ফৌজি বাণিজ্য: প্রথম পর্ব
অনেকেই হয়তো শুনেছেন। তারপরেও বিবিসির বিশেষ এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন এখানে দেওয়ার উদ্দেশ্য দুটি। একটি হচ্ছে, যারা বিবিসি শোনেন না তাদের বিষয়টি জানানো। আরেকটি হচ্ছে নিজের কাছে রেকর্ড রাখা।
রিপোর্টগুলো তৈরি করেছেন বিবিসির কামাল আহমেদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও সবার জানার প্রয়োজন থেকেই আমার এই পোস্ট। মোট তিনটি পর্বে ৯টি রিপোর্ট এখানে দেওয়ার ইচ্ছা। আজ থাকলো প্রথম তিনটি পর্ব।
ফৌজি বাণিজ্য:উত্তরাধিকার
ঢাকার বাইরে মফস্বলের কোন শহরে আপনি যদি আইসক্রিম খেতে চান তাহলে হতে পারে যে আইসক্রিমটি আপনি খাচ্ছেন তা সেনাবাহিনীসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তৈরী।
একইভাবে ধরুন রাজধানী ঢাকা কিম্বা দেশের অন্যান্য জায়গায় যেসব দালানকোঠা তৈরী হচ্ছে সেগুলোতে যেসব সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে তার প্রতি একশোটি বস্তার মধ্যে অন্তত পাঁচটি হচ্ছে এমন প্রতিষ্ঠানের তৈরী যার সাথে সশ্স্ত্রবাহিনী জড়িত।
সামরিকবাহিনী ইতোমধ্যেই যেসব নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং প্রকল্পে জড়িত হয়ে পড়েছে তার সম্পদমূল্য অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসাবেও তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অনেকেই বলেছেন - মনে হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক গোষ্ঠী – ইংরেজীতে যাকে বলে Conglomerate - তা হচ্ছে সেনা শিল্প গোষ্ঠী।
ফাস্টফুড থেকে সিমেন্ট তৈরী , সাধারণ হোটেল থেকে বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেল , ব্যাংক , সিএনজি – পেট্রল , বৈদ্যূতিক বাতি , পাখা, জুতা এসবকিছুর ব্যবসাতেই এখন সেনাবাহিনীর নাম যুক্ত রয়েছে। আর, সেনাবাহিনীর প্রস্তাবিত প্রকল্পের তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ। যেমন তাঁদের আকাঙ্খা রয়েছে নিজস্ব একটি বীমা কোম্পানীর, পরিকল্পনায় আছে ওষুধ তৈরীর কারখানা, বিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্র, প্যাকেজিং, চট্টগ্রামে আরেকটি পাঁচতারা হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি।
সেনাবাহিনীর নাম সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যেক প্রকল্পগুলোর সাথে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা ঠিক কতোটা এবং তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য সেনাসদরের সাথে যোগাযোগের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করেও সেনাবাহিনীর কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে, অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে সেনাবাহিনী সম্পর্কিত বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে সেনা কল্যাণ সংস্থা। সংস্থাটির নিজস্ব প্রকাশনায় বলা হচ্ছে :
‘‘অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে নানারকম সেবামূলক সহায়তা দেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ইউনিট বা প্রকল্পের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান৻ পাকিস্তান আমলে এধরণের একটি প্রতিষ্ঠান ছিলো যার নাম ছিলো ফৌজি ফাউন্ডেশন এবং স্বাধীনতার পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সহায়-সম্পদ নিয়ে বাহাত্তর সালে যাত্রা শুরু করে সেনা কল্যাণ সংস্থা ‘‘
‘ মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড : ইনসাইড পাকিস্তান‘স মিলিটারি ইকোনমি‘ গ্রন্থের জন্য সুখ্যাতি পেয়েছেন পাকিস্তানের গবেষক ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা। তাঁর বর্নণায় উপমহাদেশে সেনাবাহিনীর বাণিজ্যে জড়িত হবার ইতিহাসের সূচনা পঞ্চাশের দশকে। যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের জন্য গঠিত যে তহবিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছিলো তাতে পাকিস্তানের অংশটি পাকিস্তান সরকারের কাছে হস্তান্তর করার পর পাকিস্তান সরকার এবং সেনাবাহিনী ভারত সরকারের মতো যুদ্ধফেরৎ সৈনিকদের মধ্যে তা বিতরণ না করে তা দিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠা করে।
সেনা কল্যাণ সংস্থার সচল প্রতিষ্ঠানগুলো
মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরী , ডায়মন্ড ফুড ইন্ডাষ্ট্রিজ , ফৌজি ফ্লাওয়ার মিলস , চিটাগাং ফ্লাওয়ার মিলস , সেনা কল্যাণ ইলেক্ট্রিক ইন্ডাষ্ট্রিজ , এনসেল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড , স্যাভয় আইসক্রিম , চকোলেট এন্ড ক্যান্ডি ফ্যাক্টরী , ইষ্টার্ণ হোসিয়ারী মিলস , এস কে ফেব্রিক্স, স্যাভয় ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী , সেনা গার্মেন্টস , ফ্যাক্টো ইয়ামাগেন ইলেক্ট্রনিক্স , সৈনিক ল্যাম্পস ডিষ্ট্রিবিউশন সেন্টার , আমিন মহিউদ্দিন ফাউন্ডেশন , এস কে এস কমার্শিয়াল স্পেস , সেনা কল্যাণ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স , অনন্যা শপিং কমপ্লেক্স , সেনা ট্রাভেলস লিমিটেড , এস কে এস ট্রেডিং হাউস , এস কে এস ভবন – খূলনা , নিউ হোটেল টাইগার গার্ডেন , রিয়েল এস্টেট ডিভিশন – চট্টগ্রাম এবং এস কে টেক্সটাইল।
