এইডস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়ঃ পবিত্র ও নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন
২০০৯ সাল পর্যন্ত মোট এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ছিলো ৩ কোটি ৩২ লক্ষ। ২০০৯ সালে নতুন করে এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছে ২৫ লক্ষ। শুধু ২০০৯এ এইডস এর শিকার হয়ে মারা গেছে ২১ লক্ষ। প্রতিদিন নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছে ৬ হাজার ৮০০ জন। প্রতিদিন এইডস এ মারা যাচ্ছে ৫ হাজার ৭০০ জন। এইডস এর বিসত্মার আফ্রিকায় শীর্ষে বিশেষতঃ সাব-সাহারা অঞ্চলে। এ অঞ্চলের বোতসোয়ানায় ১৫-২৪ বছর বয়সী প্রতি ৩ জন, তরম্নণীর মধ্যে ১ জন ও প্রতি ৭ জন তরম্নণের ১ জন এবং লেসোথো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে এই বয়স গ্রম্নপের প্রতি ৪ জন তরম্নণীর মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ১০ জন তরম্নণের মধ্যে ১ জন এইডস ভাইরাসে আক্রামত্ম।
এশিয়া অঞ্চলে এইডস দ্রম্নত বিসত্মার লাভ করছে। এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখের ওপর লোক আক্রামত্ম। এ মহাদেশে থাইল্যান্ড এইডস মহামারীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে পুরানো। দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ ৫৫ হাজার এইডস রোগী রয়েছে। ভারত এখন বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক এইডস রোগীর বাস এবং দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখ লোক আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রথম HIV ধরা পড়ে ১৯৮৯ সালে। সরকারি তথ্যমতে, ডিসেম্বর ২০০৭ পর্যন্ত দেশে ১২০৭ জনের দেহে HIV ভাইরাস পাওয়া গেছে এবং ৩৬৫ জন এইডসরোগী সনাক্ত হয়েছে। মৃত্যুবরণ করেছে ১২৩ জন। ডিসেম্বর ২০০৬ থেকে ডিসেম্বর ২০০৭ পর্যন্ত ৩৩৩ জন্য নতুন করে HIV আক্রান্ত হয়েছে এবং ১২৫ জনের নতুন করে এইডস শনাক্ত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল একটি দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ এইডস এর ভয়াবহতা বিস্তৃত হয়েছে। এইডস বর্তমান বিশ্বে একটি সুপরিচিত শব্দ। এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ। এইডসের পূর্ণ রূপ Acquired Immune Deficiency Syndrome বা অর্জিত প্রতিরক্ষার ক্ষমতা হ্রাস উপর্সগমালা। এটিকে কেউ কেউ স্লিম ডিজিজ (Slim Disease) বা পাতলা হওয়া রোগ বলে। এটি মারাত্নক ভাইরাস দিয়ে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাসের নাম HIV বা Human Immunodeficiency Virus। এটি এক ধরনের রেট্রো ভাইরাস। এটি এমন একটি ভাইরাস যা রোগীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে। ফলে দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি খুব সহজেই সুযোগসন্ধানী সংক্রামক রোগ, স্নায়ুতন্ত্রের বিকলতা বা অস্বাভাবিক টিউমার বা ক্যান্সার রোগাক্রান্ত হতে পারে। HIV ভাইরাসটিকে প্রথম সনাক্ত করার পর ফরাসি বিজ্ঞানীরা এর নামে দেন LAB বা Lymphoadenopathy Associated Virus বা লসিকা সংশিস্নষ্ট ভাইরাস। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৬ সালে International Committee on Taxonomy এর নাম দেয় HIV.
