একদিন মুখোমুখি হব অতল অন্ধকারের
বেশ ছোট ছিলাম - বোঝার গন্ডি ছিল নিতান্তই সীমিত (এখনো যে খুব স্ফীত হয়েছে তা নয়) - এমনিতে চুপচাপই ছিলাম - কিন্তু মাথায় পোকা ঢুকলেই আশেপাশের মানুষকে উল্টোপাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম - কেউ বিব্রত হতেন - কেউ বিস্মিত - কেউ বিরক্ত আর কারো কারো চোখে যেন শঙ্কার ছায়াও দেখতাম - একজন বালক যে অন্যদের জন্য কত বিরক্তিকর হতে পারে আমি বোধহয় ছিলাম তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ - আমার অধিকাংশ প্রশ্ন ছিল ধর্মকেন্দ্রিক - ওই বয়সে ধর্ম নিয়ে গভীর কোনো উপলব্ধি বা কৌতুহল থাকার কথা না - আমারও ছিল না - কিন্তু ধর্ম নিয়ে আমার কিছু জিজ্ঞাস্য ঐসময়ে ছিল - এখনো আছে - আর আমৃত্যু থাকবে.
স্কুলে একদিন ইসলাম শিক্ষার ক্লাস চলছে - আমাদের স্যার পড়াতে পড়াতে একটু অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই মন্তব্য করলেন - 'সব মানুষের নিয়তি নির্ধারিত - মানুষ কখনো তার নিয়তিকে অতিক্রম করতে পারে না' - আমার বালকমনে কেমন যেন খটকা লাগলো - মাথায় যেন পাখা ঝাপটালো একটা বেয়াড়া পোকা - নিয়তি যদি নির্ধারিতই হবে তবে আমরা এত কষ্ট করছি কেন - এই যে আমরা ফার্স্ট হওয়ার জন্য এত পড়াশোনা করছি - কিসের জন্য - এটা তো পূর্বনির্ধারিত যে ওই স্থানটা কারো নিয়তিতে আগেই লিখা হয়ে গেছে . ক্লাসে চুপ করেই ছিলাম কারণ স্যারকে ভীষণ ভয় পেতাম কিন্তু বাসায় ফিরেই বাবার কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে বসলাম. বাবা বোধহয় একটু অবাকই হলেন - জিজ্ঞেস করলেন এই প্রশ্নের কারণটা কি ? আমি স্যারের কথা বললাম - বাবা হেসে বললেন - স্যারের কাছ থেকেই উত্তরটা জেনে নিও.
তারপর দু'বছর কেটে গেছে - স্যারকে জিজ্ঞেস করব সে সাহস আমি সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি - আমার জানা নেই যে বাবা ইতিমধ্যেই এই প্রসঙ্গে স্যারের সাথে কথা বলেছেন - প্রশ্নটা কিন্তু আমার মাথায় ডালপালা মেলে বহাল তবিয়তে জেগে আছে - একদিন স্যার নিজে থেকেই আমাকে ডেকে পাঠালেন - তাকে এত ভয় পেতাম যে আমার হাঁটু কাঁপা (আক্ষরিক অর্থেই) শুরু হলো - স্যার সেদিন আমাকে অনেকটা সময় দিয়েছেন - অনেক গল্প করেছেন - কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি - শুধু আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন - বেটা, তোর জন্য দোয়া করছি - এই প্রশ্নের উত্তর তুই একদিন নিশ্চয় পাবি.
তারপর কত বছর কেটে গেছে - আমার প্রশ্নের সংখ্যা আর পরিধি দিনদিন বেড়েই চলেছে - কিন্তু প্রকৃতি নিরুত্তর - কত মানুষের কাছে দৌড়েছি - ভেবেছি কেউ না কেউ নিশ্চয় সত্যিকারের জ্ঞান রাখে - আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চয় তার জানা আছে. কিন্তু উত্তরগুলো অধরাই থেকে গেছে. সবাই আমাকে আগুনের কথা বলেছে - দেখিয়েছে সর্প দংশনের ভয় - কেউ কেউ মুখে আঙ্গুল রেখে চুপ থাকতে বলেছে - পাপের শাস্তি পুণ্যের পুরস্কার - ধর্মীয় আচার আর সংস্কারের কথকতা - এসবই বলেছে আমায় - কিছু আমিও পড়েছি - কিন্তু জেনেছি শুধুই প্রচলিত তথ্যমালা - কিন্তু আমি জানি - এর বাইরেও কিছু আছে - আমার তুচ্ছ সাধ্যসীমার বাইরের কোনো জ্ঞান - কোনো উপলব্ধি - আমার জানতে ইচ্ছে করে মৃতদের কথা - জানতে চাই সৃষ্টিকর্তার বিচারদন্ডের স্বরূপ - আমি স্রষ্টার মহত্বে সন্দেহ করি না - বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকারে - জানি তিনি মহানুভব - কিন্তু জানতে চাই নিয়তি আসলে কি - জানতে চাই সময়ের শেষ কথা - জানতে চাই হৃদয় কোথায় থাকে - সে কি আত্মার অংশ - নাকি শুধুই কবিতার কাল্পনিক চরণ - ধর্ম কি এখানে নিরব - নাকি তার ভাষ্য আমরা বুঝিনা - নিষ্পাপ মানুষদেরকে আমি পৃথিবীর বুকে ভয়াবহ কষ্ট পেতে দেখেছি - পিশাচদেরকে দেখেছি বারংবার শাস্তিবিহীন জয়োল্লাসে মেতে উঠতে - এরা কখনো আমার কাছের কেউ - কখনো বা নেহাতই দূরের - কিন্তু আমার হৃদয় কেঁপে উঠেছে - আমি জায়নামাজে বসে আতঙ্কে অস্থির হয়েছি - সৃষ্টিকর্তার বিচার আমি বুঝি না - আর তাই ভয় পাই প্রতিমূহুর্ত - জানি এভাবেই সময় চলে যাবে - আমি ফুরিয়ে যাব - কোনো জিগীষাই পূর্ণ হবে না - একদিন মুখোমুখি হব অতল অন্ধকারের - যেখানে আমার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে অপার্থিব প্রাণঘাতী শাস্তিপর্ব.





আদি এবং অকৃতিম প্রশ্ন। তবে শেষ লাইনে মোটামুটি নিজেই উত্তর দিয়েছেন-
সমস্যা নাই অন্ধকারকে জয় করবে নাসির বাল্ব!
এত তাড়াতাড়ি হাল ছাইড়া দিলে ক্যাম্নে কি?!
দুনিয়া তো হাতের মুঠায়!
গুগল আন্টি সব জানে!
আরজ আলী মাতুব্বর পড়তে পারেন। হয়তো ভাবনার ডিরেকশন বদলাতে পারে, কিছু প্রশ্নের যৌক্তিক ব্যাখাও পেতে পারেন
মন্তব্য করুন