ড: আয়েশা সিদ্দিকার মতে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা হলো সেই পঞ্চাশের দশকেই প্রথমত, পাকিস্তানের সামরিকবাহিনীর একটা আলাদা এবং জোরালো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিলো ; আর দ্বিতীয়ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একটা ভিন্নধরণের বাহিনী হতে চেয়েছিলো যারা শুধুমাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করার কাজেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে রাজী ছিলো না বরং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও একটা ভূমিকার কথা ভাবছিলো।পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে, ১৯৫৩-৫৪ তে এভাবেই ফৌজি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়।
ফৌজি ফাউন্ডেশন থেকে সেনাকল্যাণ সংস্থা :
তবে, পাকিম্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে যে বৈষম্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পৃথক দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ সেই বৈষম্য থেকে সেনাবাহিনীও বাদ যায় নি। ফলে, ফৌজি ফাউন্ডেশনের বেশীরভাগ সম্পদই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার হিসাবে যা পাওয়া যায় তার পরিমাণ ছিলো সামান্য।
যতোদূর জানা যায় - ১৯৭২ এ যখন বাংলাদেশ সেনাকল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার মূলধন ছিলো আড়াই কোটি টাকার মতো। তবে, মাত্র চারবছরের মধ্যেই ঐ সংস্থার নীট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় প্রায় একশো কোটি টাকা।
সেনাকল্যাণ সংস্থার প্রকাশিত প্রচারপত্রে দেখা যায় যে গত আটত্রিশ বছরে ধারাবাহিকভাবে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। সংস্থাটির অধীনে এখন রিয়েল এষ্টেট এবং শিল্পের সেবামুখী চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও রয়েছে।
এর বাইরে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্য্যত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে ইতোমধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে – যেমন ফৌজি চটকল এবং ফৌজি রাইস মিলস।
তবে, সেনাকল্যাণ সংস্থার বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের আকার বা আয়তনের তুলনায় বহুগুণ বেশী বাণিজ্য করছে সেনাবাহিনীর আরেকটি কল্যাণমূলক সংস্থা – আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের ষোলটি প্রতিষ্ঠান
আর্মি শপিং কমপ্লেক্স , রেডিসন ওয়াটার গার্ডেন হোটেল , ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটিড , সেনা প্যাকেজিং লিমিটেড , সেনা হোটেল ডেভলেপমেন্ট লিমিটেড , ট্রাষ্ট ফিলিং এন্ড সিএনজি ষ্টেশন , সেনা ফিলিং ষ্টেশন- চট্টগ্রাম , ভাটিয়ারী গলফ এন্ড কান্ট্রি ক্লাব , কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব , সাভার গলফ ক্লাব , ওয়াটার গার্ডেন হোটেল লিমিটেড - চট্টগ্রাম , ট্রাষ্ট অডিটোরিয়াম এবং ক্যাপ্টেনস ওর্য়াল্ড।
১৯৯৮ সালে এই ট্রাষ্ট কোম্পানী আইনে রেজিষ্ট্রি করা হয়। এই ট্রাষ্টের বিনিয়োগও যেমন বিপুল , তেমনি তার বাণিজ্যিক আকাঙ্খাও বলা চলে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
সরাসরি বাণিজ্যে সশস্ত্রবাহিনী :
আর, তৃতীয়ত সশস্ত্রবাহিনী সরাসরি যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যে এমন দৃষ্টান্ত অন্তত দুটো বাহিনীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। এই দুটি বাহিনী হলো সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনী।
সরকারী নথিপত্রে দেখা যায় উভয়ক্ষেত্রেই এই দুই বাহিনীর আগ্রহের কারণে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতের কয়েকটি লোকসানী প্রতিষ্ঠানকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এরমধ্যে সেনাবাহিনী বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী লিমিটেডের স্থাপনার মধ্যেই প্রতিষ্ঠা রেছে আরো তিনটি নতুন বাণিজ্যিক ইউনিট। এর একটি হলো বিএমটিএফ সিএনজি কনভার্সন লিমিটেড এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিএমটিএফ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আর তৃতীয়টি হলো হংকংয়ে রেজিষ্ট্রিকৃত প্রতিষ্ঠান ট্রেড মিউচূয়াল হংকংয়ের সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ফুটওয়্যার এন্ড লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড।
আর নৌবাহিনীর পরিচালনায় রয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এবং ডকইয়ার্ড অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড।
