পিকনিক নিয়া দুইটা শিক্ষামূলক ঘটনা
পিকনিকে তো যাইতাছেন? বউ নিয়া যাবেন? তাহলে আসেন একটা গল্প কই।
একবার এক কামেল লুক বউ আর ছেলে নিয়া গেল পিকনিকে। এই লুকের মূল কাজ বউয়ের পিছন পিছন ঘুর ঘুর করা। নিজের বউয়ের পিছন যে ঘুর ঘুর করতে পারে সে যে কামেল লুক এই নিয়া আর সন্দেহ নাই।
পিকনিক নেতা দাদাভাই সকাল থেইকাই খালি রান্দে, আর রান্দে। কিন্তু রান্দোন আর শেষ হয় না। সকাল যায়, দুপুর গড়ায়, বিকালও যায় যায়। কিন্দু রান্দা চলতাছেই।
পরে দাদাভাই বুদ্ধি কইরা ভাপা পিডাওয়ালারে বসাইয়া দিল। শীতের বিকালে পিডা বানায়, আর সাথে সাথে ফুরুত। লাইনে না খাড়াইলে পিডা নাই।
ঐ লুকের পোলার লাগছে জবর খিদা। সেও আইসা লাইনে খাড়াইতে চায়, কিন্তু কামেল বাপ কয়, যাও, যাও, এখনই খাবার খাইবা। পিডা খাওন লাগবো না।
কিন্তু দাদাভাইয়ের রান্দোন আর শেষ হয় না।
কামেল লুকটা গেল বউয়ের কাছে। যাইয়া শোনে পুত্র তার মায়েরে বলতাছে,
' মা মা, আমি পিঠা খাইতে গেলাম, বাবা আমাকে দেখে বলে, যাও যাও, এখন আর পিঠা খেতে হবে না। বাবার পাশে দাঁড়ানো ছিল একটা আন্টি। তাকে দেখে বাবা কী বলে জানো? বলে আসো আসো পিঠা খাবা?'
ঐ রাতে বাসায় কী হয়েছিল সেইটা আর না জিগাই।
সুতরাং বউ নিয়া পিকনিকে যাওয়ার আগে সাবধান। বউ নিয়ে যাবেন না? বান্ধবী নেবেন?
তাহলে আরেকটা গল্প শোনেন।
দবিরের ছেলে ছবিরের স্মরণ শক্তি প্রচন্ড ভাল। পাড়া প্রতিবেশি আত্মীও-স্বজন সবাই ছবিরের স্মরণ শক্তিতে মুগ্ধ।
ছবিরের বয়স বেশি না, ৫/৬ হবে। ছবিরকে একদিন ধরলো পাড়া-প্রতিবেশিরা। জানতে চাইলো কি করে সে সব কিছু মনে রাখে। বিশেষ করে ২/৩ বছরে সে কি করেছে তাও মনে আছে।
-এ আর এমন কি, আমার যখন জন্ম হলো ঠিক তখন হাসপাতালে আমাকে দেখে কে কি বললো আমার তো তাও মনে আছে, ছবিরের উত্তর।
-তাই নাকি, এতো তোমার স্মরণ শক্তি?
-এ আর এমন কি, আমি যখন আমার মায়ের পেটে তখন আমাকে নিয়ে ডাক্তাররা কি কি বলতো তাও মনে আছে আমার।
প্রতিবেশিরা আরও অবাক-তাই নাকি?
ছবিরের উত্তর-এ আর এমনকি, আমার জন্মের আগের কথাও মনে আছে।
বিস্মিত প্রতিবেশিরা-কি রকম
-আমার বাবা মার তখনো বিয়ে হয়নি, তারা গেলো পিকনিকে।
-তারপর?
-তারপর তারা গেলো একটা বাংলোর মধ্যে।
উৎসুক প্রতিবেশি-তারপর???
-তারপর আমার বাবা বাংলোর দরজা বন্ধ করলো,
প্রতিবেশীরা এবার আরো উৎসুক-তারপর কি হল??
-তারপর আর কি, পিকনিকে গেলাম বাবার সাথে, আসলাম মায়ের সাথে।
সুতরাং ভাবেন, পিকনিকে কি করবেন? কারে নেবেন।





আপনি কারে নিতাছেন শখত মামা ???