১৯৫৯ সালে প্রথম ব্রিটেনের এক ব্যক্তির রক্তে এইডসের ভাইরাস পাওয়া যায়। ১৯৭০-এর দশকে আফ্রিকায় এটি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮১ সাল থেকে এইডসকে একটি মারাত্নক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলতঃ ১৯৭৭-৭৮ সালে আমেরিকা, হাইতি ও আফ্রিকায় এইডস রোগ পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮৫ সালে হলিউড বিখ্যাত অভিনেতা হাডসন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে বিশ্বব্যাপী আতংক ছড়িযে পড়ে। ১৯৮৫ সালে মানুষের রক্তে এইডসের ভাইরাস আছে কিনা তার পরীক্ষাপদ্ধতি আবিস্কার হয়। মূখ্যত দুইভাবে এইডস মানুষের শরীরে ছড়ায়। ১. অনিরাপদ যৌনসঙ্গমের সাহায্যে এবং ২.রক্তের আদান-প্রদানের সাহায্যে। এইডস রোগের ভাইরাস আছে এমন কারও সঙ্গে অনিরাপদ দৈহিক মিলনের ফলে এইডস হতে পারে। HIV ভাইরাস দেহ থেকে বের হয়ে আসা রসে(যোনীর রস, চোখের পানি, মুখের লালা) বেচেঁ থাকে। এছাড়াও HIV ভাইরাস রক্তের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে। যাদের রক্তে HIV ভাইরাস আছে তাদের শরীরের রক্ত অন্য কেউ গ্রহণ করলে সাধারণত এ রোগে আক্রামত্ম হতে পারে। উল্লিখিত দুটি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের মানুষের দেহে HIV ভাইরাস আক্রমণ করে। যেমন যৌনকর্মী, সমকামী, বহুগামী পুরুষ ও মহিলা, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকগ্রহণকারীর IDU, রক্ত ও রক্তজাত দ্রব্যগ্রাহক এবং ডায়ালাইসিস রোগী।
এইডস এর লক্ষণঃ একমাসের বেশি সময় ধরে একটানা শুষ্ক কাঁশি, সারাদেহে চুলকানিজনিত চর্মরোগ, মুখ ও গলায় ফেনাযুক্ত একধরণের ঘা, যা আঠালো, লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, স্মরণশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়া, ক্লান্তি ও ক্ষুধাহীনতা দেখা দেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলি হলোঃ শরীরের ওজন শতকরা ১০ ভাগেরও বেশি কমে যাওয়া, বিনা কারণে একমাসের বেশি সময় ধরে একটানা বা থেমে থেমে পাতলা পায়খানা হওয়া, এক মাসের বেশি সময় ধরে একটানা জ্বর বা জ্বরজ্বর ভাব থাকা। তবে, একমাত্র রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে এইচ আইভি নির্ণয় করা যায়।
এইডস ভাইরাস পরীক্ষাঃ বাংলাদেশে যেসব স্থানে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয় তা হলোঃ ভাইরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; আইইডিসি এন্ড আর, মহাখালী, ঢাকা। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, সিলেট ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং এ এফ আইপি ঢাকা সেনানিবাস, ঢাকা। এছাড়া দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইচআইভি পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এইডস প্রতিরোধের উপায়ঃ প্রধান উপায় হলো নিরাপদ যৌনসম্পর্ক বজায় রাখা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই যৌন সর্ম্পক সীমিত রাখা এবং যৌন সম্পর্কে কনডম ব্যবহার করা। এ ছাড়া বহুগামিতা ও সমকামিতা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা। আক্রান্ত ব্যক্তির গর্ভধারণ বা সন্তান না নেয়া এবং আক্রান্ত মা কর্তৃক শিশুকে বুকের দুধ না দেয়া। এইচআইভিমুক্ত রক্তপরিসঞ্চালন এবং জীবানুমুক্ত ইনজেকশন, সুঁচ-সিরিঞ্জ ও অপারেশন যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা। নেশাজাতীয় দ্রব্যবর্জন এবং পতিতালয়গমন পরিহার। এক্ষেত্রে বলা যায় ইসলামসম্মত পবিত্র ও নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপনই হচ্ছে এইডস প্রতিরোধের প্রত্যক্ষ উপায়।
পরোক্ষভাবে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এইডস এর ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী বিশেষতঃ উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী, জনবহুল শিল্পনগরী, সমুদ্রবন্দর, নৌ-বন্দর এলাকার জনগণ ও শ্রমিক, ভারী যানবাহনচালক ও পরিবহন শ্রমিক এবং বেকার যুবসমাজের মধ্যে নিবিড়ভাবে প্রচার চালাতে হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে। তাই সব ধর্মের অনুসারীদের স্ব-স্ব ধর্ম শ্রদ্ধাভরে অনুসরণ করলে সামাজিক সমস্যা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। বাংলাদেশে এইডস এখনো মহামারী আকারে না ছড়ালেও আমরা হুমকির মুখোমুখি। আফ্রিকার অনেক দেশের এইচআইভি পরিস্থিতি একসময় ছিল আজকের বাংলাদেশের মত। কিন্তু বিষয়টির প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ না দেয়ায় সেখানকার পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে হতে আজকের ভয়াবহপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই আফ্রিকার দেশগুলোর মতো ভয়াবহ বির্পযয় থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশকে অধিক সর্তক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা এখনই । বাংলাদেশ সরকার এইডস প্রতিরোধে জাতীয় এইডস কমিটি গঠন করেছে এবং এ কমিটি প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরএর মাধ্যমে এইডস/এসটিডি কার্যক্রমগ্রহণ করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এইডসনিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।
আফ্রিকায় যুদ্ধে যত লোক মারা যাচ্ছে, এইডস-এ মারা যাচ্ছে তার দশগুণ। গতবছর এইডস-এ আক্রান্ত হয়ে যে ২৮ লক্ষ লোক মারা যায়, তাদের শতকরা ৭৯ ভাগই আফ্রিকান। এবছরের শেষ নাগাদ ১৫ বছরের কম বয়সী ১ কোটি ৪ লক্ষ শিশু এইডস-এ তাদের মাকে বা বাবা-মা উভয়কে হারাবে। তাই আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে এইডস এর লাগামহীন বিস্তাররোধের সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করি এবং তিলে তিলে অর্জিত এ সভ্যতা রক্ষায় তৎপর হই।





মন্তব্য করুন