কল্যাণ ট্রাষ্টের বাইরে প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর এভাবে সরাসরি বাণিজ্যে যুক্ত হবার ইতিহাস হচ্ছে খুবই সাম্প্রতিক – মাত্র বছর দশেকের।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু :
সেনা কল্যাণ সংস্থার বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের প্রসার অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও আটানব্বুই সালের জুন মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান মরহুম লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের সময় প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট।
অবশ্য বাংলাদেশ আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘ স্মারকে যেসব লক্ষ্য বর্ণিত আছে তার প্রথমটিতে বলা হয়েছে :
‘‘সাবেক সেনাসদস্য এবং তাদের সন্তান ও পোষ্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও তার বিকাশের ব্যবস্থা করা‘‘
আর দ্বিতীয় লক্ষ্যটিতে বলা হয়েছে সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত ও শহীদ পরিবারের কল্যাণের কথা।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের এই সংঘ স্মারক থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যিক বাসনা নিয়েই এই ট্রাষ্ট প্রতিণ্ঠিত হয়েছে।
পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজির যে মৌলিক চরিত্র – সেনাবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ট্রাষ্ট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যাতিক্রম ঘটেনি। ছোট ব্যবসা যেমন মাঝারী ব্যাবসায় উন্নীত হতে চায় – মাঝারী ব্যবসা যেমন বড় ব্যবসায় রুপান্তরিত হতে চায় – তেমনই উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যক বাসনা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে দেখা গেছে।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সংঘস্মারকে আনুষঙ্গিকভাবে যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো :
ঢাকায় আবাসিক হোটেল এবং বিপণী কেন্দ্র , বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানী, জঙ্গল বুট ফ্যাক্টরী, চট্টগ্রামে একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, কাদিরাবাদে একটি চিনি কল, যশোরে ফ্লাওয়ার মিলস, ফাউন্ড্রি এবং পেট্রল পাম্প, গলফ ক্লাব, বিভিন্নজায়গায় বিপণী কেন্দ্র, কার সার্ভিসিং এবং ওয়াশিং সেন্টার, রেন্ট এ কার সার্ভিস, প্যাকিং এন্ড কুরিয়ার সার্ভিস, নারায়ণগঞ্জে ফ্যাব্রিক ডায়িং এন্ড স্ক্রিনপ্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জে হোশিয়ারী মিলস, সব সেনানিবাসে ব্রাস এন্ড মেটাল ইন্ডাষ্ট্রি, কুমিল্লায় বিদ্যূৎ প্রকল্প, রংপুরে ওষুধ শিল্প এবং ক্লিংকার প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প, বগুড়ায় সিমেন্ট প্রকল্প, সিলেটে রেস্তোরা এবং পর্যটন ও ট্রাভেল এজেন্সি, ঢাকায় হাসপাতাল , সব সেনানিবাসে মৎস্যচাষপ্রকল্প এবং পোল্ট্রি খামার।
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে - সশস্ত্রবাহিনীর নানাধরণের বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণের পিছনে পাকিস্তান যে শুধু একটি মডেল হিসাবে বিবেচিত হয়েছে তাই নয় – বরং অন্তত একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। ফৌজি বাণিজ্যের দ্বিতীয় পর্বে থাকবে সেপ্রসঙ্গ।
পাকিস্তানী মডেল ও উৎসাহ
বাংলাদেশে সামরিকবাহিনীর বাণিজ্যে জড়িত হওয়ার বিষয়টি যে শুধুমাত্র পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাই নয় - বরং সামগ্রিকভাবে এবিষয়ে পাকিস্তানের দৃষ্টান্তকে মডেল হিসাবে অনুসরণের লক্ষণ সর্বত্রই সুস্পষ্ট।
উত্তরাধিকার হিসাবে সেনা কল্যাণ সংস্থাকে পাবার পরও পাকিস্তানের অনুকরণে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় শুধুমাত্র তাদের জন্য আলাদা একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠার - যার আয় বা সম্পদ থেকে সাহায্য বা সুবিধা সশস্ত্রবাহিনীর অন্য কোন শাখার সদস্যরা পাবেন না - বরং তা শুধু সামরিকবাহিনীর সদস্যদের কল্যাণের লক্ষ্যেই কাজ করবে।
সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ফৌজি ফাউন্ডেশন প্রায় দুই দশক সচল থাকার পরও পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
ফৌজি ফাউন্ডেশন থাকার পর আবার কোন যুক্তিতে এবং কীভাবে পাকিস্তানে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট গঠিত হলো? এপ্রশ্নের জবাবে ‘ মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড : ইনসাইড পাকিস্তান‘স মিলিটারি ইকোনমি‘ গ্রন্থের রচয়িতা ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলেন যে আসলে আরো চারটি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট, নৌবাহিনী বেহরিয়া ফাউন্ডেশন, বিমানবাহিনী শাহিন ফাউন্ডেশন এবং এখন হয়েছে পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরী ফাউন্ডেশন।