আমি তো সাতার কাটতে যাইতাছি
কামেল লুকটা গেল বউয়ের কাছে। যাইয়া শোনে পুত্র তার মায়েরে বলতাছে,
' মা মা, আমি পিঠা খাইতে গেলাম, বাবা আমাকে দেখে বলে, যাও যাও, এখন আর পিঠা খেতে হবে না। বাবার পাশে দাঁড়ানো ছিল একটা আন্টি। তাকে দেখে বাবা কী বলে জানো? বলে আসো আসো পিঠা খাবা?'
ঘটনা কমন পড়লো মনে হয়!
অতি মাসুমীয় পুস্ট। এই মাঝ রাইতে হাসতে হাসতে পড়ে গেলাম।
কামেল লুক আর আন্টিরে মনে হয় চিনছি, শুধু ছবিরকে চিনতে পারলাম না
তাতাপু, আপনেরও কমন পড়ছে? ঘটনা কি চিন পরিচিত?
ঘটনার নায়ক আর আন্টি চিন পরিচিত
আমারো তো মনইতাছে।তয় আমি এই গল্প বলি নাই।
আমিও তুপতাপ
দাদাভাইরেও চিন পরিচিত লাগে।বুঝলাম না মাসুম ভাই কি সত্য ঘটনা কইতে চাইলো?
আমারতো ভাপা পিঠা খাওয়া আন্টিরে বেশি পরিচিত লাগছে
মাসুম মানুষ মিথ্যা কথা কয় ক্যামনে
আন্টিডা কিডায়?আইচ্ছা ইশারা দেন এক্টু, দেখি আমার লগে মিলে নাকি!
তোমার লগেতো পুরাই মিল
হ! চুপচাপ পড়ে গেলাম (কপিরাইট কামেল লোক!!)
কমন পড়লো মানে কী। বলতে ভুইলা গেছিলাম জীবিত বা মৃত কারো সঙ্গে এই গল্পের কোনো সম্পর্ক নাই। কে জীবিত আর কে মৃত জানেন তো সবাই?
এমুন এক্টা ঘটনা নিজ চোক্ষে দেখছিলাম।
তুমি তাইলে সুর্স?
কি কন এসব? জীবনে শুনছেন আমি এমুন গফ কইছি?আপনেরটা শুনে কমন পড়ছে খালি।
আমি কিন্তু বুঝি কম। কামেল লুকটা আপেল থুইয়া পিঠা খাওয়াইতে গেল ক্যান
আর দাদাভাইটাই বা কোন বাগানে বইসা রান্ধে যে শেষ হয় না
আপনে লুক ভাল না। কামেল লুকরে পিকনকেই বউরে মাইর খাওয়াইতে চান
তাইলে সার কথা কি- আমি কলা খাইনা?
জটিল পোস্ট। প্রাণ খুলে হাসলাম

এই পোস্ট তো ইদার বড়রা বুঝবে আর নাইলে পিকনিক যাত্রীরা, ছোটদের জন্য কি কোন ব্যবস্থা নাই?
জাতির কাছে প্রশ্ন, আমার মতো মাসুমদের জন্য তাহলে পিকনিকে কী আছে?
জটিলস্য জটিল । মাসুম, এইটা কি ছাড়লেনরে ভাই ! হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি (ইমো দিতে শিখি নাই)। কীবোর্ডে আঙ্গুল ঠিকমত পড়ছেনা হাসির চোটে। এই সাতসকালে প্রাণ খুলে হাসবার সুযোগ দিলেন - হাজার হাজার ধইন্যা, একেবারে শিকড়সহ।
পিকনিকের আগে এটা খুবি শিক্ষামূলক পোস্ট
দাদাভাই কি পানি গড়ম করতেছিলো?
দাদা ভাই কে?
নীড়দা মনে হয় নিয়মিত চোখ রাখেন না ব্লগে

নাইলে বুইঝা যাওয়ার কথা
হ হ .কামেল লোকের ফটুক আছেআমার ল্যাপিতে।
২৩ তারিখে বিশেষ জরুরি কাজে দেশের বাইরে যাচ্ছি
২৮ তারিখ ফিরা আইসা পিকনিকের গপসপ আর পোস্টের জবাব দিমুনে 
দোয়া করি প্রাণ খুলে - পাসপোর্ট হারিয়ে যাক, কাস্টমস ফেরত পাঠাক, বর্ডার ক্রস সম্পূর্ণ বেআইনী ঘোষিত হোক ।
আমিন
অতিঅসাদা(ধা)রণ জোকস
আপনারে নিয়া বিরাট পোস্ট লেখতেছে
অপেক্ষায় আছি
গুরু, ভয় পাই। সাহস হয় না।
কামেল লোকটারে তো মনে হয় চিনতে পারছি
কোন কামেল ব্লগার কি হেল্পাইবেন?
