ভাই - কেমুন আছেন ?
ইন্টারকম বেজে ওঠে - রিসেপশন থেকে জানানো হচ্ছে - পার্শ্বেল এসেছে - নিচে নেমে দেখি - বিশাল এক ঝুড়িভর্তি আম - সূদুর রাজশাহী থেকে এসেছে - প্রেরকের নাম 'হাসান' - লিফট বেয়ে উপরে উঠছি - সহ-আরোহীদের নানাবিধ প্রশ্ন - রাজশাহীর আম ? কত কেজি ? ফজলি ? প্রাইস কত ? - প্রথম তিনটির উত্তর দিতে পারলাম - চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই - কখনো জানা থাকে না - গত কযেক বছর ধরে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে - আম আসে -লিচু আসে - প্রেরক দাম জানায় না - আমরাও মুল্য পরিশোধের সুযোগ পাইনা - বড় বিব্রত লাগে - নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয় - আবার কিছুটা প্রশান্তিও যেন পাই - ভালবাসা আসলেও যুক্তি মানে না.
হাসান'কে ফোন দিলাম - 'আবার আম পাঠিয়েছ - এবার অন্তত দামটা নাও' - ওপাশ থেকে অভিমানী প্রত্যুত্তর- 'কি বুলছেন ভাই - আপনাদের সাথে কি আমার টেকার সম্পর্ক - চাচা বাইচ্যে নাই বুলে কি আমাক পর কইরে দিলেন ? ' - এই প্রশ্নের উত্তর হয় না - রাজধানীর কংক্রিটের দালানে বসে এক মফস্স্বলী যুবকের সারল্যমাখা অভিমানের মূল্যায়ন আমার মত নাগরিক কীট কিভাবে করবে বলুন?
একটু পেছনে তাকাই - আমার পড়াশোনা তখনও শেষ হয়নি - থাকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাড়া আবাসিক এলাকায় - শুক্রবারের একটি সকাল - আধোঘুমের মাঝে শুনতে পাচ্ছি এক মুরগি বিক্রেতার ডাক - 'মুরগি লিবেন মুরগি' - কিশোর এক ছেলে - সাইকেলের ক্যারিয়ারে মুরগির ঝাঁকা বসিয়ে ফেরি করে বেড়ায় - আমার বাবার সাথে তার অদ্ভুত এক সখ্যতা - সম্পর্কটা ঠিক ক্রেতা-বিক্রেতার ছিল না - বাবা কে সে চাচা ডাকত - বাবাও বোধ করি তাকে খুব স্নেহ করতেন - বলতেন - এই ছেলেটা ভারী সরল - ওজনে কম দেয়ার কথা ভাবতেও পারে না - ছেলেটার বাড়ি ছিল কাঁটাখালি - প্রায় দিনই দেখতাম বাবা তাকে বসিয়ে নাস্তা করাচ্ছেন - ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করছেন - পেশাটা খুব কষ্টের এটা জেনে বাবা তাকে বলেছিলেন সে যেন অন্য কোনো ব্যবসা করে - ছেলেটা একদিন সত্যিই মুরগি বিক্রি বন্ধ করে দিল - তবু কোনো কোনো শুক্রবারে সে আসত - ঝাঁকায় মাত্র চার-পাঁচটা মুরগি - বাবা জিজ্ঞেস করতেন - কি রে - আবার ব্যবসা শুরু করলি নাকি? - হেসে উত্তর দিত - 'না চাচা - আপনার জন্য লিয়ে আইলাম'.
এরপর দিন কেটেছে অনেক - বাবা মারা গেলেন - আমরা ঢাকায় চলে এলাম - ব্যস্ততার মাঝে রাজশাহীর সাথে আর সম্পর্ক রাখা হয়ে ওঠে না - এক সকালে হাসানের ফোন - 'ভাই কেমুন আছেন ? আমি হাসান - ঢাকায় আসছি - আপনাদের ঠিকানা দেন' ; হাসান এলো - সাথে ঝুড়িভর্তি আম - এরপর থেকে প্রতিবছর আম আর লিচু এসেছে - কখনো সে নিজে নিয়ে এসেছে - কখনো কুরিয়ার করেছে - এর মাঝে তার ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে অলৌকিকভাবে - সে এখন পোল্ট্রি মেডিসিনের ডিস্ট্রিবিউটর - একাধিক কোম্পানির সাথে তার চুক্তি - প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকায় আসা যাওয়া - এরই মাঝে পেয়েছে সে সেরা ডিস্ট্রিবিউটরের পুরস্কার - কোম্পানি নিজের খরচে তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠাচ্ছে - মাটির কাঁচা ঘরের জায়গায় তিনতলা ফাউন্ডেশনের দালান তুলছে - মাসিক আয় ছাড়িয়ে গেছে লক্ষাধিক টাকা - তার আশা - আগামী বছরে সেটা পাঁচ লাখে এসে দাঁড়াবে - এ যেন কল্পকাহিনী - কিন্তু আসলে বাস্তব - এত যে আর্থিক উত্তরণ - মানুষটা কিন্তু রয়ে গেছে আগের মতই - কথার মারপ্যাঁচ শেখেনি - স্বার্থের জটিলতা বুঝেনি - আগের মতই তার ফোন আসে - আমি শুনতে পাই এক নির্ভেজাল শুভার্থীর কন্ঠস্বর - 'ভাই - কেমুন আছেন - চাচী কেমুন আছে ? রাজশাহী আইসবেন কবে ?' - আমার সুকঠিন নাগরিক কানে ওই শব্দগুলো স্বর্গীয় সুধাপাত বলেই মনে হয়.





এরকম কিছু মানুষ এখনো দেখা যায় বলেই হয়ত পৃথিবী এখনো ধ্বংস হয়ে যায়নাই।
তার অনাগত দিনগুলি এমনি হাসিখুসি থাকুক,
রইল অসংখ্য শুভকামনা।
আপনার লেখার ধরন খুব ভাল লাগে আমার। নিয়মিত লিখবেন।
ভাল থাকুন। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষন।
বারবার ফিরে আসুক এই ডাক!
বাহ
এই রকম ২/১ জন হাসান আমার জীবনেও আছে...
হাসানরা সুখে থাক, ভালো থাক
হা ভালো লাগলো হাসান এবং লেখা।

জয়ীদের কথা পড়তে ভাল লাগে
ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে।
মন্তব্য করুন