ডঃ সিদ্দিকার মতে এর কারণ অংশত আন্ত-বাহিনী প্রতিযোগিতা। যদিও তিনবাহিনীর জন্য প্রতিষ্ঠিত ফৌজি ফাউন্ডেশনের সুবিধা সবচেয়ে বেশী ভোগ করছিলো সেনাবাহিনী, তবুও সেই সেনাবাহিনীই প্রথমে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট চালু করে।
তখন তাদের যুক্তি ছিলো যে সেনাবাহিনী যেহেতু সবচেয়ে বড় বাহিনী এবং সর্বাধিক সংখ্যক সেনাসদস্য প্রতিবছর অবসরে যায় তাই ফৌজি ফাউন্ডেশনের আয় তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।
এরপর ১৯৭৮ সালে বিমানবাহিনী প্রতিষ্ঠা করে শাহিন ফাউন্ডেশন এবং নৌবাহিনী চালু করে বেহরিয়া ফাউন্ডেশন ১৯৮১ তে।
পাকিস্তানের মতো একই যুক্তি
বাংলাদেশেও একই যুক্তি দেখিয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠার।
১৯৯৮ সালের জুন মাসে এই ট্রাষ্ট যাত্রা শুরু করলেও মাত্র দুই দশকের মধ্যে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের সম্পদের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সেনা কল্যাণ সংস্থার ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি ততোটা দর্শনীয় না হলেও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিন্তু একেবারেই বিপরীত। বলা চলে, ট্রাষ্টের বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলো অনেক বেশী লাভজনক বলেই আপাতদৃশ্যে মনে হয়।
আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের নিয়ন্ত্রণ তার ট্রাষ্টি বোর্ডের হলেও তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ মূলত সেনাসদরে কেন্দ্রীভূত। সেনাপ্রধান হলেন ট্রাষ্টের প্যাট্রন বা পৃষ্ঠপোষক , আর চেয়ারম্যান হলেন এডজুটেন্ট জেনারেল এবং সচিব ছাড়া বাকী ছজন সদস্যই সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার অধিকারী সামরিক কর্মকর্তা।
ট্রাষ্টের কার্যক্রম সম্পর্কে জানার জন্য সেনাসদরের সাথে যোগাযোগের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করেও সেনাবাহিনীর কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এই ট্রাষ্ট যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেনাবাহিনীতে ছিলেন এবং বর্তমানে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা করছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম মুনীরুজ্জামান। জেনারেল মুনীরুজ্জামান সেনাবাহিনীর এধরণের বাণিজ্যে জড়িত হওয়া সমর্থন না করলেও এর প্রতিষ্ঠাকালের ঘোষিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে এগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং তা বাণিজ্যিকভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। এগুলো থেকে যেসব লাভ আসবে তা সৈনিকদের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে।
এধরণের ট্রাষ্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চাকাঙ্খী বাণিজ্যিক প্রকল্পে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে যে বাংলাদেশের সামরিকবাহিনী পাকিস্তানের মডেল অনুসরণ করেছে শুধু তাই নয়, অন্তত একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে সরাসরি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ছাপ সুস্পষ্ট।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঋণে সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রকল্প:
সম্প্রতি আমি গিয়েছিলাম খুলনার কাছে মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে। এই মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর প্রথম ইউনিটটি চালু হয় ১৯৯৪ সালে। তখন ঐ ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো ঘন্টায় পঁয়ষট্টি টন।
২০০২ সালে মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে সংযোজিত হয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি ইউনিট – যেটির উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় ৩৫ টন। অর্থাৎ এখন তার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ঘন্টায় একশো টন।
সেনাকল্যাণ সংস্থার এই সিমেন্ট এলিফেন্ট ব্রান্ড নামে বাজারে প্রচলিত। তবে, এই প্রতিষ্ঠানও ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে লোকসানের মুখে পড়েছিলো। অবশ্য, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে মংলা সিমেন্ট তার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশী মুনাফা করেছে। ২০০৮ এ যেখানে তাদের লক্ষ্য ছিলো বারো কোটি টাকা – সেখানে মুনাফা পৌঁছেছে ২৪ কোটি টাকায়।
এক হিসাবে দেখা যায় –সেনাকল্যাণ সংস্থার সবকটি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মোট মুনাফা যা তার প্রায় অর্ধেকটই আসে এই একটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী থেকে।