কিন্তু আন্টিটা কে
ঝাতি বলুক
আরেক কামেল লোক ব্উরে বলছে, "বুঝলা কণা, দু্ইন্যার বেকুব আর dull লোকজনে ভর্তি একটা জায়গা হ্ইল ব্লগ। ফকিরা একটা পিকনিক। তুমি একদম মজা পাবানা। তার চেয়ে বরং তুমি বাচ্চাদের নিয়ে সাভার থেকে ঢাকায় ফিরে রেস্ট নিও। আহা কাজের চাপে কতোদিন তোমার একটু রেস্ট হয় না..."
মোয়ার গপটা ভালো হইছিলো (দু্ইন্যা থিকা কেতজ্ঞতা উইঠা গেছে, আফসুসের ইমো হইবেক)
পাইছি।এত দিন কই ছিলেন আপনি????????
এতদিন পরে নুশেরাকে দেখে ভাল লাগলো ।
ব্লগার হইয়াও ব্লগারদের বেকুব আর ডাল কইলা।
''ছি: ছি: আপনারা ব্লগাররা এত্তো খারাপ''
মোয়ার গল্পটা তুমি কইছিলা? হ, তাইতো। বুড়া হওয়ার লক্ষণ
(
কৃতজ্ঞতা হিসাবে এই গল্পটা আপনার জন্য
এই গল্পটা নমিতা শীলের। অথবা বলা যায়, তাকে নিয়েই এ গল্প। চকরিয়ার কোনো এক সন্তোষ শীলের বউ নমিতা শীল। দু'বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হতে এসেছেন। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল বুঝলেন তো? আগে যার নাম ছিল যক্ষ্মা হাসপাতাল। কাছে-পিঠের লোকজন এখনও কাউকে ঠিকানা বোঝাতে গিয়ে বলে, টিবি হাসপাতাল পার হয়ে একটু গিয়ে বাঁয়ে, পেছনে ইটভাটার চিমনি দেখা যায়। অবাক হলেন? টিবি রোগীদের ভীষণ শ্বাসকষ্ট থাকে, সেখানেই কি-না জলজ্যান্ত বায়ুদূষক! না মানে ইটভাটা-ফাটা আজকাল পরিবেশ আইন মেনে চলে, ৮০ ফুটি চিমনির উচ্চতা বাড়িয়ে ১২০ করা হয়েছে, অতখানি ওপর থেকে কালো ধোঁয়ার মাশরুমটা কি আর সহজে ঝরে পড়বে? আর পড়লেই বা কী! আসল কথা হলো, মনে রাখতে হবে, আমরা বলছি নমিতা শীলের গল্প। পথের আশপাশে, ডানে-বামে তাকানো যাবে ঠিকই, তবে গলিঘুপচিতে পা দিয়ে রাস্তা হারানো চলবে না।
তো সেই নমিতা শীল এই হাসপাতালে ছিলেন আড়াই মাস। সে দু'বছর আগের কথা। তখনকার ডাক্তার-নার্স দু'একজন ছাড়া প্রায় সবাই এখনও এখানেই আছেন, পিয়ন-আয়ারা তো কম-বেশি স্থানীয় লোকজনই। ভর্তি হয়ে একটানা অনেকদিন থাকে বলে এ হাসপাতালের রোগীরা সহজে তাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় না। তবু ডাক্তার-নার্স অথবা আয়াদের কেউই নমিতাকে দেখে চিনতে পারলেন না। পুরনো রোগীর রেকর্ড আপডেট করতে গিয়ে অন-ডিউটি নার্স আরিফা খাতুনের মনে পড়ল চকরিয়ার নমিতা শীলকে; তার চোখ-মুখে সবিস্ময় আক্ষেপ।
