেই হয়ত জটিল শব্দ এড়িয়ে যেতেন - গাইতেন ভিতর থেকে - নিজেকে নিংড়ে দিয়ে আবেগের গভীরতম উপলব্ধি থেকে - যেভাবে গেয়েছিলেন 'অভিমানী তুমি কোথায় হারিয়ে গেছ' - তরুণ সমাজ যেন এই গানে পাগল হয়ে উঠেছিল - সে তরুণ গ্রন্থকীট হোক কিংবা ক্লাসের ব্যাকবেন্চার - এই গান তাদের প্রেমিক সত্তাকে জাগিয়ে দিয়েছিল.
চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপ, আসি আসি বলে তুমি, আমি যারে চাই রে, হাইকোর্টের মাজারে - এ তালিকা শেষ হবার নয় - প্রতিটি গানই শ্রোতানন্দিত - আর বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে - প্রতিটি গানের পেছনেই একটি করে গল্প লুকিয়ে আছে - সে গল্পগুলো দুরের কারো নয় - আমাদের গল্প - আমাদের মত সহস্র সাধারণ মানুষের গল্প - কোনো বেকারের দুঃসহ দিনলিপি - কোনো পথকলির বঞ্চিত শৈশব - কোনো প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাস - পথভ্রান্ত কোনো নিশিকন্যার অব্যক্ত আর্তনাদ - ছাপোষা জীবনের নিত্য দিনকার ভাঙ্গা গড়া - এই ছিল তার গানের পটভূমি - এত সরল এত সাদাসিধে বিষয় নিয়ে গাইতেন বলেই বোধহয় অতিমানবীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মানুষটি - তাই - মানুষ তাকে ভালোবেসে পপ সম্রাটের আসনে বসিয়েছে - মৃত্যুর পরেও যে ভালবাসা এতটুকু ম্লান নয় - আজও মানুষ তাকে আগের মতই ভালবাসে - আর তাই হয়ত 'গুরু' বলে ডাকে - 'গুরু' তোমাকে সালাম.





গুরু তোমাকে সালাম ।
লিখাটা ভালো হয়েছে ।
উপরের নীতিমালার কারনে পোস্টটি প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে আপনার পাতায় রেখে দেয়া হলো।
মন্তব্য করুন