এই সিমেন্ট কারখানার ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায় যে ১৯৮৮ সালের তেরোই অক্টোবর পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয় যে চুক্তির মূল বিষয় ছিলো পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ।
সুদের হার ছিলো শতকরা মাত্র দুই শতাংশ। পাকিস্তানে তখন জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলের অবসান ঘটেছে মাত্র মাস দু / তিনেক আগে। রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল জিয়া নিহত হবার পর তৎকালীন সিনেটের চেয়ারম্যান ইসহাক খানের তত্ত্বাবধানে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি যখন চলছিলো তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল আসলাম বেগ। সেসময়েই পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের জন্য এই ঋণ মঞ্জুর করে।
এই ঋণেরই কিছুটা অংশ দিয়ে অর্থায়ন করা হয় বাংলাদেশে সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রকল্প মংলা সিমেন্ট কারখানার।
এক্ষেত্রে সরকারী একটি নথিতে দেখা যায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির সাথে অসঙ্গতি থাকলেও এই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি সংগ্রহে সেনা কল্যাণ সংস্থার তেমন একটা সমস্যা হয় নি।
১৯৯০ এর ৬ই জুনের একটি চিঠিতে সেনাকল্যাণ সংস্থার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে আসা একটি চিঠিতে লেখা হয়েছিলো :
‘‘সেনাকল্যাণ সংস্থা এবং পাকিস্তানের হেভি মেকানিকাল কমপ্লেক্স লিমিটেড এর সাথে চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান সরকারের চুক্তির কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। (প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তিতে অগ্রিম প্রদানের কথা রয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় চুক্তিতে তা নেই)। এব্যাপারে সত্ত্বর আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা আবশ্যক ‘‘
এই প্রকল্পের অর্থ যখন জোগাড় করা হয় বাংলাদেশে তখন ছিলো সামরিক শাসন। আর, তৎকালীন পদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে বিবিসিকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ঢাকায় তৎকালীন পাকিস্তানী হাইকমিশনার নিজে বেশ উদ্যোগী ছিলেন যাতে পাকিস্তানী ঐ ঋণ সেনাকল্যাণ সংস্থার সিমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে লাগে।
‘পাকিস্তানের আগ্রহ ‘
উপমহাদেশের সামরিকবাহিনীগুলোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডঃ আয়েশা সিদ্দিকা বলছেন বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে পাকিস্তানের এধরণের সহায়তার বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে এর মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদস্থ এবং পুরোনো অনেক কর্মকর্তাই চান বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে তিনি অবরপ্রাপ্ত এমন এক জেনারেলকে চেনেন - যিনি এখন ব্যবসা করেন এবং অহরহই বাংলাদেশে যাওয়া আসা করেন । তাঁকে কার্যত একজন যোগাযোগকারী হিসাবেও বর্ণনা করা চলে।
ডঃ সিদ্দিকা বলেন যে তিনি এমন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন যেখানে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ও সামরিকবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা এমনভাবে কথা বলেছেন যাতে মনে হয় তাঁরা বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে পাকিস্তানের সম্প্রসারিত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক অঙ্গ বলে মনে করেন। সুতরাং, তাঁরা যে বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে এক্ষেত্রে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবেন এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন ডঃ সিদ্দিকা।
বাণিজ্যিক এসব প্রকল্প গ্রহণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ্বতার প্রশ্নে বাংলাদেশে এখনও কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায় না।
আর, তাই সামরিকবাহিনীর শৃঙ্খলার যে বন্ধন, তার মোড়কে এসব বাণিজ্যিক উদ্যোগের বিষয়ে একধরণের গোপনীয়তার নীতি অনুসৃত হয়। ফলে, যেসব শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ বা প্রকল্পে সামরিকবাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সেগুলোর বিষয়ে খুঁটিনাটি তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সেনা কল্যাণ সংস্থার হালচাল
অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক এবং সেনা পরিবারগুলোর কল্যাণের উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গণে সেনা কল্যাণ সংস্থার সাফল্য খুব দর্শনীয় কিছু নয়।
বরং, সেখানে সদর্পে পদচারণা করছে সামরিকবাহিনীর অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান – আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট।
