সুনীলের জন্য মন খারাপ
১. লীসা আমাদের বন্ধু, তখন আমরা স্বনন নামে একটা আবৃত্তি সংগঠন করি। রূপাদি আমাদের আবৃত্তি গুরু, কিন্তু রিয়ার্সাল করতাম শাহাজাহানপুরের লিসাদের বাসায়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, একদিন রিয়ার্সালে যাওয়ার আগে শাহবাগ থেকে কিনলাম সুনীলের তিন সমুদ্র সাতাশ নদী।
লীসা বইটি নিয়ে লিখলো
মাসুম ভাইয়াকে,
অনেক অনেক শুভেচ্ছা
-লীসা
তারপর বইটি নিয়ে তুষার লিখলো নিজের নাম। এরপর দুই বোন মিষ্টি ও টুম্পা লিখলো তাদের নাম। আমাদের সঙ্গে আবৃত্তি করতো অদিতী, অদিতীর মা, মানে খালাম্মা হয়তো আমাদের বিশ্বাস করতেন না, তাই সঙ্গে বুয়াকে দিয়ে দিতেন, তাই তুষার লিখলো অদিতীর বুয়ার নাম, নান্টু দা লিখে দিলেন রূপাদির জামাই চক্রেস ঘোষ ও সেই সময়ে হিট নায়িকা অঞ্জু ঘোষের নাম।
৮৮ সালের সেই বইটা এখনও আছে। এক নতুন ধরণের ট্রাভেলগ লিখতেন সুনীল। মূলত তার আমেরিকায় যাওয়া নিয়ে বইটি।
এরপরে সুনীলে আবার ডুব দেই ছবির দেশে কবিতার দেশে বইটি নিয়ে। আমার প্যারিস যাওয়ার স্বপ্ন দেখায় বইটি। বইটি পড়ে মনে হয়েছিল প্যারিস আমাকে একবার যেতেই হবে। অনেক বছর পড়ে যখন প্যারিস যাই সঙ্গী ছিল সুনীলের ছবির দেশে কবিতার দেশে।
সেই সুনীল নেই
২.
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই
চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখেনি
প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায়
এখন আমার ওষ্ঠে লাগে না কোনো প্রিয় স্বাদ
এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী
এমনকি সুরা এমনকি ভাষা
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
বিকেল বেলায় একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে
একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে পথে ঘুরে ঘুরে
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না কারুকে চাইনি
কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না
আমিও মানুষ আমার কী আছে অথবা কী ছিল
আমার কী আছে অথবা কী ছিল
ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে
যেমন আগুন আগুন আগুন আগুন আগুন
মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই
তবু দিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়
আশায় আশায় আশায় আশায়
৩.
সুনীলের প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল দেশ পত্রিকায়। অর্ধেক জীবন বইটিতে এর একটি সুন্দর বর্ণনা আছে। অপর্ণা নামে একটি মেয়েকে চিঠি দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চিঠি পাঠাবার পথ ছিল না। তাই চিঠির মতো কবিতা লিখে দেশ পত্রিকায় ডাকযোগে পাঠান তিনি। কারণ অপর্ণাদের বাসায় দেশ রাখা হতো। আর অপর্ণা কবিতা পড়তো। সেই কবিতা ছাপা হয়। অপর্ণা সেই কবিতা পড়ে তাকে বলেছিল ঠিক একই নামের এক কবির কবিতা ছাপা হয়েছে দেশে। অপর্ণা বুঝতেই পারেনি যে এই সেই সুনীল।
৪
ভালো মন্দ জেনে শুনে যদি এ-জীবন কাটাতুম
তবে সে-জীবন ছিল শালিকের, দোয়েলের
বনবিড়ালের কিংবা মহাত্মা গান্ধীর
ইরি ধানে, ধানের পোকার যে-জীবন
- যে জীবন মানুষের ?
- আমি কি মানুষ নাকি ? ছিলাম মানুষ বটে
তোমাকে দেখার আগে
- তুমি সোজাসুজি তাকাও চোখের দিকে
অনেকক্ষণ চেয়ে থাকো
পলক পড়ে না
কী দেখো অমন করে ?
- তোমার ভিতরে তুমি,
শাড়ি-সজ্জা খুলে ফেললে তুমি
তারা আড়ালে যে তুমি
- সে কি সত্যি আমি ? না তোমার নিজের কল্পনা ?
