বাজেট বক্তৃতা কে শোনে কে পড়ে আর কে বোঝে?
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা কে কে শোনেন। এ বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। তাই বলা যাবে না সঠিক উত্তরটি। তবে নিশ্চিত করেই অনুমান করা যায়, সংখ্যাটি খুবই কম। সরকারি দলের সাংসদদের বাধ্য হয়েই শুনতে হয়। অর্থনীতির সাংবাদিকদের শুনতে হয় রিপোর্ট করার জন্য। চেম্বার নেতারা শোনেন। আর শোনেন অর্থনীতিবিদেরা। এর বাইরে কারা টেলিভিশনের সামনে বসে বাজেট বক্তৃতা শোনেন, বলা মুশকিল।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শোনা আসলে কষ্টকর। অতি দীর্ঘ বক্তৃতা। সাধারণ মানুষের পক্ষে এত দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শোনা আসলেই সম্ভব না। এই দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা পড়াটা সম্ভবত আরও বেশি কষ্টকর। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে যে অনেক কষ্ট করে বক্তৃতাটি পড়তে হয়েছে, তা অনেকেই টেলিভিশনে দেখেছেন।
এবারের বাজেট বক্তৃতাটি ছিল ১৮৫ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে ১১৯ পৃষ্ঠাই বক্তৃতা, বাকি পৃষ্ঠায় আছে পরিশিষ্ট। এবারের (২০১৩-১৪) বাজেট বক্তৃতায় অনুচ্ছেদ ছিল ২৫৩টি। তবে অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতার রেকর্ড অবশ্য ২০১১-১২ অর্থবছরে। ওই বাজেট বক্তৃতাই ছিল ১৪৮ পৃষ্ঠার, আর তাতে অনুচ্ছেদ ছিল ৩৫৬টি।
কী থাকে এত দীর্ঘ বক্তৃতায়। সবচেয়ে বেশি থাকে সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি। শুরুতে কয়েক পৃষ্ঠায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কিছু বিবরণ বাদ দিলে পুরাটাই হচ্ছে সরকার কী কী করেছে। যেমন এবারের বাজেট বক্তৃতার ২৮ পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে ৮৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আছে সরকারের নানা কাজের দীর্ঘ বিবরণ। বুদ্ধিমান পাঠক যদি এই পৃষ্ঠাগুলো না পড়েন, তাতে খুব একটা সমস্যা হবে না। সারা বছর সরকারের মন্ত্রীরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেসব উন্নয়নের বিবরণ দিতে থাকেন, বাজেটে সেগুলোই পাওয়া যায়।
অথচ বাজেট বক্তৃতা আগে এ রকম ছিল না। কয়েক বছর আগেও বাজেট বক্তৃতা ছিল সংক্ষিপ্ত। দুই পর্বে বিভক্ত থাকত বাজেট। প্রথম পর্বে থাকত বাজেটকাঠামো, দ্বিতীয় পর্বে রাজস্ব কার্যক্রমের অংশ। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর পর্যন্ত মোটামুটি এই ধারাই অনুসরণ করা হয়েছিল। যদিও বলা যায়, এরশাদ পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর প্রথম দফায় সাইফুর রহমান এবং পরবর্তী সময়ে শাহ এ এম এস কিবরিয়ার বাজেট বক্তৃতা ছিল অত্যন্ত সুলিখিত। ভাষা ছিল প্রাঞ্জল, নামীদামি মনীষীদের কথা থাকত।
পরিস্থিতি পালটে যায় দ্বিতীয় দফায় বিএনপি সরকার আসার পর। সাইফুর রহমানের বাজেট বক্তৃতায় সে সময় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের রিপোর্টের বিভিন্ন লাইন ঢুকে পড়ে। দাতাদের সার্টিফিকেট প্রাধান্য পেতে থাকে। তার পরও বক্তৃতার আকার কিন্তু দীর্ঘ হয়নি।
বাজেট বক্তৃতার করুণ দশা মূলত বর্তমান অর্থমন্ত্রীর সময় থেকেই। তার পরও প্রথম বাজেট বক্তৃতার আকার অনেকটাই কম ছিল। কিন্তু পরের বাজেটগুলো ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হয়েছে। ফলে বাজেটে এখন অনেক কথা লেখা থাকে। ফলে কোনটা যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা কম গুরুত্বপূর্ণ তা আলাদা করার কোনো উপায় থাকে না। যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেটি দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় হারিয়ে যায়।