সামরিকবাহিনীর বাণিজ্যে হাতেখড়ি যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রকল্পগুলো কেমন চলছে তা জানার সুযোগ অবশ্য তেমন একটা নেই।
সেনা কল্যাণ সংস্থার বোর্ড অব ট্রাষ্টির প্রধান, সেনাপ্রধান এবং সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে যোগাযোগের পর কয়েক মাস অপেক্ষা করেও সংস্থার কার্য্যক্রমের বিষয়ে কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে, সংস্থার বিভিন্ন প্রকাশনায় বলা হয়েছে --‘‘সেনাকল্যাণ সংস্থা হচ্ছে দাতব্য সংস্থা আইন ১৮৯০ এর আওতায় নিবন্ধিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান – যার একমাত্র লক্ষ্য সশস্ত্রবাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের এবং তাঁদের পোষ্যদের কল্যাণ। সংস্থার বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রকল্প এবং স্থাবর সম্পদের আয় থেকেই এসব কল্যাণমূলক কাজ পরিচালিত হয়ে থাকে। ‘‘
সংস্থাটির শিল্পপ্রকল্পগুলো কেমন চলছে তা দেখার জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আমি গিয়েছি।
চট্টগ্রামের শিল্প এলাকায় অবস্থিত একটি কারখানা হচ্ছে ডায়মন্ড ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেড।
এই ডায়মন্ড ব্র্যান্ডের ময়দা, আটা বা সুজি শহুরে পরিবারগুলোর অনেকেরই খাদ্যতালিকায় স্থান পেয়ে থাকে।
এমনকী সরাসরি ডায়মন্ডের আটা , ময়দা বা সুজি কেউ না কিনলেও নেসলে, ফু ওয়াং এবং অলিম্পিক ব্রান্ডের নুডলস, বিস্কুট কিম্বা পাঁউরুটিতেও আপনি হয়তো পাবেন ডায়মন্ডের ময়দা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যতোটুকু আমি জেনেছি তাতে দেখা যায় যে বাংলাদেশে ময়দার যে চাহিদা তার ২০ ভাগের একভাগ আসে ডায়মন্ড থেকে।
আর, সেনাকল্যাণ সংস্থার অপর দুটি ফ্লাওয়ার মিলসের উৎপাদনকে হিসাবে নিলে দেখা যায় বাংলাদেশের ময়দার বাজারের আটভাগের একভাগ এই তিনটি কারখানা থেকে আসছে।
এসব কারখানার প্রতিটিই ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত। আর, তাই এই শিল্পে প্রযুক্তিগত যেসব উন্নতি ইতোমধ্যেই ঘটেছে তাতে করে শিগগিরই এসব কারখানার খোল-নলচে বদলে আধুনিকায়ন না করলে বেসরকারী খাতের অন্য প্রতিদ্বন্দীদের সাথে তারা বেশীদিন প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে বলে মনে হয় না।
পরিত্যক্ত সম্পত্তির দায়িত্বগ্রহণ :
এরকমই আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এনসেল টেক্সটাইল – যারা ত্রিপল, তাঁবু ও বিশেষধরণের কাপড় তৈরী করে থাকে।
সেনাকল্যাণ সংস্থার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মতোই পাকিস্তানী শিল্পপতিদের মালিকানায় ১৯৬০এর দিকে চালু হয় এই কারখানা এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসাবে সরকার প্রথমে অধিগ্রহণ করে এবং পরে ১৯৭২ এ তা হস্তান্তর করা হয় সেনাকল্যাণ সংস্থার কাছে।
তবে, প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে তাঁদের তৈরী বিশেষায়িত পণ্যের চাহিদা দিন দিন কমছে এবং ভবিষ্যত খুবই অনিশ্চিত।
চ্ট্টগ্রামে সেনাকল্যাণ সংস্থার আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এস কে ইলেক্ট্রিক। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে পরিচিত পণ্য হচ্ছে হাবিব ফ্যান। তবে, পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ হবার পর তা সেনাকল্যাণ সংস্থাকে দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকরা আদালতের আশ্রয় নিয়ে তা ফেরৎ পেয়েছেন।
অবশ্য, হাবিব ফ্যানের ব্রান্ড নামটি ব্যবহারের অধিকার সেনাকল্যাণ সংস্থা কিনে নিয়েছে এবং এখনও তার উৎপাদন চালু রেখেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি পল্লী উন্নয়ন বোর্ড এবং বরেন্দ্র প্রকল্পের জন্য বৈদ্যূতিক ট্রানসফরমার তৈরী করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এখনও আধুনিকায়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি। ফলে, এটি কতোদিন টিকতে পারবে তা রীতিমতো একটা বড় প্রশ্ন।
সাদাকালো সিটিজেন টেলিভিশন তৈরী করতো ফ্যাক্টো ইয়ামাগেন ইলেক্ট্রনিক্স। অব্যাহত লোকসানের কারণে এটি বন্ধ রয়েছে গত কয়েকবছর ধরে। তবে, আবারো তাতে নতুন বিনিয়োগ করে এটিকে সচল করার চেষ্টা চলছে। তেজগাঁ শিল্প এলাকায় যে জায়গার ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত সেই জায়গাটি অবশ্য সম্পদ হিসাবে অত্যন্ত মূল্যবান।
আর এই ফ্যাক্টো ইয়ামাগেনের উল্টোদিকেই হচ্ছে স্যাভয় আইসক্রিম, চকোলেট এন্ড ক্যান্ডি ফ্যাক্টরী। মূলত রাজধানীর বাইরে মফস্বল এলাকাতেই এদের বাজার।
ঢাকায় এখন বেসরকারী খাতে অত্যাধুনিক আইসক্রিম এবং চকোলেট উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে একাধিক এবং সেকারণেই ভব্যিষতে স্যাভয়কে যে বড়ধরণের প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সেনাবাহিনীতে কর্মরত কর্মকর্তারা যেহেতু সেনা কল্যাণ সংস্থার মূল নীতিনির্ধারণ এবং পরিচালনার কাজটি করে থাকেন – সেহেতু সামরিক শৃঙ্খলার কঠোর নিয়মনীতির বন্ধনে তাঁরা আবদ্ধ। সুতরাং, সেনাসদরের সবুজ সংকেত ছাড়া কোন তথ্যই তাঁরা সর্বসাধারণ – এমনকী সাধারন সৈনিকদের জন্যও প্রকাশ করেন না।