আগেরবার ডিসচার্জের সময় রোগীর জন্য বরাদ্দ হয়েছিল নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার আর বিশ্রামের পরামর্শ। উপজেলা হেলথ কমপেল্গক্সের ডটস সেন্টার থেকে ছয় মাসের অ্যান্টিটিবি ড্রাগস জোগাড় করে নিয়ে পুরো কোর্সের ওষুধ খেতে হবে, এমন কথাও লিখে দিয়েছিলেন এখানকার আরএমও। সেসব অনুশাসনের প্রতিপালনে নমিতা শীল অথবা তার পরিবারের সদিচ্ছা অথবা সাধ্য কতটুকু ছিল, বলা মুশকিল। বছর চবি্বশের গেঁয়ো বধূর দিনযাপনের নৈমিত্তিক তুচ্ছতার খোঁজ আমরা জানব কেমন করে! দ্বিতীয় দফায় ফিরে না এলে তার কথা মনে পড়ারই কোনো কারণ ছিল না।
দুটি বছর কেমন কেটেছে নমিতা শীলের, কে জানে! এর মধ্যে কত রোগী কত রকম নাম-ঠিকানা নিয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ছয়টি ওয়ার্ডে থেকে গেছে, আবার চলেও গেছে। দফায় দফায় ঠিকাদারের ধোপা হাসপাতালের পুকুরপাড়ে ময়লা চাদর-পর্দার স্তূপ জমা করেছে, সোডায় কেচে নীলে ডুবিয়ে দোতলার বিশাল ছাদে নাইলন দড়ির প্যাঁচের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে শুকাতে দিয়েছে। মাঝে একবার পলস্তারা মেরামতের কাজ হয়েছে হাসপাতালের ভেতরে, হয়েছে চুনকামও। বাইরের হলুদরঙা দেয়ালে নোনা শ্যাওলা ধরে গেছে অল্প দিনেই, সমুদ্র ধারে-কাছে বলেই হয়তোবা। ওয়েদার প্রুফ কোটিং জরুরি ছিল, তবে বোঝেনই তো, সরকারি বরাদ্দে এতসবের অনুমোদন থাকে না।
এই দু'বছরে হাসপাতালের বাথরুমের বদনা-বালতি-মগ, ঝাড়ু-ব্রাশ-মপ কেনাকাটা হয়েছে ওপেন টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট বেশ বদলে গেছে। তিনের কম কোটেশন পড়লে আবার নোটিশ দেওয়ার সেই পুরনো হ্যাপা এখন আর নেই। কাজেই বুঝতেই পারছেন, আপসরফায় এক পার্টিই দর দিয়েছে। দু'বছরে রোগীর খাবারের ঠিকাদার বদলায়নি, শুধু বনরুটির বদলে পাউরুটি এসেছে। এদিকে ডিম শক্ত আর কলা আকারে ছোট হয়ে গেছে বলে অ্যাটেনডেন্টরা মাঝেমধ্যেই অভিযোগ জানিয়ে যাচ্ছেন। কী বললেন, খাবার তিন বেলাই ফ্রি কি-না? কত বরাদ্দ থাকে মাথাপিছু? দিলেন তো যন্ত্রণায় ফেলে! আরে, গল্প কি শুধু আপনার জন্য? মানছি, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের অঙ্কটা আপনি সযত্নে মনে রেখেছেন; কয়েক সেকেন্ড ভেবেই বলে দিতে পারেন দেশের চিকিৎসক-জনতার অনুপাত। কিন্তু এ গল্প তো আপনি একা পড়ছেন না। এমন পাঠকও আছেন, থাকেন, সাময়িকীর শেষ পাতায় উপন্যাসের রিভিউ পড়েন অখণ্ড মনোযোগে। 'জীবনের সহজপাঠে চমক থাকে না, তবে যা থাকে তার নাম মায়া, মমতা, ভালোবাসা...।' এটুকু পড়েই এমন আপ্লুুত হন যে, পরবর্তী সুযোগেই ঢাকার আজিজ কিংবা চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় সেলিনা হোসেন অথবা 'ভূমি ও কুসুুমে'র খোঁজ করেন!