আগে বাজেট বক্তৃতায় অর্থনীতির চমৎকার বিশ্লেষণ থাকত। অর্থনীতির দুর্বলতা আর এর কারণগুলোর বর্ণনা দেওয়া হতো। রাজস্ব কার্যক্রম অংশে অনেক বেশি স্বচ্ছতা থাকত। রাজস্ব প্রস্তাবগুলোর কারণে আয়-ব্যয়ে এর কী প্রভাব পড়বে তার একটি হিসাবও দেওয়া হতো। এখন এসবের কিছুই আর পাওয়া যায় না।
১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় শাহ এ এম এস কিবরিয়া বলেছিলেন, ‘জাতীয় বাজেট সরকারের আয়-ব্যয়ের শীতল পরিসংখ্যানের একটি নিছক সংকলন নয়, এই বাজেট স্পন্দিত হয় সমগ্র জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা।’ আজকালকার বাজেট বক্তৃতা আয়-ব্যয়ের শীতল পরিসংখ্যানেই পরিণত হয়ে গেছে।
বেশি দূরে যেতে হবে না। গুগলে খুঁজলেই ভারতের নতুন বাজেট বক্তৃতাটি পাওয়া যাবে। পি চিদাম্বরমের বাজেট বক্তৃতা পড়লে একজন সাধারণ মানুষও বুঝবেন, তাদের জন্য নতুন বাজেটে কী আছে। যেসব প্রস্তাব একজন মানুষের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলবে, সেগুলোর বিস্তারিত ও সহজবোধ্য বর্ণনা আছে। সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তিও আছে, তবে তা অতি সংক্ষিপ্ত।
মজার ব্যাপার হলো, বাজেটের আকার বা বাজেট কত বিশাল সেই অংশটুকুও আছে অতি সংক্ষিপ্ত আকারে, শেষের দিকে। কারণ কত হাজার কোটি টাকার বাজেট তা একজন সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন কিছু যায়-আসে না। বরং সুনির্দিষ্ট বাজেট প্রস্তাবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসবই আছে বাজেটজুড়ে।
এ ছাড়া পি চিদাম্বরম ভারতের নারী, তরুণ জনগোষ্ঠী ও দরিদ্র্য মানুষের জন্য কী করা হচ্ছে, তারও একটি পরিষ্কার বর্ণনা দিয়েছেন। ফলে সরকারের মূল লক্ষ্যগুলো অনেক বেশি পরিষ্কার এই বাজেট বক্তৃতায়।
বাংলাদেশে বাজেট পরিসংখ্যান আগের তুলনায় অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে। অথচ বাজেট বক্তৃতা দিনে দিনে জটিল হচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষের সুনির্দিষ্ট করে কী আছে, সেটা বোঝার কোনো উপায় বাজেটে রাখা হয় না। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারেন বাজেট প্রণেতারা। আসলে সবচেয়ে সংস্কার প্রয়োজন বাজেট বক্তৃতায়।
(প্রথম আলোয় আজ ছাপা হয়েছে। ব্লগেও দিলাম যদি কেউ আলোচনা করতে চান)





দারুন বলছেন মাসুম ভাই। ।
বাজেটে বক্তৃতার ধরনে আসলেই পরিবর্তন দরকার। কিছু পরিসংখ্যান বর্ণনা করা ছাড়া আসলেই কেউ কিছু বুঝে না! কারো কাজেও আসে না।
আলোতেই পড়ছি এখানে দিয়ে ভালো করছেন।
আমিও মনে করি পরিবর্তন আনা দরকার, কিন্তু কে করবে?
পরে পড়ুম। শিরনাম পইরাই নিজের মনের কথার সন্ধান পাইছি।
বাজের বক্তৃতা যাদের বাধ্য হয়ে শুনতে হয় তাদের জন্য করুণা।
মাঝে মাঝে মনে হয় এই বক্তৃতাটা সম্পূর্ন অপ্রয়োজনীয়। বাজেট বক্তৃতা নিরক্ষর মানুষ শুনে বলে আমার জানা নাই। যদি শুনে থাকে নিরক্ষরদের জন্য সংক্ষিপ্ত এবং সহজ ভাষায় তিন পাতার একটা বক্তৃতা বানানো যেতে পারে। আর শিক্ষিত মানুষদের জন্য লিখিত ভার্সন পত্রিকা আর ওয়েবসাইটে দিয়ে দিলে খালাস। ঘন্টা ধরে বেহুদা বগরবগর করার কোন মানে নেই।
আশার কথা, শুনলাম আমার এই লেখাটা পড়ে অর্থ মন্ত্রনালয়ের কেউ কেউ চিদাম্বরমের বাজেট বক্তৃতা পড়েছেন।
আসলেই...
হ
পোষ্টের সাথে সম্পুর্ন সহমত।
ধন্যবাদ
বেশি বয়স হলে মানুষ অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলে, তাই বাজেট বক্তৃতার আকৃতি বাড়ছে...
ওনার বদ্ধ-ধারণা, বঙ্গদেশে উনি ছাড়া আর কেউ অর্থনীতি্র কিছুই বুঝে না, যেটা ওনার জন্য না হলেও দেশের জন্য মহাবিপদজনক...
~
বক্তৃতাটা আরও একটু ভাল করা যেত
রাষটপতির বকতিমার ওপর যে সংসদে কয়েক দিনের ধন্যবাদ পোসতাব চলে সেটার ওপর যদি একটু লাইট ফালান ভাইজান
( 
সময় করে চেষ্টা চলবে বাজি
বাজেট জিনিসটাই দিনে দিনে একটা কমেডি সার্কাস হয়ে যাইতাছে।
মন্তব্য করুন