তবে, তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে সেনা কল্যাণ সংস্থা ২০০৭ সালে মুনাফা করেছিলো ৩৬ কোটি টাকা আর, ২০০৮ সালে সেই মুনাফায় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ত্রিশ শতাংশ অর্থাৎ মুনাফা হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকা।
কল্যাণ খাতে ব্যয় সাধারণের অজানা :
যেসব কল্যাণমূলক কাজ সংস্থাটি করে থাকে সেগুলো হচ্ছে শিক্ষাবৃত্তি, প্রশিক্ষণের জন্য বৃত্তি, চিকিৎসা এবং দুঃস্থ বিধবাদের আর্থিক সাহায্য দেওয়া। এসব খাতে গত আটত্রিশ বছরে ঠিক কতোটা অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তার কোন হিসাব সাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয় না।
তবে, অবসরে যাওয়া সেনাসদস্যদের অনেকেরই অভিযোগ যে সেনাকল্যাণ সংস্থাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত নয় এবং সেকারণে তাঁরা তেমন কোন উপকার পান না।
ঢাকা সেনানিবাসের পাশে কাফরুলে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তাঁদের সবার মধ্যেই একধরণের অসন্তোষ দেখা গেলো।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনারারী অফিসার মুজিব বলেন যে সেনাকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে চিকিৎসা, বিয়ে, শিক্ষা ইত্যাদি নানা প্রয়োজনে সাহায্য দেবার ব্যবস্থা থাকলেও তার জন্য অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। তিনি জানান যে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে সেনাকল্যাণ সংস্থা থেকে একটি ফরম নিয়ে তা পূরণ করে এডজুটেন্ট জেনারেলের অফিসে জমা দিয়ে সেখান থেকেই বরাদ্দ নিতে হয়।
অফিসার মুজিবের মতে এটা বিশাল অনুষ্ঠানিকতা বা ফর্মালিটিজের ব্যাপার যা সবাই পারে না। তিনি বলেন যে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের ষাট শতাংশই থাকে গ্রামে যাদের পক্ষে এধরণের সাহায্য নেবার জন্য শহরে এসে এতোটা ঝামেলা সহ্য করা সম্ভব হয় না।
মি মুজিব জানান যে আগে সৈনিকরা সন্তানের জন্য যে শিক্ষা সহায়তা পেতেন এখন তা কমিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র দুজনের জন্য। তিনি বলেন যে সৈনিকদের আশি শতাংশই জানেন না যে সেনা কল্যাণ সংস্থায় এধরণের সাহায্য দেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত নায়েক মোহাম্মদ ফজলুল করিম এবং অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার বাচ্চু মিয়া জানান যে তাঁরা সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠানে নিজেদের এবং তাঁদের সন্তানদের চাকরীর জন্য দুবছর ধরে নানা জায়গায় ধর্ণা দিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।
নায়েক ফজলুল করিম ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন যে আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বলা হলো - কিন্তু দুবছর অপেক্ষা করেও তো কিছু হলো না - আর কয়েকবছর অপেক্ষা করলে তো আমরা কবরেই চইলা যামু - তাহলে কাদের চাকরী হয় সেনা কল্যাণে?
অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট এম এ ওহাব তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন যে চিকিৎসা সহায়তা দেবার ব্যাপারে সম্ভাব্য নানা রোগের একটি তালিকা রয়েছে এবং তিনি তাঁর লিভারের রোগের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইলে তাঁকে জানানো হয় যে সেনা কল্যাণের নীতিমালায় লিভারের রোগের বিষয়ে কিছু বলা নেই এবং সেকারণে তিনি কোন সাহায্য পাবেন না।
এছাড়া সাহায্য দেবার নীতিতে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেগুলো নিয়েও অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের ক্ষোভ রয়েছে। অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলেও সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সেনা সদর কোন দপ্তর থেকেই কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
সেনা কল্যাণ সংস্থার ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি যতোটা না দর্শনীয় তার চেয়ে অনেক বেশী সাফল্য দেখা যায় আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্টের প্রকল্পগুলোতে। আর, সেই ট্রাষ্টের উদ্যোগগুলোর মধ্যে আইনগত কারণে হিসাব-নিকাশ প্রকাশে বাধ্য যে প্রতিষ্ঠান সেটি হোল ট্রাষ্ট ব্যাংক।





রেডিসন এর মালিক সেনাবাহিনী! এতো বড়লোক কে আন্দাজ করছিলো আগে!
আর কিছু কইতেও তো ডর লাগে...স্যালুট বস
হ, ওরা ম্যালা বড়লোক।
অনেক কিছু জানলাম । কত অশিক্ষিতই না আছি অহনো.।জানার শেষ নাই ।আর শেখার ও। ট্রাস্টি গঠন কইরা যদি সাহায্য না পাওয়া যায় তাহলে এর দরকার কি ? আর এই ট্রাষ্টির টাকা যায় কই ?
কে যে জানে?