ফিরে আসি গল্পের মাঝ রাস্তায়। বলছিলাম নমিতা শীলের গল্প। মাঝের দু'বছর তার কেমন কেটেছিল সে কথা জানা গেল না, জানাটা জরুরিও না। আমরা বরং দেখি তার এখনকার অবস্থা। হাড়-জিরজিরে শরীর কোনো রকমে প্রাণটা ধরে আছে। মুখটা সে রকমই হাসিমাখা, একটু করুণ আর অনেকটা অপ্রস্তুত সেই হাসি, যেমনটি ছিল দু'বছর আগেও। তবে গেলবারের তুলনায় কী ভীষণ ক্লান্ত সে! বসে থাকার একবিন্দু শক্তি নেই, ভর্তি হয়ে মহিলা ওয়ার্ডে গিয়েই বেডে শুয়ে পড়ল। পায়ের কাছে জানালা, জানালার গ্রিলের খোপখাপে মেলানো জিগ-স পাজল; সেখানে অফিস ঘরের ছাদ, পানির ট্যাঙ্কি আর ধানক্ষেতের দৃশ্য। গতবার অন্য সারিতে বেড পেয়েছিল সে, যেখানে জানালা ছিল মাথার কাছে, আধশোয়া হয়ে পশ্চিমের রাঙা আকাশ দেখত সন্ধ্যাবেলায়। তবে সে কথা নমিতা শীলের মনে পড়ে কি-না বোঝা যায় না। থেকে থেকে তার বিষণ্ন চোখজোড়া কোটরের গভীর থেকে ঠেলে বেরুতে চায়, সে চোখের চারপাশ কালিমাখা।
বেশ বদলে গেছে নমিতা শীল এই দু'বছরে। মুখ হাঁ করে থাকে সারাক্ষণ। শুধু নাসাপথে যথেষ্ট অক্সিজেন টেনে নিতে অক্ষম তার টিবিক্ষয়া ফুসফুসজোড়া। উন্মুক্তাধর শ্বসনক্রিয়ার ফল হিসেবে দাঁতগুলোর মাঝেমধ্যে ফাঁক বেড়েছে, ওপরের মাড়িটা উঁচু দেখায়। চোয়ালের হনু আর কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে, গলার পেশি প্রতি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে কঠিন ব্যায়ামে অনুশীলনরত। সিঁদুরে ভরাট বৃত্তটি কপালে থেবড়ে আছে, ত্বকে অকাল-বলিরেখার নির্মম আগ্রাসন। ছাবি্বশ বছর বয়সী নমিতাকে দেখার পর নারিশিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনে চলিল্গশের চিন্তিত মডেল নিশ্চিতভাবেই আপনাদের বিরক্তির কারণ হবে।
সোডাগন্ধি ওয়াড়ে পোড়া চুপসানো বালিশে মাথা রেখে নেতিয়ে আছে নমিতা। করোটির অস্থিকাঠামোটি স্পষ্ট দৃশ্যমান; তাতে সেঁটে থাকা চামড়ায় অপুষ্ট একগোছা চুল, শীর্ণ ঘাড়ের নিচে সরু বেণিতে এলোমেলো জড়িয়ে। বোঝাই যায় বহুদিন তেল-চিরুনি পড়েনি সেখানে। হাতের শাঁখাজোড়া অনায়াসে কনুইতে এসে ঠেকেছে; চোখা কোণাটুকু পার করতে পারলে সোজা বাজুতে উঠে আসবে।
নমিতা শীল পাশ ফিরে শুয়ে আছে তার বেডে। বিছানার বদলে বেড পড়তে অস্বস্তি হচ্ছে বুঝি? আসলে বেড শব্দটার সঙ্গে একটা হাসপাতাল হাসপাতাল গন্ধ জড়ানো থাকে; প্রতিশব্দ হিসেবে বিছানা বরং অনেক বেশি ঘরোয়া। শয্যাশায়ী নমিতার পিঠের ওপর থেকে আঁচলটা সরে গেলে দেখবেন, মেরুদণ্ডের সবগুলো কশেরুকা একটার পর একটা গোনা যায়। নমিতা কাশছে। দু'কাঁধের নিচে স্ক্যাপুলাজোড়া প্রতি কাশিতে শীর্ষবিন্দু উঁচিয়ে তাদের ত্রিভুজাকৃতি স্পষ্ট করছে। শরীরের মতো কাশিরও জোর কমে গেছে নমিতার; শব্দটি ঠিক নিস্তেজ হয়ে আসা খড়-কাটা মেশিনের মতো। এটা অবশ্য আমাদের কথা না; সত্যজিৎ রায়ের লেখায় আছে, হেঁপোরোগীর কাশির বর্ণনায় কামুবাবুর বিখ্যাত উপমা। না শুনে থাকলে আন্দাজ করে নিন, খরখরে ভোঁতা বেল্গডে খড়খড়ে শুকনো খড়বিচালি কাটার একটানা আওয়াজ কেমন হতে পারে।