- শোন্ খুকী
- এই মাত্র দেবী বললে…
- একই কথা ! কল্পনা আধার যিনি, তিনি দেবী-
তুই সেই নীরা
৫.
প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ। দেশ তখন শারদীয় সংখ্যায় নতুনদের উপন্যাস লিখতে বলতো। সুনীল তখন কবি। সেই প্রথম উপন্যাস লেখা। এরপর কতো কতো উপন্যাস লেখা।
একা এবং কয়েকজন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এই নামেই আছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা উপন্যাস। একা এবং কয়েকজনের সূর্য কুমারের জন্য কার না মন কেমন করে?। এরপর সেই সময়ের সেই গঙ্গা ও নবীনকুমার, পুর্ব পশ্চিমের অতীন ও অলির জন্য এসব বই তিন বার করে পড়েছি।
কেবলই প্রেমের উপন্যাস জীবন যে রকমের শান্তা ও দীপুর সেই প্রেম কে ভুলবে এক জীবনে।
অরণ্যের দিন রাত্রি যেমন বই, তেমনই সিনেমা।
৬.
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূম
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত
এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম
এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম
এখনো নদীর বুকে
মোচার খোলায় ঘুরে
লুঠেরা, ফেরারী ।
শহরে বন্দরে এত অগ্নি-বৃষ্টি
বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর,
বাজারে ক্রুরতা, গ্রামে রণহিংসা
বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা
বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা
বুলেট ও বিস্পোরণ
শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ
রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল–
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো ।
কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে
নিথর দীঘির পারে বসে আছে বক
আমি কি ভুলেছি সব
স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক ?
আমি কি দেখিনি কোন মন্থর বিকেলে
শিমুল তুলার ওড়াওড়ি ?
মোষের ঘাড়ের মতো পরিশ্রমী মানুষের পাশে
শিউলি ফুলের মতো বালিকার হাসি
নিইনি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ
শুনিনি কি দুপুরে চিলের
তীক্ষ্ণ স্বর ?
বিষন্ন আলোয় এই বাংলাদেশ…
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাবো… ।
৭.
সত্যজিত রায় মারা যাওয়ায় মনে হয়েছিল আমার পরিবারের কেউ একজন নেই। তেমনটি মনে হয়েছিল হুমায়ুন ফরিদীর বেলায়ও। আজ আবার মনে হল। কারণ সুনীল নেই। আমার ব্যক্তিগত জীবন যাপনে একটি বড় অংশ জুড়ে আছে সুনীল।
সৌমিত্র চট্রোপাধ্যায়, আপনি আরও অনেক দিন বেঁচে থাকুন, দয়া করে।
৮.
সুনীল আদতে এপারের মানুষ ছিলেন। অর্ধেক জীবন বইতে অসাধারণ একটা লাইন আছে
''দেশ স্বাধীন হল, আমরা দেশ হারালাম''
৯
অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি
করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না। আমার
নিজস্ব একটা নদী আছে, সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে। কে না জানে
পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশি। পাহাড় স্থানু, নদী বহমান। তবু আমি নদীর
বদলে পাহাড়ই কিনতাম। কারণ আমি ঠকতে চাই।
নদীটাও অবশ্য আমি কিনেছিলাম একটা দ্বীপের বদলে। ছেলেবেলায় আমার বেশ
ছোট্টোখাট্টো ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিল। সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি। শৈশবে
দ্বীপটি ছিল বড় প্রিয়।
আমার যৌবনে দ্বীপটি আমার কাছে মাপে ছোট লাগলো। প্রবহমান
ছিপছিপে তন্বী নদীটি বেশ পছন্দ হল আমার। বন্ধুরা বললো, ঐটুকু একটা
দ্বীপের বিনিময়ে এতবড় একটা নদী পেয়েছিস? খুব তো জিতেছিস মাইরি।
তখন জয়ের আনন্দে আমি বিহ্বল হতাম। তখন সত্যিই আমি ভালবাসতাম
নদীটিকে।
নদী আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিত। যেমন, বলো তো, আজ সন্ধেবেলা বৃষ্টি
হবে কিনা?