ব্যাবসার গুড উইল (!!!) একটাই - সেনা বাহিনী।
মাসুম ভাইরে ধইন্যা। জিনিসটা শেয়ার করনের লিগা। বিবিসি শুনি না। তাই জানতামও না।
ধন্যবাদ মীর।
ইন্দোনেশিয়ান আর্মিও সেইরকম ব্যবসা করে। রাজনীতি ব্যবসা থেকে শুরু করে দুই নাম্বারী ( ঘুষ ++ )।
একটু হালকার উপ্রে ঝাপসা বিস্তারিত লিখেন মাসুম ভাই। দবির - সবির ফর্মুলা আর কি
আমি কিছু জানি না। সব জানে বিবিসি।
বাকি দুই পর্বের জন্য খুব বেশিদিন বসিয়ে রাখবেন না বড়ভাই। ধন্যবাদ তথ্য নির্ভর পোষ্টটি শেয়ার করার জন্য।
পারলে আজই দিয়ে দিচ্ছি
মাসুম ভাই, সেনাবাহিনী ব্লগ কিন্তু মনিটর করে। আমি বলবো দেশে থেকে এধরনের পোষ্ট দিতে না। ঝামেলায় পরলে কেউ বের করতে পারবে না আপনাকে
বিবিসির লেখাটা আগেই পড়েছি। দরকার ছিল এই অনুবাদের। মাসুম ভাইকে ধন্যবাদ। আর তনু আপা, এত ডরান ক্যান? সেনাবাহিনী কি আমাদের মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? এই লেখাতে একটা বাস্তব কিন্তু দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাওয়া বিষয়কে সামনে তুলে আনা হয়েছে মাত্র, এতে চিন্তার কিছু আছে বলে মনে করি না।
এইটা অনুবাদ না, সরাসরি কাটপেস্ট
১ম পর্বটা শুনছিলাম। ভাল কাজ করেছেন, চালায় যান।
চালায়া যাইতাছি
ঝামেলা হবে ভেবে মুখ বুজে পরে থাকার কিছু নেই... যা থাকে কপালে... বস আগাইয়া যান
ফৌজি ফ্লাওয়ার মিলস... স্মৃতি তুমি জলপাই-ছ্যাঁচা
ট্রাস্ট ব্যাঙ্ক ভালো
জলপাই ছ্যাঁচা রকস
হুমমম.....
তথ্য পরিসংখ্যান জমা রাখলাম।
আমিও জমা রাখছি।
মারাত্মক একটা পোস্ট।
'আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বলা হলো - কিন্তু দুবছর অপেক্ষা করেও তো কিছু হলো না - আর কয়েকবছর অপেক্ষা করলে তো আমরা কবরেই চইলা যামু - তাহলে কাদের চাকরী হয় সেনা কল্যাণে?'
ইন্টারেস্টিং পোস্ট।( শুধু ইন্টারেস্টিং না মনে হয় ভীতিজনকও)।
প্রিয়তে রাখা ছাড়া উপায় নেই।
কত কিছু জানি না রে!!!!!!!!!!!!!!!
আমিও
ধন্যবাদ এরকম তথ্য জানাবার জন্য।
লেখাটা সোকেসে নিলাম।
ভাবতেছি .........ওরা লাখখানেক পেট, কিন্তু এত্তগুলা ব্যাবসা!! কি সুশৃংখল অবস্থা।
আমরা ষোলোকোটি একদম বেড়াছেড়া!!
আচ্ছা, পুঁজির উৎস কি ওদের? ওদের সাথে ব্যবসায় পাবলিকের শেয়ার দেয়ার কোন ব্যবস্থা আছে নাকি। আমি শৃংখলার সাথে কামাতে পছন্দ করি। সুযোগ চাই শৃংখল হবো।
যোগ চাই শৃংখল হবো।
চমৎকার একটা সিরিজ, মাসুম ভাই
কাফরুলে থাকি তো, সেনাবাহিনী আমাদের আমজনতাকে কি চোখে দেখে প্রতিদিন আসতে যাইতে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। এর আরো একটা কারণ পরিস্কার হলো।।
সেনসিটিভ ইস্যু দেখে অনুমতি চাচ্ছি, ফেসবুকে শেয়ার করা যাবে?
কী আর হবে। দেন।
চট্টগ্রামে জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের লাগোয়া খালি জায়গাটা 'হোটেল রেডিসন চট্টগ্রাম'- এর জন্য চুড়ান্ত করা হয়েছে-শুনতে পাই।

এদেশে সামরিক শাসন আসার পর থেকেই পর্যায়ক্রমে সেনাবাহিনী হয়ে উঠেছে, এদেশের সবচেয়ে বড় শিল্প গোষ্ঠী-সম্ভবতঃ একমাত্র টেলিকম ব্যবসা ছাড়া আর মোটামুটি সব ব্যবসাতেই এই গোষ্ঠীর টাকা লগ্নি করা হয়েছে।
একমত।
সেনাবাহিনী আর জামাত, ব্যবসায় এই দুই জিনিস এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। দেশে যতই রাজনৈতিক গোলজোগ হউক হরতাল হউক এদের সমস্যা হয় না। জলপাই ক্ষমতায় এসে সবকিছুতে সবাইকে জরিমানা টরিমানা করলেও এই দুই শ্রেনীর কোন সমস্যা হয় না।
সেনাবাহিনী এসব করে করে নিজেদের দেশের সাধারন লোকজন থেকে আলাদা করে ফেলছে। এটা খুব একটি নেতিবাচক ব্যাপার।
এই দেশে সেনাবাহিনীর জন্যেই সবকিছু, মনোরম সেনানিবাস, বিলাসী গলফকোর্স, রকমারী ব্যবসা। রাজনৈতিক গোলজোগেও এদের কিছুই ক্ষতি হয় না, পট পরিবর্তনেও না।
পরের জন্মে সবার আর্মি হওয়া উচিত
গুড পয়েন্ট
পড়তাছি...............।
হুমম
খেয়াল করে পড়লাম
এই রেডিও ডকুমেন্টারিটা ব্লগে প্রকাশ করে খুব দারুণ একটা কাজ করছেন মাসুম ভাই। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
মন্তব্য করুন