কাগজপত্রে ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখানে বেড আছে ৯৬টি। সম্পন্ন ঘর থেকে কোনো রোগী এমন হাসপাতালে আর আসে না, ফলত চারটি কেবিন এখন মালপত্র আর জঞ্জালে ঠাসা। এখানকার রোগীদের বেশিরভাগই কলকারখানার শ্রমিক; তারা কেবিনের খোঁজ করে না, হয়তো জানেও না। নবাগত ডাক্তার অথবা ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভের কাছে আরএমও গল্প করেন, জ্যোতি বসুর আপন ভাস্তি, যিনি চট্টগ্রামে থাকেন, ছেলেকে এখানে নিয়ে এসে ওয়ার্ডেই ছিলেন। কৌতূহল হচ্ছে? হলেইবা কী, আমরা নিরুপায়। নমিতা শীলের গল্পের গাছটি বেড়ে উঠছে কোনোমতে; এ সময় খুচরো গালগল্পের আগাছা উপড়ে ফেলাই মঙ্গলজনক।
তা হাসপাতালে আর কতদিন পড়ে থাকবে নমিতা? আসলে এখানে দু'মাসের বেশি কাউকে রাখা হয় না। অবস্থা খুব খারাপ হলে এই মেয়াদ আরও এক মাস বাড়তে পারে। দু'বছর আগে প্রথম দফায় নমিতাকে রাখা হয়েছিল আড়াই মাস। এবার দু'মাস হয়ে এলো প্রায়। প্রথম মাসে সামান্য উন্নতি, দ্বিতীয় মাসে উল্টোরথে চড়ে বসেছে। এখন তার ঢলঢলে বল্গাউজটা দেখে মনে হয় যেন প্রিম্যাচিউর নবজাতকের গায়ে এক বছরের বাচ্চার জামা পরানো। অথচ ওটা নমিতারই, তার মাপেই কোনোদিন বানানো হয়েছিল পেকুয়া বাজারের ইউছুফ খলিফার দি নিউ দর্জিঘরে। দশহাতি জংলিছাপা শাড়িটা দেখুন, ওকে সাধ্যমতো পেঁচিয়েও কী লম্বা, মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। শাড়ির দৈর্ঘ্য দশহাতই, প্রতিগজে নটবর প্রিন্টসের ছাপমারা ইন্ডিয়ান কাপড়; দেশি শাড়ি আজকাল এগারো হাতের কম হয়ই না। লাজলজ্জা-পর্দাপুশিদার চিন্তা এ দেশের মেয়েদের বেশি কি-না, সে ভাবনা আমরা আপাতত বাদ দেই। নমিতা শীলের সঙ্গে কে আছে, তার খবর নিই চলুন।
এই দু'মাসের প্রথম কিছুদিন বোন বা ভাগি্ন কেউ একজন ছিল। তারপর থেকে আর কোনো অ্যাটেনডেন্ট নেই নমিতার। এখন তার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, কামারশালার হাপরের মতো বুক ওঠানামা করে। হাপর জিনিসটা যারা দেখেননি তাদের জন্য বিকল্প উপমা হতে পারে ডবল হারমোনিয়ামের বেলো। আসরে যখন বাজে, দর্শকের দিকে ফেরানো পিঠে দেখবেন গোটা দশ-বারো ফুটো। তার ভেতর আগুপিছু করে যে পর্দাটা, সেটা ধরুন গিয়ে ওই ফুসফুসের ডায়াফ্রাম। আর বেলোতে দেখবেন কয়েক ভাঁজের চামড়া, বাদকের বাঁহাতের চাপে খিঁচছে-ফুঁসছে। নমিতার প্রাণ যেন বেরিয়ে যায়। টয়লেটে যাতায়াতটুকুও কী ভীষণ কষ্টের! পড়ে গিয়ে হাতও ভেঙে ফেলল একদিন। ভাঙা বাঁহাতটা বুকের ওপর ঝোলে, আঁচল খসে পড়ে বারবার। জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষচিত্রের চিমসানো বুক-শিশুমাতার কপি আমাদের নমিতা, যার বয়স ২৬ এবং একমাত্র সন্তানের বয়স আট।