সে বলতো, আজ এখানে দক্ষিণ গরম হাওয়া। শুধু একটা ছোট্ট দ্বীপে বৃষ্টি, সে কী প্রবল বৃদ্ধি, যেন একটা উৎসব।
আমি সেই দ্বীপে আর যেতে পারি না। সে জানতো। সবাই জানে।
শৈশবে আর ফেরা যায় না।
এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই। সে ই পাহাড়ের পায়ের কাছে
থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাবো, তারপর শুধু রুক্ষ কঠিন
পাহাড়। একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশম নিচে বিপুলা পৃথিবী,
চরাচরে তীব্র নির্জনতা। আমার কষ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না। আমি
ঈশ্বর মানি না, তিনি আমার মাথার কাছে ঝুঁকে দাঁড়াবেন না। আমি শুধু দশ
দিককে উদ্দেশ্য করে বলবো, প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি
একা---এখানে আমার কোনো অহঙ্কার নেই। এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা
চাইতে ভালো লাগে। হে দশ দিক, আমি কোনো দোষ করিনি। আমাকে ক্ষমা
করো।





সকাল থেকেই মন টা খারাপ । হুমায়ুন ফরিদি তারপর হুমায়ুন আহমেদ , আজ সুনীল - হারানোর মিছিল লম্বা হচ্ছে দিন দিন ।
মনে হচ্ছে পরিবারের কেউ চলে গেছে ।
মনে হচ্ছে পরিবারের একজন চলে গেলেন
আমরা বড় হচছি। তার মাশুলস্বরূপ এক এক জন মুরুববী হারাচছি। কিনতু নীচের জায়গাটা বডড ফাকা। তাদের শূণতা পূরন করতে পারেন, তেমন কেউ এখনো নেই। এপারেও নেই ওপারেও নেই
একদম সত্যি কথা। এইটাই বড় হতাশা
সব প্রিয়জনই একদিন চলে যাবে এটাই পৃথিবীর ধ্রুব সত্য।তারপরও প্রিয়জনদের এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে এত কষ্ট হয় কেন কে জানে?
মাসুম ভাই আপনি অনেক দরদ দিয়ে লিখেছেন।তাই হয়তো পড়তে পড়তে একটা সময় চোখটা ভিজে উঠল।কারণ জীবনের অনেকখানি জায়গাজুড়েই সুনীল আছে।সুনীলের অর্ধেক জীবন বইটা আমিও পড়েছি।''দেশ স্বাধীন হল, আমরা দেশ হারালাম'' এই লাইনটা আসলেই অন্যরকম।বুক খাঁ খাঁ করা একটা আর্তনাদ আছে ।
প্রিয় লেখকের তিরোধানে মন খারাপ।
সকালে খবরটা জেনে মনটা কেমন হু হু করে উঠলো। আমরা বড় হয়েছি যাদের বই পড়ে, নাটক দেখে,অভিনয় দেখে তারা একে একে চলে যাচ্ছেন। আমাদের চেনা পরিসর কেবলই শূণ্য হয়ে যাচ্ছে।
সকালে অফিসে খবরটা দেখেই চোখে পান এসে গেল। এখানে সৌমিত্রর নাম দেখে শিউরে উঠলাম!
আসলে খুব পছন্দের মানুষের তালিকা করলে যারা যারা আসবেন তাদের অনেকেই আর নেই। আছেন সৌমিত্র। তাই তাঁর কথাই মনে পড়লো।
আমাদের সময়ের মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন-আমার প্রিয় একজন লেখক।
চক্রেশ চক্রবর্তী ( ঘোষ না )
চক্রেস দাকে আমরা অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে মিলিয়ে চক্রেস ঘোষ বলতাম
ক্য়দিন আগেও তাকে লাইভ দেখলাম একটা চ্যানেলে, শোনার পর থেকেই একটা নাই নাই অনুভূতি। সেই কবে তাঁর ভালোবাসা, প্রেম নয় পড়ে স্তব্ধ হয়ে ছিলাম।
পূর্ব-পশ্চিম, সেই সময়, প্রথম আলো, নীরা, সন্তু, কাকাবাবুর সুনীল অন্ততঃ এই বাংলায় বেঁচে থাকবেন। ওপার বাংলার সাথে এপার বাংলার আরো একটি নাড়ি কাঁটা পড়লো।
এই লেখাটা খুব দরকার ছিল...ধন্যবাদ মাসুম ভাই।
~
শ্রদ্ধাঞ্জলি সুনীল!!

-------------
বাড়ীতে বসে বসে ছবির দেশে কবিতার দেশে পড়তেছিলাম! আর আপনার এই পুরান পোষ্টের কথা মনে পড়লো!
মন্তব্য করুন