উনিশ শত ৫২
শীতকাল !
চারদিকে ঘোর কুয়াশার চাদর। কয়েকদিন ধরে র্সূয রশ্নিরও ক্ষমতা হচ্ছে না এই চাদর ভেদ করার। ঘন কুয়াশায় নিমজ্জিত জনপদ যেন নীরবতার অতল গহ্বর। মাঝে মাঝে জনপদের এই নীরবতা ভাঙ্গে ঠান্ডায় কেঁপে ওঠা কুকুরের আর্তনাদে।তারপর আবার সেই সুনশান অবস্থা ।
ষ্টেশনের পাশে ঝুপরির মত একটা তাল পাতার কুটিরে শুয়ে আছে মানস। গায়ে র্জীণ কম্বলের আচ্ছাদন।শীতের নির্মম কষাঘাত পারলে তার পাজর ভেঙ্গে দেয় ।
টুপ টুপ করে শিশির ঝরছে আর তা তার তাল পাতার নীড় বেয়ে নেমে আসছে এই পৃথিবীতে।মাঝে মাঝে দুই এক বিন্দু শিশির ছিদ্র আন্বেষণ করে ঝরে পড়ছে অন্তঃপুরিকায়। আর এই শিশির ভেজা কম্বলের অস্তিত্ব অনুমান করেই কেঁপে ওঠছে মানস ।
বয়স বাড়ছে দিনের।বের হয়ে যেতে হবে জীবন যুদ্ধে। কষ্টমাখা পৃথিবীর কৃত্রিম জীবন আর যুদ্ধ !
মানস ভিক্ষুক ! তবে অন্য সকলের মত সে কারো কাছে হাত পাতে না।সকালের এক কাপ চা হাতে লোকদের পত্রিকা পড়ে শোনায়,গল্প করে আর উপদেশ বাণী শোনায়।
সামনে একটা কার্টুন রাখা এক পা হারানো এই বৃদ্ধের।একটা লেভেলে লিখা "সাহায্য প্রত্যাশী" ।
স্টেশনের চত্বরে আজ আর কারো সাহায্য নেবে না মানস। আজ মুনা আসবে !তার সাথে আজ জীবনের গল্প বলার ওয়াদা দেয়া ।
মুনা স্টেশন মাষ্টারের মেয়ে।শহর থেকে এসেছে। আজ প্রথম কেউ জানতে চাইল মানসের জীবনী।
আজ মুনা আসবে তাই মানস গায়ে একটা নতুন র্কুতা ছড়িয়েছে। অপেক্ষার প্রথম প্রহরেই এসে গেছে মুনা। নীল জামা আর ধূসর উড়নায় যেন নীলিমা নামের কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে মানস।
●চাচা, কেমন আছেন ?
●ভাল মা !
●চলুন আমার বাসায় । মাকে বলে এসেছি আজ আপনাকে নিয়ে যাব ।
●চ...ল !
না করতে চেয়েও তিনি পারলেন না ।অগত্যা পিছু পিছু হাঁটছেন মুনার ।বুঝতে পারছেন না কেন এই মেয়েটার প্রতি তার এত আগ্রহ ? কেন নীলিমাকে দেখেন এর মাঝে ?
বিশাল একটা রুম।চারদিক থেকে চেয়ার পাতা।বিলাসিতা আর অভিজাত্যের ছাপ ঘরের মেঝেতে,দেয়ালে ।এক কোনের একটা চেয়ারে বসেই শুরু করল মানসের জীবনেতিহাস....
১৯৫২ সাল।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সকালের আরাম ঘুম, দুপুরে ক্লাস আর বিকেলে নীলিমার হাত ধরে বুড়িগঙ্গার পাড় ধরে হেঁটে বেড়ানো ।স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলা একজোড়া স্বপ্নচারী।
দিনগুলো হয়ত চলে যেত এভাবেই স্বপ্ন আর সুখের আড়ম্বরে।বাধ সাধল ভাষা ।উর্দু নাকি ভাষা হবে।নীলিমা আমায় বলেছিল,তুমি কী আমায় উর্দু ভাষায় চিঠি লিখবে? কথা দিয়ে ছিলাম ভাষা এনে দেব ! বাংলায় চিঠি লিখব।
উর্দু নয় বাংলা চাই স্লোগানে গড়ে তুলেছিলাম ভাষা সংগ্রাম পরিষদ।
২১শে ফেব্রুয়ারি ।মেডিকেল চত্বরে নীলিমার অপেক্ষায়। মেডিকেল ছাত্রী নীলিমা এসেছিল নীল শাড়ি পড়ে !নীলাভ মুখায়ব নিয়ে ।হাতে তুলে দিয়েছিলাম প্রের্কাড "উর্দু নয় বাংলা চাই"
ভালবাসার প্রশান্ত এই মুখটা সেদিন ফুটেছিল হাসির ঝিলিক।
চলছিল মিছিলটা।আচমকা কয়েকটা আর্তনাদ,গ্যাসের ধূসর আবরণ,চিত্কার আর হাহাকার।
এলোপাতারি কিছুক্ষণ গোলাগুলি। তারপর আবার ফাঁকা রাজপথ ।
পায়ে গুলি লেগেছিল আমার।আর নীলিমার মুখটা শেষ দেখেছিলাম ঐখানেই। দুজন টেনে হিচঁড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারির গাড়িতে।
নীলিমার নীল টিপটা যেন গুলি লেগে সরে গিয়েছিল ! বড্ড ইচ্ছে করছিল ঐ মায়া মুখটায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে, আদর করতে।
মনে নেই আমি কোথায় ছিলাম। চোখ মেলে দেখলাম একটা বস্তিতে। আর তারপর থেকে এই স্টেশনে।কারো কাছে বলতে না পারলেও নিজের কাছে র্গব লাগে। আমি ভাষা যোদ্ধা ।।
বিন্দু বিন্দু জল জমেছে মুনার চোখে ! ঝাপসা লাগছে চারপাশ।
লোকটা নেই, চলে যাচ্ছেন । কিছু বলার ক্ষমতা মুনার নেই !
তারপর থেকে আর পাওয়া যায় নি তাকে....স্টেশনের চত্বরে। তবু বারবার মনে দাগ কাটে লোকটার গল্পটা । ভিক্ষুক ভাষা সৈনিক ! উনিশ শত ৫২





লেখালেখি চলুক পুরোদমে।
অবশ্যই চলবে । পাশে থাকার ইচ্ছা পোষন করছি !
:bangladesh :
আমাদের বাংলাদেশ !
এবি'তে স্বাগতম। লেখা চলু্ক.....

চলবে !
ওয়েলকাম!
মন্তব্য করুন