মাথার কাছে ভাঙাচোরা কাঠের রঙচটা ড্রয়ার; সকালের ডিম-পাউরুটি সেখানেই পড়ে থাকে। সেদ্ধ ডিমটার খোসা ছাড়ানোর শক্তি নেই আঙুলে। কালশিটে-পড়া রুগ্ন চাঁপাকলা জমতে জমতে ছোটখাটো পাহাড়। কফের বোলে ফেলে দেওয়া ভাত-তরকারি ভাসে। মাঝেমধ্যে টিনের গল্গাসে একটু চা, তাতে একআধ টুকরো রুটি ভিজিয়ে খাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা। মাছি ঘুরে বেড়ায় নমিতার বাসি খাবারে। এখন অক্সিজেন সিলিন্ডার ওর বেডেই থাকে। নাকে নল, হাতের শিরায় স্যালাইন ড্রপের সঞ্চালন।
নমিতা শীলের খোঁজ নিতে আসে না কেউ। আগের দফায় সন্তোষ শীল আসত দু'সপ্তাহে একবার। নার্সকে বলত, ব্যবসাপাতির ঝামেলায় সময় পায় না। নমিতা অবশ্য বলেছিল তার স্বামী পেকুয়া বাজারে সাহা অটো মিলসের মেশিনম্যান। হলুদ-মরিচ-গম-ডাল মেপে মেশিনে ফেলে গুঁড়ো করে, শার্টে লেগে থাকে মসলার ঝাঁজগন্ধ। এবার কোনো খোঁজ নেই সন্তোষের। নমিতা অস্থির। ফিসফিসে স্বরে আজ বলে, "আঁর জামাইরে খবর দ'। কাল বলে, বাজার'র সামনদি ভাইয়ুর'র সেলুন, আঁরে খুব বালা ফায়, খবর ফাইলে ইবা আইব। আরেকদিন বলে, বদ্দা আছে ইতারে খবর দ'।" তার বিশ্বাস, ভাশুর অথবা ভাই এলে নিশ্চয়ই টাকা-পয়সা নিয়ে আসবে, তখন ভালো ভিটামিন কিনে নেবে সে।
মাঝে একদিন ওয়ার্ডবয়ের মোবাইলে খবর আসে, বাবা মারা গেছে বলে অশৌচ পালন করছে সন্তোষ, তাই আসা হচ্ছে না। আরেকবার জানা যায়, পাগলা কুকুর কামড়ে দিয়েছে স্বামীকে। অবশেষে আড়াই মাস পার করে সন্তোষ শীল এলো। কামানো মাথাজুড়ে ফুরফুরে কদমফুলের মতো চুল অশৌচের সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাঁ পায়ে কুকুরের কামড়ের দাগ, নাভির চারধারে চৌদ্দটা সুঁই মারার গল্পও শোনা গেল। স্ত্রীর ওপর মহাবিরক্ত, কিছুটা বোধহয় দুঃখিতও। আরএমও আর হসপিটাল সুপার তাকে বোঝালেন, গতবারের অনিয়মের কারণে নমিতার প্রায়-অচল ফুসফুস দুটোকে এবার আরেক ধাপ উন্নত ওষুধ দিয়েও সচল করা যাচ্ছে না। বরং জীবনের শঙ্কাটাই বেশি। এখন বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে কিছুদিন ভালোমন্দ খাইয়ে সেবাযত্ন করলে, পাশাপাশি টিবির ওষুধ খাওয়ালে হয়তো অলৌকিক কিছু ঘটতেও পারে। না হলে লাশ বহনের খরচ অনেক বেশি পড়ে যাবে। টিবি রোগী শুনলে লাশ নিতে চায় না আধভাঙা টেম্পোও।
সন্তোষ শীল মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনল। তারপর সিদ্ধান্ত দিল নমিতার ঠিকানা বদলের। কক্সবাজারের চকরিয়ার পরিবর্তে নতুন ঠিকানা হবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেন বারদোনা গ্রামের ব্রজেন্দ্র শীলের বাড়িতে ওকে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেটি নমিতার পিত্রালয়। সন্তোষ শীলের যুক্তি, 'ব'র বাইত মাইয়া ইবা বালা থায়িব। শ্বশুর বাড়িতে অনেক ঝামেলা, কে দেখাশোনা করবে!'
কিছুদিন পর নমিতা শীলের বেডে অন্য রোগী ভর্তি হয়ে এলো। গার্মেন্টকর্মী শেফালি বগম। ঝুট কাপড়ের আঁশ ঢুকে ঢুকে ফুসফুস ক্ষয়ে গেছে। তার কারখানা ইপিজেডের বাইরে শহরতলির ঘুপচি গলিতে, সেখানে মাস্ক-ফাস্কের বালাই নেই। ও হ্যাঁ, নমিতার কী হলো জানতে চাইছেন? সে চলে গেছে। কোথায় গেছে, কার সঙ্গে গেছে, জীবিত না মৃত অবস্থায়_ সে গল্পের কিছুই আমাদের জানা নেই। আচ্ছা, আপনারা কেউ বলতে পারেন শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল ওর? একটু চেষ্টা করেই দেখুন, অনুমানশক্তির উপসংহারে একটা কোনো পরিণতি কিংবা গন্তব্য দিন না নমিতাকে! হ্যাঁ শুরু করুন, আপনিই।
_ মে বি আফটার হার ডেথ, ফিউনারেলের জন্য ভেটারেন নার্স পারুলবালা দাস কনট্যাক্ট করলেন মহামায়া সেবাসংঘ আশ্রমে; সেখানকার ট্রাস্টিদের কেউ হয়তো তার পূর্বপরিচিত!
_ধরুন কেউ আসেনি নমিতাকে নিতে, হাসপাতালের আরএমও কিংবা সুপারিন্টেন্ডেন্ট একদিন আঞ্জুমান মুফিদুলে ফোন করলেন; জনৈকা নাসিমা সুলতানার পরিত্যক্ত লাশ দাফনে তাদের সহায়তা প্রয়োজন।
_আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে, সাতকানিয়া থেকে আসা তেজেন্দ্র শীল, বোনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন চট্টগ্রাম-ঢাকা হাইওয়ের পূবপাশে; পরদিন পত্রিকায় মফস্বলের পাতায় খবর বেরুলো: দ্রুতগামী বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে অপেক্ষমাণ যাত্রী নিহত। প্রত্যক্ষদর্শী চা দোকানির সন্দেহ, সঙ্গী পুরুষটিই ধাক্কা দিয়ে... কী ভয়ঙ্কর, একটা ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা কেউ ভাবতে পারছেন না! এই যে একজন পাওয়া গেল, যিনি বলছেন, নারী দিবসে একটা সেমিনার হবে, টপিক থাকবে নারীর ঠিকানা কোথায়; কিংবা আলোচনাটা হবে হিন্দু আইনে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে। এখানেও তর্ক বেধে গেছে; সমান অধিকার বনাম ন্যায্য অধিকার বাদ যাবে কেন! আরেকজন, যার কাছে তথ্য-পরিসংখ্যানের ডাঁই, ভাবতে বসেছেন, ল্যান্ড অফিসগুলোর রেকর্ড অব রাইটসের হিসেবে দেশের কত শতাংশ পরিবারে নারী সদস্যের সংখ্যা স্রেফ শূন্য। এতক্ষণ নীরব ছিলেন, তেমন কেউ হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন। চকরিয়া-সাতকানিয়ার কনস্টিটিউয়েন্সিগুলো তো সব চারদলের ঘাঁটি, সেখানে মাইনরিটির লোকজন...
বেচারি নমিতা শীল, তার গল্পটা আর শেষই হলো না!
গল্পের নাম
নমিতা শীলের অসমাপ্ত গল্প
নু শে রা তা জ রী ন-এর 'নমিতা শীলের অসমাপ্ত গল্প' পড়লাম । নুশেরা আমার মনটাকে খুব খারাপ করে দিল । মাসুমকে ধন্যবাদ সুন্দর গল্পটি পড়বার সুযোগ করে দেওয়ায় ।
অফিসের কাজে চরম ব্যস্ত আছি। পরে পড়ব!!
খেক কেক খেক ..
কি ব্যাপার এত হাসির কী হলো?

জিব বাইর করার কি হলো?
কামেল লুক চিনছি এবার আন্টিরে চিনতে চাই????????????
হ, লাল জিবলা বাইর করলেন কেন? বলেন।
লাল জিবলা তো লুলরা বাইর করে, ভুল হৈয়া গেছে মাফ কৈরা দেন ছোট হুজুর
তাইলে বড় আর মাঝারী হুজুর কে....
খ্যাক খ্যাক খ্যাক!
এই পোস্ট পইড়া বউ লইয়া পিকনিকে যাওন বিরাট রিক্সি মনে হইতাছে...আফসুস চান্দা দিয়া ফালাইছি...।
রিস্ক বেশি না টাকা বেশি...?? সিদ্ধান্ত আপনার
নমিতা শীল...
সমাজের একটি অংশের দুঃখজনক চিত্র।
প্রথম ঘটনাটা দেখছি দেখছি মনে হচ্ছে
খুব ভাল লাগল। চরম সত্যি কথা।
ভাল থাকুন।
মন্তব্য করুন